করোনায় বিপর্যয়ের মুখে অর্থনীতি

আসাদ জোবায়ের:   চীনসহ বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের বিস্তৃতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন মানুষ। আরেকটি বিশ্ব মন্দার প্রাক্কলন করেছেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিবিদগণ। আগের বিশ্ব মন্দাগুলোর প্রভাব বাংলাদেশ কাটিয়ে উঠতে পারলেও এবার তা কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এবার চীনের অর্থনীতি প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। আর বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্প খাতের উৎপাদন সরাসরি চীনের কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক রিপোর্টে দেখা গেছে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সঙ্কুচিত হওয়ায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ১৪টি খাত। এর মধ্যে কিছু কিছু খাতের উৎপাদন সরাসরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ এসব খাতের কাঁচামালের বিকল্প উৎস জানা নেই ব্যবসায়ীদের। বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে সম্প্রতি এক চিঠিতে বিশেষ নীতি সহায়তা, ঋণ সহায়তা এবং আমদানি দায় পরিশোধে দেরির কারণে কাউকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করার উদ্যোগ নিতে সুপারিশ করেছেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লেখা অন্য এক চিঠিতে একই দাবি জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাসচিব হোসাইন জামিল। এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের পাঠানো এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৪টি খাত সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ প্রতিবেদনে বেশকিছু খাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরা হয়েছে। আবার কিছু কিছু খাতে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস বিশ্ব বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত- সব দেশের বাণিজ্যে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশে আমদানি করা প্রাথমিক কাঁচামাল, মধ্যবর্তী কাঁচামাল ও সম্পূর্ণায়িত পণ্যের সিংহভাগ চীন থেকে আমদানি করা হয়। করোনা ভাইরাসের ফলে চীনের স্থানীয় উৎপাদন থেকে শুরু করে রফতানি বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের বাণিজ্যে ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার ও লেদার গুডস শিল্প মোট যে পরিমাণ রফতানি করে তার মধ্যে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ রফতানি করা হয় চীনে। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এ খাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং খাতে বার্ষিক চার বিলিয়ন ডলারের কাঁচামাল দরকার হয়। যার ৪০ শতাংশ চীন থেকে আসে। কাঁচামালের প্রাপ্তি বিঘ্নিত বা সঙ্কুচিত হবে বা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়ায় এ শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, প্রায় এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

তথ্যমতে, চীন থেকে কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিস খাতে প্রতি মাসে আমদানির পরিমাণ ২০০ কন্টেইনারেরও বেশি। যার মূল্য প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। বর্তমানে চীন থেকে এসব পণ্য আমদানি ও জাহাজীকরণ বন্ধ আছে। তৈরি পোশাকের মধ্যে ওভেন খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ ফেব্রিক্স চীন থেকে আমদানি হয়। করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এ শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি হবে। তবে এখনো সেটি নিরূপণ সম্ভব হয়নি। ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলমান।

আর নিট পোশাক খাতের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি হয়। এ ছাড়া নিট ও ডায়িং কেমিক্যাল এবং অ্যাক্সেসরিজের ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আমদানি হয় চীন থেকে। এ খাতেরও ক্ষতি নিরূপণের বিষয়টি চলমান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৫ জানুয়ারি থেকে চীনে কাঁকড়া ও কুচে রফতানি বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ কাঁকড়া ও কুচে চীনে রফতানি হয়। স্থানীয় বাজারে এসব পণ্যের কোনো চাহিদা নেই।

তাই পণ্যগুলো রফতানি করতে না পারায় গত এক মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকার জীবন্ত কাঁকড়া ও কুচে মারা গেছে। মজুদ করা পণ্য রফতানি করতে না পারলে ক্ষতির পরিমাণ ৩৫০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, কাঁচামাল ও মেশিনারিজসহ বিভিন্ন মেশিনের স্পেয়ার পার্টস যেমন- ইনজেকশন মোল্ডিং, প্রিন্টিং, এক্সটরশন মেশিনের পার্টস চীন থেকে আনতে হয়। এসব পণ্যের সরবরাহ বন্ধ হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ সেক্টর হুমকির সম্মুখীন।

এ ছাড়া বাংলাদেশে আমদানি করা মেশিনারি ও স্পেয়ার পার্টসের শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ চীন থেকে আসে। আমদানি ও জাহাজীকরণ বর্তমানে বন্ধ আছে। এ খাতের আর্থিক ক্ষতি নিরূপণের কার্যক্রম কমিশনে চলমান। জুট স্পিনার্স পণ্য চীনে রফতানির পরিমাণ বছরে আনুমানিক ৮১ হাজার মেট্রিক টন। যার মূল্য প্রায় ৫৩২ কোটি টাকা। চীনে রফতানি ও জাহাজীকরণ বর্তমানে বন্ধ আছে।

এ খাতের আর্থিক ক্ষতি নিরূপণের কার্যক্রমও চলমান। এদিকে বছরে প্রায় ১৮০ কোটি ডলারের মুদ্রণশিল্পের কাঁচামাল চীন থেকে আমদানি হয়। বর্তমানে আমদানি ও জাহাজীকরণ বন্ধ আছে। এ খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩৬০ কোটি ডলার। তথ্যমতে, মেডিকেল ইন্সট্র–মেন্ট অ্যান্ড হসপিটাল ইকুইপমেন্ট চীন থেকে বার্ষিক প্রায় ২৫ কন্টেইনার আমদানি করতে হয়। বর্তমানে আমদানি ও জাহাজীকরণ বন্ধ আছে।

এ খাতের আর্থিক ক্ষতি নিরূপণের কার্যক্রম চলমান। চশমাশিল্পের কাঁচামাল মোট আমদানির (তৈরি পণ্য ও যন্ত্রাংশ) আনুমানিক ৯৫ শতাংশ চীন থেকে আসে। বর্তমানে চীন থেকে আমদানি ও জাহাজীকরণ বন্ধ আছে। এ খাতের আর্থিক ক্ষতি নিরূপণের কার্যক্রমও কমিশনে চলমান। কম্পিউটার খাত অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল। ইতোমধ্যে কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ, অ্যাক্সেসরিজ ইত্যাদির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে না। টিভি, ফ্রিজ, মোবাইল ফোন, ওভেন, চার্জারসহ ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ৮০ ভাগই আসে চীন থেকে। শিপমেন্ট বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাজারে পণ্যের সঙ্কট দেখা দিতে শুরু করেছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে যে ক্ষতি হচ্ছে সেগুলো কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়ীসহ সকল স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কাজ করছে সরকার।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান মানবকণ্ঠকে বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে চীন কিছুটা সফল হয়েছে। আশা করছি এপ্রিলের মাঝামাঝি এটি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। তবে সারাবিশ্বে এটি ছড়িয়ে পড়ছে, এর ফলে বিশ্ব মন্দা দেখা দিতে পারে। এ ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি করোনা ভাইরাস যাতে কোনোভাবে এদেশে না ঢোকে সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে উৎপাদন, রফতানি, বিভিন্ন প্রকল্পে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। ব্যবসায়ীরা কাঁচামালের বিকল্প সোর্স খুঁজছে। এটি যদিও এত সহজ নয়। আবার অনেক ব্যবসায়ী বিভিন্ন দেশে রফতানির অর্ডার নিতে যান, তারাও যাচ্ছেন না এখন। এগুলোর প্রভাব রফতানিতে পড়ছে।

এদিকে বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিবদগণ ইতোমধ্যেই বিশ্বমন্দার পূর্বাভাস দিচ্ছেন। অনেকটা অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। এশিয়া, ইউরোপের বেশির ভাগ দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বিশ্ব পুঁজিবাজারে ভয়াবহ ধস নেমেছে। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী বিমান পরিবহনে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় এয়ারলাইন্স ব্যবসা স্মরণকালের সর্বোচ্চ লোকসানের মুখে পড়েছে।

যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক রবার্ট ডিঙ্গোয়াল বলেন, চৌদ্দ শতকে ইউরোপে ‘ব্ল্যাক ডেথ’র কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রত্যেকটি বৈশ্বিক মহামারীর পর পরই অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে। আমি মনে করছি না যে, এবার এমন কোনো ভালো কারণে আছে- যার জন্য এটা এবার হবে না। অক্সফোর্ড ইকোনমিকস গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ গেগরি ডাকো বলছেন, যদি সেখানে মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বিশ্বের জন্য এর প্রতিক্রিয়া হবে মারাত্মক।

তিনি বলেন, এটার খুব মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর এটা ঘটলে খুব শিগগিরই অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়বে অর্থনীতি এবং এই সঙ্কট আর্থিক বাজারের আতঙ্ককে ত্বরান্বিত করবে। এদিকে চলতি সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিটে যে দরপতন হয়েছে তা ২০০৮ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সঙ্কটের পর সর্বোচ্চ।