একজনও যেন অভুক্ত না থাকে: শেখ হাসিনা

নিউজ ডেস্ক:   করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ঘোষিত ছুটিতে বিপাকে পড়া খেটে খাওয়া মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এই ছুটিতে শ্রমজীবী ও দিনমজুরসহ নিম্নআয়ের মানুষদের সমস্যা বেশি। তাই ওয়ার্ড পর্যন্ত তালিকা করে তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। কেউ যেন অভুক্ত না থাকে। মঙ্গলবার সকালে গণভবন থেকে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় এখন থেকেই প্রস্তুতির নির্দেশনা দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় যেসব শ্রেণি বা ব্যক্তি আগে থেকেই সহায়তা পেয়ে আসছে, তাদের জন্য তা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু এর বাইরেও যাদের প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাদের জন্য আলাদা তালিকা করতে হবে। প্রয়োজনে আমরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেব। আল্লাহর রহমতে আমাদের কোনো অভাব নেই। আমাদের খাদ্যও যথেষ্ট পরিমাণে মজুদ আছে। তাই আমরা তাদের অর্থ দেব, তাদের কাছে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দেব। আমি চাই না, আমার দেশের মানুষ যেন খাবার বা অর্থের জন্য কষ্ট পায়।

এই সহায়তা কর্মসূচিতে যেন কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, আমি আগেই সাবধান করছি, এ ধরনের কোনো অভিযোগ যদি পাই, আমি কিন্তু কাউকে ছাড়ব না। মানুষের দুঃসময়ের

সুযোগ নিয়ে কেউ অর্থশালী, সম্পদশালী হয়ে যাবে, সেটি আমরা কখনো বরদাস্ত করব না।

নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যারা একটু বিত্তশালী আছেন, তাদের যেমন দায়িত্ব পালন করতে হবে, একইভাবে প্রশাসনকেও দায়িত্ব নিতে হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। এটিকে নিজের কর্তব্য হিসেবে নিতে হবে।

ছুটি বাড়লেও সীমিত যান চলাচল

ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত থাকা মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর কাছে নববর্ষ উদযাপন ও সাধারণ ছুটি বাড়ানোর বিষয়ে নির্দেশনা চান। এতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি বর্ধিত করতে হবে। তবে এটা সীমিত আকারে থাকবে। কিছু কিছু মানুষের চলাফেলার সুযোগ করে দিতে হবে। কারণ সব জায়গায় যখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ সেভাবে নেই, তাই মানুষকে একেবারে ঘরে আটকানো যাবে না। যানবাহন চলাচলের বিষয়টি সীমিত রাখতে হবে।

বাইরে নয় নববর্ষের অনুষ্ঠান

করোনা ভাইরাসের ঝুঁকির কারণে বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান পালনে সবাইকে নিরুৎসাহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এই নববর্ষ আমাদের প্রাণের উৎসব। কিন্তু এ বছর আমরা ১৭ মার্চ ও ২৬ মার্চের সব অনুষ্ঠান সীমিত করেছি। কোনো ধরনের জনসমাগম যেন না হয়, আমরা সে নির্দেশনা দিয়েছি। নববর্ষের জন্যও একই নির্দেশনা থাকবে। বাইরে অনুষ্ঠান না করতে পারলেও বাংলা নববর্ষে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় অনুষ্ঠান করে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মন্দা মোকাবিলায় প্রস্তুতি এখনই

করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে তা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ খাদ্য উৎপাদনসহ সার্বিক পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এখন যেটা হচ্ছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এর পর আরেকটা ধাক্কা আমাদের আসবে। সারাবিশ্ব স্থবির হয়ে আছে। অর্থনৈতিক কর্মকা- স্থবির হয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে বিরাট আকারে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে। সেই মন্দা মোকাবিলায় এখন থেকেই আমাদের পরিকল্পনা নিতে হবে।

দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ থাকলেও খাদ্য উৎপাদন অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, কারও এক ইঞ্চি জমি যেন অনাবাদি না থাকে, কোনো জলাশয় যেন পড়ে না থাকে। যা পারেন, যেটা পারেন, একটা কিছু ফসল ফলান; তরিতরকারি করেন বা হাঁস-মুরগি বা খামার করেন। এটা অব্যাহত রাখতে পারলে দেশের চাহিদা তো আমরা মেটাতে পারবই, অন্য দেশকেও প্রয়োজন হলে সাহায্য করতে পারব। আল্লাহর রহমতে সেই সক্ষমতা আমাদের আছে।

রোগ লুকালে ঝুঁকিতে পড়বেন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ছোট দেশ, বিশাল জনসংখ্যা। আমরা সচেতনতা তৈরি করতে পেরেছি। সবাই যার যার জায়গা থেকে দায়িত্ব পালন করেছে বলেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি। এখনো সচেতন থাকা দরকার। আইইডিসিআর কাজ করছে। শুধু ঢাকা নয়, বিভাগীয় পর্যায়ে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করছি। করোনা লক্ষণ দেখা গেলে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে নাগরিকদের প্রতি তিনি বলেন, লুকোচুরি নয়। লুকোচুরি করলে নিজেই নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলবেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে সচেতন হয়েছি বলেই তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো আমাদের অবস্থা খুব খারাপ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সব নির্দেশনা আমরা অনুসরণ করছি। চীনে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর বড় কর্তব্য মনে করেছি জনগণের নিরাপত্তা দেওয়া। এ কারণে মুজিববর্ষের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানসহ সব অনুষ্ঠানে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়।

সবার পিপিই প্রয়োজন নেই

ব্যক্তি সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা থাকতে পারে উল্লেখ করে এটি কারা ব্যবহার করবেন সে বিষয়ে আইইডিসিআরকে সচিত্র নির্দেশনা জারি করতে বলেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, পিপিই সত্যিকার অর্থে যাদের প্রয়োজন, তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। যাদের প্রয়োজন নেই, তাদের পিপিই পরার প্রয়োজন নেই। যারা রোগীদের সরাসরি সেবা দেবেন, তাদের পিপিই অবশ্যই পরতে হবে। কিন্তু হাসপাতালেও যারা সরাসরি রোগী দেখবেন না, তাদের পিপিই প্রয়োজন নেই।

গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন। এ ছাড়া সচিবালয় প্রান্তে যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর অধীন বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা।