১৮ দেশ ভাইরাসবিহীন থাকার রহস্য কী

সারা পৃথিবী কাঁপছে করোনায়। হু হু করে বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। একে একে লকডাউনে গেছে বিশ্বের অনেক দেশ। করোনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বেশির ভাগ দেশই বন্ধ করে দিয়েছে সীমান্ত। নৌবন্দর, বিমানবন্দর সব বন্ধ। সব ধরনের যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। লকডাউনে থাকা মানে গৃহবন্দী জীবন কাটছে সবার। ব্যবসা বন্ধ। বন্ধ বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা পালনে কঠোর ভূমিকা রাখছে সেনা ও পুলিশ বাহিনী। ওয়ার্ল্ডোমিটার অনুযায়ী গতকাল করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের ২০৭টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস মহামারী কাউকে ছাড়ছে না। পৃথিবীর এই কঠিন মুহূর্তে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এখনো পৌঁছায়নি ১৮টি দেশে। এগুলোর বেশির ভাগ বিচ্ছিন্ন দ্বীপরাষ্ট্র। বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না থাকায় এ দেশগুলো এখনো করোনা থেকে মুক্ত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। চীন, তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর লকডাউনে কঠোর কোয়ারেন্টাইন পালন করে দারুণ সফলতা পেয়েছে। সে পথেই হেঁটেছে এখনো করোনামুক্ত দেশগুলো। করোনামুক্ত দেশগুলো হলো- কমোরোস, কিরিবাতি, লেসোথো, মার্শাল আইল্যান্ডস, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরু, উত্তর কোরিয়া, পালাউ, সামোয়া, সাও তোমে অ্যান্ড প্রিনসিপ, সলোমোন আইল্যান্ডস, দক্ষিণ সুদান, তাজিকিস্তান, টোঙ্গা, তুর্কমেনিস্তান, টুভালু, ভানুয়াতু ও ইয়েমেন। এসব দেশে করোনা না পৌঁছানোর কারণ হতে পারে আগে থেকেই জরুরি অবস্থা জারি, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ও দ্বীপরাষ্ট্রগুলো দুর্গম অঞ্চলে। পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি এসব দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভ্রমণকারীদের জন্য অসুবিধার। বলা যেতে পারে উত্তর কোরিয়া ও ইয়েমেনের কথা। ইয়েমেনে সৌদি সামরিক জোটের হামলা ও বিদ্রোহীদের যুদ্ধ থাকায় কেউ এ দেশে ভ্রমণ করে না। উত্তর কোরিয়াও পর্যটক প্রবেশে সর্বোচ্চ সতর্ক। অন্য দেশগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। এসব দেশে শৌখিন পর্যটক ছাড়া তেমন কেউ যায় না। ব্যবসা বা অন্যান্য প্রয়োজনে এসব দ্বীপরাষ্ট্রের নাগরিকরা সচরাচর বিশ্বভ্রমণে উৎসাহী নয়। সামাজিকভাবে তারা অনেক বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করে। এ ছাড়া এসব দেশে মানুষের সংখ্যা যেমন কম, তাদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের সক্ষমতাও উন্নত দেশগুলোর মতো নয়। তাই তারা সতর্ক করোনা থেকে বাঁচতে। যেমন দ্বীপরাষ্ট্র নাউরুতে কোনো করোনা  আক্রান্তের খোঁজ না পাওয়া গেলেও দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। নাউরুর মতো কিরিবাতি, টোঙ্গা, ভানুয়াতু ও অন্যান্য ছোট দ্বীপরাষ্ট্রে করোনা আক্রান্ত রোগীর খোঁজ না পেলেও পূর্ব সতর্র্কতা হিসেবে তারা জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেছে। এসব দেশে কেন করোনা পৌঁছায়নি- এমন প্রশ্ন সবার মুখে। তারা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে এখন পর্যন্ত করোনামুক্ত বলে মত দিয়েছেন বেশির ভাগ বিশ্লেষক। এ ছাড়া এসব দেশ চীনে করোনা বিস্তারের ঘটনার পর থেকেই কঠোর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মেনে চলে আসছে। সামান্য জ¦রে আক্রান্ত হলেও তাকে দ্রুত আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কয়েক মাস আগে থেকেই এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় এখনো করোনাভাইরাস তাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। তবে কতদিন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে তারা করোনা থেকে দূরে থাকবে সে নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন করোনা পৃথিবীর বুকে বতর্মান গতিতে বিস্তার লাভ করতে থাকলে তারা করোনামুক্ত থাকতে পারবে না। কোনো এক মাধ্যমে ঠিকই করোনাভাইরাস সেখানে পৌঁছে যাবে। তবু অনুন্নত, ছোট ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এ দেশগুলো করোনাকে এখনো ঠেকিয়ে রাখতে যে পদক্ষেপ নিয়েছে ও সচেতনতার উদাহরণ তৈরি করেছে তা পুরো বিশ্বের জন্যই মডেল। করোনার বিস্তার রোধে এ দেশগুলোর শক্ত পদক্ষেপের একটি কারণ হলো অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা ও উন্নত চিকিৎসা সামগ্রীর অভাব। এমনকি কয়েকটি দ্বীপরাষ্ট্রের কাছে ভেন্টিলেটরও নেই। এসব দেশের নাগরিকরাও নিজে থেকে বেশ সচেতন। তারা বহির্বিশ্বের সঙ্গে সাধারণত তেমন যোগযোগ করেন না। পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে তারা বেশ আগে থেকেই সতর্ক ছিল। এত সতর্কতার পর তারা কতদিন করোনামুক্ত থাকতে পারে সেটাই দেখার বিষয়।

চিফ রিপোর্টার, সাইফ শোভন, ঢাকানিউজ২৪.কম