বয়াতিকে গ্রেফতার মানে উগ্রবাদকে বেশি প্রশ্রয় দান

সুমন দত্ত: শরীয়ত বয়াতিকে গ্রেফতার করে সরকার উগ্রবাদীদের বেশি প্রশ্রয় দিয়েছে। জঙ্গিদের জঙ্গি না বলে সন্ত্রাসী বলা উচিত। জঙ্গি ঘটনার পরবর্তী ন্যারেটিভ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। একটি জঙ্গি ঘটনার পেছনে যাদের ভূমিকা তাদের চিহিৃত করা প্রয়োজন। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে উগ্রবাদ রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া দেশের মূলধারার ইলেকট্রনিক মিডিয়ার নীতি নির্ধারক সাংবাদিকরা। অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে সিসার্ফ নামে  দেশের একটি বেসরকারি সংগঠন। এতে সহযোগিতা করেছে পুলিশের সন্ত্রাস বিরোধী ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে সন্ত্রাস ঝুঁকিতে ইউকে আমেরিকার পেছনে আছে। সন্ত্রাস মোকাবিলার আমাদের জাতীয় কোনো কৌশল নেই। এই কৌশল তৈরি করতে সময় প্রয়োজন। তবে উগ্রবাদ রোধে আমরা কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। যেমন এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে এ সম্পর্কে সচেতন করা। মসজিদের ইমামকে দিয়ে উগ্রবাদ বিরোধী বয়ান দেয়া। লিফলেট দেয়া। এসব করতে আমরা বাইরে থেকে কোনো সহায়তা নেয়নি। আমাদের দেশে বিভিন্ন জঙ্গি ঘটনায় যারা আটক হয়েছে তাদের কাছ থেকে এসব জেনেছি। এতে ওইসব পরিবারের সদস্যরাও আমাদের সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, প্রতিটি পরিবারই জানিয়েছে উগ্রবাদে জড়িয়ে যাওয়ার সময় তাদের সন্তানদের মধ্যে পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা গেছে। কিন্তু সময়মত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি। পুলিশের পক্ষ থেকে উগ্রবাদ সম্পর্কে যা বলা হচ্ছে তা সেই সব ঘটনারই অনুবাদ। এটা এর আগে কেউ করে দেখাতে পারেনি। মিডিয়াকে তিনি এ সম্পর্কে আরো জোরালো ভূমিকা রাখার গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমাদের চোখে উগ্রবাদীদের নারী নেতৃত্ব হারাম, অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে লক্ষ্য করা গেছে।

মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, পত্রিকায় আগে ধর্ষিতার নাম পরিচয় বলা হতো। এরপর এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হলে তা বন্ধ হয়। এখন কেউ ধর্ষিতার নাম পরিচয় ছবি খবরে দেয় না। কাদের মোল্লাকে শহীদ বলেছে একটা মিডিয়া। এই ধরনের মিডিয়া উগ্রবাদকে সমর্থন দেয়। এটা বুঝতে হবে। আবার তথাকথিত নিরপেক্ষ মিডিয়া আছে এরা কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীকে স্বাধীনতাকামী বলতে চায়। এরকম নানা চর্চা মিডিয়াতে আছে। গাজা নিয়ে পুরুষ ধরা পড়লে মিডিয়ায় বলা হয় গাজা ব্যবসায়ী আবদুল আজিজ ধরা পড়ল। একই কাজ নারী করলে আমরা বলি মাদক সম্রাজ্ঞী। এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল কিছু নারী সংগঠন। গণমাধ্যম বলতে শুধু প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মাধ্যমকে বিবেচনা করলেই হবে না। সামাজিক মাধ্যম ও ইউটিউবকে ধরতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে ও ইউটিউবে নারী বিদ্বেষ, জাতীয় সংগীত বিদ্বেষ অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে। জনগণের কাছে এসব ম্যাসেজ পৌঁছে যাচ্ছে। এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। শুধু আমাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করা যাবে বলে আমি মনে করি না।

গাজী টিভি ও সারা বাংলা টিভির প্রধান সম্পাদক ইসতিয়াক রেজা বলেন, কাদের মোল্লার ফাঁসির খবর বিশৃঙ্খল ভাবে প্রচার হয়। অথচ এই কাজটি জেল কর্তৃপক্ষ চাইলে সুন্দরভাবে করতো পারতো। কখন ফাঁসি দেয়া হবে আগেভাগে জানালে মিডিয়া ঠিকমত প্রচার করতে পারতো। জঙ্গিবাদের খবর কিভাবে প্রচার করা হবে তা নিয়ে সবার মাঝে আলোচনা দরকার। জঙ্গিকে অনেকে যোদ্ধা বলেন। আসলে তিনি যোদ্ধা কিনা সেটা আগে জানতে হবে। তাদেরকে জঙ্গি না বলে সন্ত্রাসী বলাই সঠিক মনে করি। জিহাদি বই উদ্ধার কিংবা জঙ্গি মতবাদের বই উদ্ধার। এসব ভাষা শব্দ সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে। জঙ্গিবাদের বিরোধী কাউন্টার ন্যারেটিভ আমাদের মিডিয়াতে আসতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই অনেকে আমাদের দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করতে বলেন, যাকে আমরা গুড জার্নালিজম বলি। আসলে গুড ডেমোক্রেটিক কান্ট্রি থেকে গুড জার্নালিজম আশা করা যায়।

মাছরাঙ্গা টিভির প্রতিনিধি বলেন, নিউজের ডিমান্ডের কারণে আমাদের কাদের মোল্লার লাশ যাত্রার ছবি দেখাতে হয়। দেখানো উচিত কিনা সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। কারণ কাদের মোল্লা এমন কোনো ব্যক্তি না যার লাশ যাত্রা সরাসরি প্রচার হতে পারে। তেমনি ভারতের কাশ্মীরে যারা নিহত হচ্ছে তাদের কি বলা হবে এ নিয়ে বিভিন্নজনের ধারণা ভিন্ন। আবার পাকিস্তানের দখল করা কাশ্মীরকে আজাদ কাশ্মীর বলবো কিনা সেটাও জানা উচিত।

এটিএন বাংলার জয় ই মামুন বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম একই সময় হয়েছে। আমরা যখন জঙ্গিদের নিয়ে নিউজ করতাম তখন নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভাবতাম না। এখন নতুনরা অনেক এগিয়েছে। জঙ্গিরাও অনেক এগিয়েছে। জঙ্গিরা এখন জানে মিডিয়াকে কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।তেমনি আমরাও জানি জঙ্গিবাদকে কীভাবে ট্যাকল দেয়া হয়। উভয়ই উভয়রই কাছ থেকে শিখছে। তিনি আরো বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এই সরকারের আমলে অনেক গুলো জঙ্গি ঘটনা ঘটেছে। যেখানে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো হয়েছে। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেনি। এখন তা হয় না। জঙ্গিকে জঙ্গি হিসেবেই দেখা হয়। পাবলিক ডিমান্ডতো পর্নোগ্রাফিও আছে, তাই বলে কি আমরা পর্নোগ্রাফি প্রচার করবো।

মোজাম্মেল বাবু বলেন, জঙ্গি ঘটনার আগে তো অনেক ঘটনা ঘটে। সেখানে রাষ্ট্রের নজর দিতে হবে।আমরা উগ্রবাদ নিয়ে আলোচনা করছি। অথচ যারা উগ্রবাদ তৈরি করছে তাদের দিকে নজর দিচ্ছি না। যারা বোমা ফাটালও তাদের ধরতে ঐক্যবদ্ধ। কথিত আছে এক জঙ্গি বোমা নিয়ে দাড়িয়ে আছে কখন মিডিয়া আসবে। আমাদের দেশে শায়খ আবদুর রহমানকে ধরতে পুলিশের অভিযান তিনদিন পিছানো হয়। কারণ লাইভ দেখানোর যন্ত্রপাতি তখনই ওই টিভি চ্যানেল দেশে নিয়ে আসে নাই। শরীয়ত বয়াতিকে গ্রেফতার করে আপনারা উগ্রবাদীদের বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন। এরা এখন গান বাজনা নিষিদ্ধের দাবি তুলবে। নারীদের ঘরে আটকে রাখার কথা বলবে। গ্রাম মেলা করতে দেবে না। যাত্রা পালা গান করতে দেবে না। এরপর উগ্রবাদীরা হয়ে যাবে মেইনস্ট্রীম আর আমরা হয়ে যাব উগ্রবাদী সেকুলার। তখন ওরা আমাদের নিয়ে সেমিনার করবে। যদি এভাবে চলতে থাকে।

দেশ টিভির সুকান্ত গুপ্ত অলক বলেন, সরকার ডি-র‍্যাডিকেলশনের জন্য কি উদ্যোগ নিয়েছে তা পরিষ্কার নয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র তাদের মত করে তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি আলোচনা করছে। আমরা কি করবো? ওয়াজ মহাফিল নিয়ে কথা উঠছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সেখানে কি ভূমিকা তা জানা যাচ্ছে না। তিন পার্বত্য অঞ্চলে উগ্রবাদ দমন করতে গিয়ে আরো কয়েকটি উগ্র সংগঠন গড়ে উঠছে। এটা কি আমাদের পলিসি সেখানে? উগ্রবাদ দমনে পুলিশের পাশাপাশি মিডিয়াকে পলিসি নেবার সুপারিশ আমার।