নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখার চেষ্ঠা

নিউজ ডেস্ক:   করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং রমজানে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া আমদানির পাইপলাইনে আছে আরও বিপুল পরিমাণ পণ্য। তাই করোনা মোকাবেলায় বিভিন্ন জেলা লকডাউন হলেও আসছে রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক থাকবে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তারপরও যদি কেউ কারসাজি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে ইতোমধ্যে সরকারের ১১ সংস্থাকে মাঠে নামানো হয়েছে। সংস্থাগুলো হল- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল, র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), কৃষি বিপণন অধিদফতর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি কর্পোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনিটরিং টিম। এছাড়া নিত্যপণ্যের বাজারে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিও থাকবে।

বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন বলেন, আমাদের কাছে যে তথ্য আছে তাতে দেশে নিত্যপণ্যের সংকট নেই। সরবরাহেও কোনো ঘাটতি হবে না। এছাড়া অন্যান্য পণ্যের সরবরাহ এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। কারণ আমাদের চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে মজুদ আছে।

তিনি বলেন, ‘আশা করছি করোনার প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না। এছাড়া আসন্ন রমজানেও পণ্যের দাম বাড়বে না। দাম ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। কারসাজি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর কৌশল নেয়া হলে দায়ী ব্যবসায়ীকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। তিনি আরও বলেন, ভোক্তাকে আতঙ্কিত হওয়া যাবে না। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য কেনা থেকে বিরত থাকতে হবে। ট্যারিফ কমিশন পণ্যের চাহিদা, মজুদ, আমদানি পরিস্থিতি ও সরবরাহ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতি বছর দেশে চিনির চাহিদা ১৮ লাখ টন।

আর প্রতি মাসে চিনির চাহিদা এক লাখ ৩৫ হার্জান টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসে চাহিদা ৩ লাখ টন। স্থানীয়ভাবে দেশে উৎপাদন হয়েছে ৬২ হাজার টন। এছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ১৮ লাখ ৭৫ হাজার টন। সব মিলিয়ে দেশে সরবরাহ ১৯ লাখ ৩৭ হাজার টন। সেক্ষেত্রে দেখা যায় পুরো বছরের চাহিদার তুলনায় দেশে বর্তমানে এক লাখ ৩৭ হাজার টন চিনি বেশি আছে। এছাড়া আরও বিপুল পরিমাণ চিনি আমদানির পাইপলাইনে আছে।

দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২০ লাখ টন। মাসে চাহিদা এক লাখ ৫০ হাজার টন। এর মধ্যে শুধু রমজানে চাহিদা ৩ লাখ ৫০ হাজার টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়েছে ২ লাখ ১৭ হাজার টন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার টন। মোট সরবরাহ ২৩ লাখ ৭৫ হাজার টন। সেক্ষেত্রে বর্তমানে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন ভোজ্যতেল চাহিদার তুলনায় বেশি আছে।

দেশে বছরে মসুরের ডালের চাহিদা ৫ লাখ টন। এক মাসে চাহিদা ৩৮ হাজার টন। এর মধ্যে শুধু রমজান মাসে চাহিদা ৮০ হাজার টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার টন। এছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ২ লাখ ৯০ হাজার টন। সেক্ষেত্রে দেশে মোট সরবরাহ ৫ লাখ ৪২ হাজার টন। দেখা যায়, চাহিদার তুলনায় বর্তমানে দেশে ৪২ হাজার টন ডাল বেশি আছে।

দেশে আদার চাহিদা বছরে ৩ লাখ টন। এক মাসে চাহিদা ২০ হাজার টন। শুধু রমজানে চাহিদা ৩৫ হাজার টন। দেশে উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার টন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে এক লাখ টন। মোট সরবরাহ ৩ লাখ ১৮ হাজার টন। সেক্ষেত্রে দেখা যায় দেশে এখনও চাহিদার তুলনায় ১৮ হাজার টন বেশি আছে। দেশে রসুনের চাহিদা বছরে ৬ লাখ টন। এর মধ্যে মাসে চাহিদা ৪৫ হাজার টন। শুধু রমজান মাসে চাহিদা ৮০ হাজার টন। স্থানীয় উৎপাদন ৫ লাখ ৫২ হাজার টন।

দেশে পেঁয়াজের চাহিদা বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন। প্রতি মাসে গড়ে এক লাখ ৭৩ হাজার টন চাহিদা থাকলেও রোজার মাসে চাহিদা থাকে ৫ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে এখন পর্যন্ত ১৭ লাখ ৮৬ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে ৭ লাখ ৫৭ হাজার টন। সব মিলে এখন দেশে পেঁয়াজের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে ২৫ লাখ ৪৩ হাজার টন। সেক্ষেত্রে পেঁয়াজ বেশি আছে এক লাখ ৪৩ হাজার টন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ছোলার বার্ষিক চাহিদা এক লাখ টন। এর মধ্যে রমজানে চাহিদা ৮০ হাজার টন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ৫ হাজার টন। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আমদানি করা হয়েছে এক লাখ ৬৩ হাজার টন ছোলা। এতে দেশে ছোলার মোট সরবরাহ এক লাখ ৬৮ হাজার টন। সুতরাং এ মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় ৬৮ হাজার টন বেশি ছোলার মজুদ রয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য মতে, (১৫ মার্চ ২০২০) খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাতকৃত মোট মজুদ ১৭ লাখ ৫১ হাজার টন। এর মধ্যে চাল ১৪ হাজার ২৯ লাখ টন এবং গম ৩ লাখ ২২ হাজার টন। 

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, মূলত কয়েকটা কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। এর মধ্যে একটি হল- চাহিদার তুলনায় পণ্য সরবরাহ কম থাকা। তাই সরকারের কঠোর নজরদারি রাখতে হবে, যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি করতে না পারে।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, বছরজুড়ে আমাদের সার্বিক অভিযান অব্যাহত আছে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে অনেকেই কারসাজি করে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করায় ইতোমধ্যে অসাধুদের শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। তাই ভেজাল খাবারসহ বেশি মূল্যে পণ্য বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।