কারা পাচ্ছে প্রণোদনা স্পষ্ট নয়

সুমন দত্ত: করোনা ভাইরাসের দিনে দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সচেতনতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ক্লিনিক থেকে চিকিৎসক উধাও, জানাযা থেকে মুসুল্লি উধাও। সবাই মাস্ক পরছেন। ব্যাংকের কর্মচারী, ডিসিরা পিপিই (পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট) পরে বসে আছেন। রোগটিকে সিরিয়াসলি নিয়েছে গোটা দেশ। আইন মানে না যে জাতি, করোনা ভাইরাস তাকে আইন মানাতে বাধ্য করছে। সরকারের নির্দেশে ঘরে বসে দিন কাটাচ্ছে দেশের সিংহভাগ মানুষ। সরকারের ডাকে জাতি সাড়া দিয়েছে। এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

করোনার এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ক্ষতি বেসরকারি খাত। সরকার এই বেসরকারি খাতকে কীভাবে মোকাবিলা করবে তা পরিষ্কার হলো না। রবিবার সকাল ১০ টায় প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেন। সংবাদ সম্মেলনে কোনো সাংবাদিক উপস্থিত ছিল না।

সংবাদ সম্মেলন না বলে একে ছোট খাট বাজেট সম্মেলন বলাই ভালো। প্রণোদনা দেবেন। ভালো কথা। কাদের দেবেন? তাদেরকে আগে চিহিৃত করতে হবে। সারা বছর যারা সফল ব্যবসা করে, তাদের প্রণোদনা দিয়ে কোনো লাভ নেই। যে মিডিয়া সাংবাদিকদের বেতন দেয় না তাদের আর্থিক সুবিধা দিয়ে কোনো লাভ নাই। ওই সাহায্য সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছাবে না। গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেবেন? কিসের জন্য দেবেন? এরা শ্রমিকের রক্ত চুষে আঙুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে। দেশের শ্রমকে সস্তা করেছে এই গোষ্ঠী। এদেরকে প্রণোদনা দেয়া মানে তেলা মাথায় তেল দেয়া। গাড়ী ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেবেন? দরকার নেই। পুরান গাড়ি বিক্রি করে এরাও লালে লাল। এদের প্রণোদনা দিয়ে কোনো লাভ নেই। ওষুধ শিল্পেও প্রণোদনা দিয়ে কোনো লাভ নাই। কারণ দেশের ওষুধ ব্যবসায়ীরা নিত্য পণ্যের ব্যবসাও করে থাকে। আর এই বন্ধে তাদের ব্যবসা চলেছে।

প্রণোদনা দিতে হবে গরীবদের। খেটে খাওয়া মানুষদের। বন্ধের কারণে দেশের দিনমজুর, ক্ষুদ্র দোকানদার, শপিং মলের কর্মচারী সরাসরি ক্ষতির শিকার। তাদের হাতে সরকারি প্রণোদনা তুলে দিতে হবে। রাস্তায় বসে সারাদিন যিনি ফুচকা বিক্রি করতেন, তিনি কীভাবে পাবেন সরকারি প্রণোদনা? গরীব রিকশাওয়ালা কিংবা নির্মাণ শ্রমিক কীভাবে পাবে সরকারি প্রণোদনা? এগুলো কারো কাছে পরিষ্কার নয়। এমনকি যে অর্থ সচিব প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার ওপর নিজের নোট প্রকাশ করলেন তার মুখেও এদের বিষয়ে কিছু শোনা গেল না।

সরকারি সাহায্য যাবে বড়লোকদের পেটে। তারা আরোও আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হবে। পরিশেষে এই চিত্রই দেখতে হবে।

দুধ একটি শিশু খাদ্য। করোনা ভাইরাসের কারণে দুধের দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা ঠিক হয়নি। এটা ভেবে দেখা উচিত ছিল। করোনা সম্পর্কে সরকারের নির্দেশনা হতে হবে স্বচ্ছ। সরকার পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। অথচ টিভিতে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ বি এম আবদুল্লাহ বলে বেড়াচ্ছেন মাস্ক সবাইকে পরতে হবে না। যিনি করোনায় আক্রান্ত তাকেই পরতে হবে। এতে মানুষ বিভ্রান্তিতে পরছে। রাস্তায় পুলিশ সেনা সদস্যদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে পরছে। যা আমাদের কাম্য নয়।

বাংলাদেশে করোনার আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যু সংখ্যা কম। তাই প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিদিন এক হাজার রোগীর করোনা পরীক্ষা করতে হবে। এই নির্দেশের পর একদিনে ৫০০ উপর পরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু হাজার হলো না। পরীক্ষা করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। করোনা চিকিৎসায় ভেন্টিলেটর একটি দরকারি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্র। এই যন্ত্র দেশে কম। আমদানি করা হচ্ছে। তবে এই যন্ত্র যারা পরিচালনা করেন সেই অ্যানেসথেসিওলজিস্ট বাংলাদেশে অল্পই আছে। আইসিইউতে ভেন্টিলেটরে চিকিৎসা দেয় অ্যানেসথেশিওয়ালজিস্টরা। সরকারের কাছে তাদের দাবি দাওয়া আছে। তাদের কোনো শিডিউল নেই। তারা চাপে কাজ করেন। তাদের কাজ কে চাপ মুক্ত করতে হবে। অ্যানেসথেসিওলজিস্টদের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

করোনা ভাইরাস ছড়াতে প্রবাসীদের ভূমিকা রয়েছে। এতে প্রবাসীরা ট্রোজান হর্সে পরিণত হয়েছে। তাই এই ট্রোজান হর্স ভাইরাসকে কোয়ারান্টেনে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই অনুসারে কোয়ারেন্টেনের ব্যবস্থা করতে হবে। নূন্যতম ব্যবস্থা প্রবাসীদের দিতে হবে। কেউ যাতে ওই সময় সরাসরি বাড়িতে ফিরতে না পারে এটা নিশ্চিত করতে হবে। যারা প্রবাসে আটকা পড়ে আছেন তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনার জন্য সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা সময়োচিত। সব ধরনের সরকারি বিল দেরিতে দিলে জরিমানা করা হবে না। এটা একটা স্বস্তিদায়ক ঘোষণা। জনগণ উপকৃত হয়েছে এতে। তার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ।

ঢাকায় অনেক বাড়ির মালিক ভাড়া দিয়ে সংসার চালান। তাদের একমাত্র আয় বাড়ি ভাড়ার টাকা। এটা অনেকের ক্ষেত্রে মাফ করা সহজ নয়। তবে যারা পারবেন তারা এটা করতে পারেন। সরকারকে এ নিয়ে পীড়াপীড়ি করা উচিত নয়। এমনেতেই বহু ভাড়াটিয়া বাকীতে ভাড়া থাকেন। আর এই সুবিধা বাড়িওয়ালার সঙ্গে আলোচনা করেই ঠিক করেন ভাড়াটিয়ারা। করোনার কারণে বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়াদের প্রতি কঠোর হবেন না। এমটাই আমার আশা। করোনা বিরুদ্ধে যুদ্ধ আমাদের সবার। এটা সরকারের একলা যুদ্ধ নয়। সবাই সবার অবস্থান থেকে এই যুদ্ধ করতে হবে। দুর্যোগে পুরো দেশকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ধৈর্যের সঙ্গে একে মোকাবেলা করতে হবে। আশা করি এই করোনা দুর্যোগ কেটে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক