ঢাবি হলগুলোতে একটা সিটও খালি নেই

নিউজ ডেস্ক:  প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ১৯২১ সালে ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৪ হাজার ছাড়িয়েছে। শিক্ষার্থী বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসন ব্যবস্থা না বাড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হারাতে বসেছে তার ঐতিহ্য, সম্মুখীন হচ্ছে নানা আলোচনা-সমালোচনার।

যার ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে উচ্চশিক্ষা নিতে আসা মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম। আবাসন সঙ্কট সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নানা সভা সমাবেশ আন্দোলন করলেও আবাসন সঙ্কট সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তেমন অগ্রসরতা এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি। যতটুকু দৃশ্যমান হয়েছে তা মোট আবাসনের তুলনায় খুবই নগণ্য।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসন সমস্যার কেন এত সঙ্কট এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুস্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে আবাসন সঙ্কটের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত রাজনৈতিক সংগঠন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে ঢাবির হলে আবাসনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বড় ভূমিকা পালন করছে। হলের সিট বরাদ্দের নামে প্রশাসন থাকলেও নিয়ন্ত্রণ করে যখন যে রাজনৈতিক দল দেশের ক্ষমতায় থাকে তার সহযোগী বা ভাতৃপ্রতীম ছাত্র সংগঠন। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সুবাদে হল নিয়ন্ত্রণ করছে আওয়ামী লীগের ভাতৃপ্রতীম সংগঠন ছাত্রলীগ।

এখানে হল প্রশাসন দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। হল রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করায় যে শিক্ষার্থী রাজনৈতিকভাবে যত ক্ষমতাসম্পন্ন তারা সবার আগে হলে থাকার সুযোগ পায়, এক্ষেত্রে মেধার গুরুত্ব দেয়া হয় না। বর্তমানে হলে ছাত্রলীগের আধিপত্য থাকায় হলে সিট দেয়ার ক্ষেত্রে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি- সাধারণ সম্পাদকের কথাই চূড়ান্ত।

আধিপত্য থাকায় হলের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক থাকেন সিঙ্গেল রুমে। তার পাশাপাশি তাদের কাছের জুনিয়র নেতারাও সিঙ্গেল রুম বা সিঙ্গেল বেডে থাকে। হলগুলোতে পরিদর্শন করে দেখা যায়, অরাজনৈতিক রুমগুলোতে প্রতি রুমে যেখানে ৮ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকে সেখানে রাজনৈতিক রুমগুলোতে একজন থেকে সর্বোচ্চ চার জন থাকে। তাছাড়া রাজনৈতিক সংগঠন হল পরিচালনার সুবাদে হলে তাদের আশ্রয়ে থাকে অছাত্র, বহিরাগত। অভিযোগ রয়েছে সিঙ্গেল রুমের নেতারা প্রায়ই রুমে মাদক সেবন করেন।

এদিকে হল রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করার পরও নিশ্চুপ বিশ্ববিদ্যালয় হল প্রশাসন। হল প্রশাসনের প্রাধ্যক্ষরা রাজনৈতিক নানা সুবিধা পাবার আশায় তাদের সাথে লেয়াজু করে চলে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি হল প্রশাসন রাজনৈতিক নানা সুবিধা পাবার আশায় হলের রাজনৈতিক দলের নেতাদের নানা নিয়োগ বাণিজ্যসহ টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করেন বলে জানা গেছে।

তবে ডাকসু নির্বাচন হওয়ার পর থেকে আবাসন সঙ্কট কমার বদলে তা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ডাকসু নির্বাচন হওয়ার আগে হলে নেতা ছিল হল ছাত্রলীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু নির্বাচন হওয়ার পরে তাদের সাথে যোগ হলেন আরো দুজন। তারা হলেন হলের ভিপি জিএস। ডাকসু নির্বাচনে হলের ভিপি জিএস নির্বাচিত হওয়ার পর অধিকাংশ হলে নির্বাচিত ভিপি জিএস রুম থেকে অন্যদের বের করে অথবা অন্যরুম খালি করে তাদের রুম সিঙ্গেল করে নিয়েছেন।

যে রুমে কমপক্ষে আটজন থাকত সেই রুমে একাই থাকছেন তারা। শুধু ভিপি-জিএস নয় হল সংসদের দাপটে অনেক নেতা হল সংসদের নেতা হওয়ার পর তাদের রুম সিঙ্গেল করে নিয়েছেন। এতে করে আবাসন সঙ্কট আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।

এফ আর হলের হল সংসদের জিএস রাহিম সরকার থাকেন ৪০৯ নম্বর রুমে। আগে থাকতেন আট জনের কক্ষ ৩১৭ নম্বর রুমে। জিএস হওয়ার পর তিনি সিঙ্গেল রুম নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হলের ভিপি আকমল হোসেন আগে থাকতেন ৩১৭ নম্বর রুমে। এখন থাকেন ২২০ নম্বর সিঙ্গেল রুমে। তবে সিঙ্গেল রুমে থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন তিনি। তাদের মতো অধিকাংশ হল সংসদের নেতারা সিঙ্গেল রুমে থাকেন। সিঙ্গেল রুমে থাকার বিষয়ে আকমল হোসেন বলেন, ‘আমি সিঙ্গেল রুমে থাকি না। আমরা রুমে তিনজন থাকি।’

আবাসন সঙ্কট নিয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা এখন ২য় বর্ষে পড়ছি, হলের অবস্থা এখন এই যে, একটা সিটও খালি নেই। যার ফলে আমরা এখনো সেই গণরুমেই আছি। কর্তৃপক্ষকে তা জানালে উনারা আমাদেরকে আশ্বাস দেন, কিন্তু এই আশ্বাসের বাস্তবায়ন এখনো দেখতে পাইনি। ফলে আমরা তীব্র আবাসন সঙ্কটে ভুগছি। এই সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের জন্য খুব বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।’

জানতে চাইলে রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী বলেন, ‘হলে আবাসিক সিটের জন্য আবেদন করেছি, কিন্তু হলে উঠতে পারছি না। তিনি বলেন, হলে আবাসিক সঙ্কটের কারণে পলাশী স্টাফ কোয়ার্টারে অন্যান্য বান্ধবীর সঙ্গে সাবলেটে থাকছি আমি। চার জন মিলে একটি রুম ভাড়া করে কোনো রকমে থাকি। নিরাপত্তার খুব একটা সমস্যা না হলেও বছর খানেক ধরে এই সাবলেট থাকা। তবে আবাসিক হলগুলোতে মেধায় আসার চেয়ে রাজনৈতিকভাবে উঠলে সিট বরাদ্দ হয় তাড়াতাড়ি। এ জন্য রাজনৈতিক একটা চাপের মধ্যদিয়ে যেতে হয় পুরোটা শিক্ষাজীবন।’

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি (সহ-সভাপতি) নূরুল হক নূর বলেন, ‘হলগুলো প্রশাসন চালানোর কথা থাকলেও চালাচ্ছে রাজনৈতিক সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মেরুদণ্ডহীন হওয়ায় অনৈতিক আচরণের মধ্যদিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো দখল দারিত্ব বা রাজনৈতিক দাসত্বের মধ্যদিয়ে শিক্ষার্থীদের দিয়ে তারা রাজনৈতিক কমসূচি চালায় ।