সংখ্যালঘু পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশংসায় ভাসছেন র‍্যাব কমান্ডার শামীম আনোয়ার

এস আর অনি চৌধুরী, মৌলভীবাজার :: বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যারাত। মৌলভীবাজারের আকাশে তখন ঘন কালো মেঘ, বৃষ্টি- ঝড়ো হাওয়ার সাথে বিজলিও চমকাচ্ছে থেকেথেকে। বৃষ্টির কারনে বেশিরভাগ সংস্থার ত্রাণ তৎপরতাও গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এ সময় হঠাৎ শ্রীমঙ্গল র‍্যাব ক্যাম্প কমান্ডার এএসপি মো. আনোয়ার হোসেন শামীম’র কাছে খবর আসে শ্রীমঙ্গল উপজেলাধীন ঢুলিপাড়া বস্তি এলাকার অনেকগুলো সংখ্যালঘু পরিবার সারাদিন অভুক্ত অবস্থায় আছে। এখনি ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব না হলে রাতেও সন্তানসন্ততি নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে খেটে খাওয়া এ মানুষগুলোকে।

সংবাদ পেয়ে ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই দুর্গতদের নিকট ছুটে যান এই র‍্যাব কর্মকর্তা। গাড়ি চলাচলের রাস্তা নেই বিধায় তিনি ও তার সঙ্গীয় অন্যান্য র‍্যাব সদস্যরা দুই হাতে ত্রাণের বস্তা বহন করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাদাপানি মাখামাখি হয়ে অভুক্ত মানুষগুলোর নিকট পৌঁছান এবং মোট ১৫ টি পরিবারের নিকট পৌঁছে দেন চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। এসময় তিনি ভুক্তভোগ পরিবারগুলোকে সরকারি সাহায্য পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসও দেন।

সাহায্যপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম ঢুলিপাড়া বস্তির বাসিন্দা বিধবা সন্ধ্যা রানী কর, যিনি তার দুই শিশু কন্যাসহ সারাদিন অভুক্ত অবস্থায় ছিলেন। সূর্য পাটে যেতেই ঝড়বৃষ্টির আভাস দেখে নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন যে, সকাল থেকে যে ত্রাণের আশায় বসে আছেন, রাতেও সেটা আর পাওয়া হচ্ছে না। সকাল এবং দুপুরের মতো রাতেও তার সন্তানদের মুখে এক মুঠো দানাপানি তুলে দিতে পারবেন না ভেবে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন এ মধ্য বয়স্ক নারী।

এমন সময় বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে খাদ্যসামগ্রীর বস্তা নিয়ে তাদের পাড়ায় হাজির হন র‍্যাব কমান্ডার এএসপি মো. আনোয়ার হোসেন শামীম।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সন্ধ্যা রানী বলেন, “বৃষ্টি বাদলা হতে দেখে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম যেন, সারাদিনের উপোস বাচ্চাগুলোকে রাতেও আর উপোস না থাকতে হয়। আমি না খেয়ে থাকি থাকি, বাচ্চাগুলোর একটা ব্যবস্থা যেন হয়। এমন সময় ভগবান র‍্যাব স্যারকে চালডাল দিয়ে আমাদের কাছে পাঠিয়েছেন”।

পরবর্তীতে এ নিয়ে নিজের আইডিতে এবং ফেসবুক পেজ Shamim Anwar এ একটি ভিডিও পোস্ট করেন এ র‍্যাব কর্মকর্তা। যেখানে দেখা যায় খাদ্য সাহায্যের প্যাকেট নিতে গিয়ে অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলছেন বিধবা সন্ধ্যা রানী কর। এএসপি আনোয়ার এসময় বোন সম্বোধন করে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। ফেসবুক পোস্টের পর থেকেই নেটিজেনদের প্রশংসায় ভাসছেন তিনি। জনৈক রেজাউল ভুইয়া লিখেন, “সারা বাংলাদেশ একদিন আপনার মত মানবিক মানুষে ভরপুর হবে এটাই প্রত্যাশা রইলো। আর অনেক অনেক দোয়া রইলো আপনার জন্য”। আজিম উদ্দিন নামের অন্য আরেকজন লিখেন, “চোখে পানি চলে আসলো। ধন্যবাদ স্যার। এভাবে সবাই মানুষের পাশে থাকতে হবে”।

পাঠকদের জন্য র‍্যাব কর্মকর্তার ফেসবুক স্ট্যাটাসটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো-

“”আজ সন্ধ্যায় বাইরে যখন ঘনঘোর বর্ষণ, বেশিরভাগ সংস্থার ত্রাণ তৎপরতা যখন ‘আজকের জন্য’ বন্ধ, তখন আমি এবং আমার টিম RAB-9 ছিলাম উপোস মানুষগুলোর দুয়ারে দুয়ারে। বৃষ্টির পানিতে আসল আগুন নিভলেও ক্ষুধার আগুন তো আর নেভে না। যে বিধবা আজ সকাল থেকে দুই শিশুসন্তান নিয়ে না খেয়ে আছে, সে-ই জানে ক্ষুধার জ্বালা কি জিনিস! তাই এ ঝঞ্ঝাময় বাদলধারার দিনে অন্য অনেকের ত্রাণ তৎপরতা থেমে যাওয়ার মুহূর্তে আজ আমাদের ছিল বর্ধিত আয়োজন। অন্যদের জায়গাগুলোতেও তো আজ আমাদের যেতে হবে!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আদেশ অনুযায়ী ঘরেঘরে যেয়ে ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছি। সত্যি বলছি এই মহিলার কান্না দেখে আমি নিজেরই চোখের পানির বাধ মানাতে পারিনি। তাঁর কাছ থেকে আমাদের কতো কিছু শিক্ষনীয়! না খেয়ে আছেন, তবুও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঘরের বাইরে যান নি। সবাইকে বলছি, প্লিজ আর কয়েকটি দিন ধৈর্য ধরুন। সাময়িক কষ্ট হলেও প্লিজ সবাই ঘরে থাকুন। ত্রাণ আপনার কাছে পৌছে যাবেই। করোনা পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করে ইনশাআল্লাহ ঘুরে দাঁড়াবেই এই অপরাজেয় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বের বাংলাদেশ ইনশাআল্লাহ পরাজিত হতে পারে না, পরাজিত হবে না। [Md. Anwar Hossan (Shamim Anwar), এএসপি, র‍্যাব-৯, সিলেট। কমান্ডার, শ্রীমঙ্গল র‍্যাব ক্যাম্প।]

প্রসঙ্গত, মো. আনোয়ার হোসেন শামীম খাগড়াছড়ি জেলার উত্তর বড়বিল গ্রামের আব্দুল মান্নান এবং বিলকিস বেগম দম্পতির তৃতীয় সন্তান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গহণ করার পর ৩৪ তম বিসিএস পরীক্ষায় মেধাতালিকায় ১১তম স্থান অর্জন করে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন। র‍্যাবে যোগদানের পূর্বে তিনি চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এএসপি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।