বইমেলা: সোনামণিদের সে কী প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস

নিউজ ডেস্ক:     মেলার সব আলো গিয়ে পড়ল একটি মঞ্চে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দক্ষিণ কোণে সিসিমপুরের বানানো মঞ্চে বসেছিল প্রাণের মেলা। হালুম, ইকরি-মিকরি আর টুকটুকিদের ঘিরে সোনামণিদের সে কী প্রাণবন্ত উচ্ছ্বাস। শিশুদের আলোকচ্ছটায় বড়দেরও আনন্দ। বাবার আঙুল ধরে কিংবা কাঁধে চড়ে, মায়ের কোলে চেপে কিংবা হাত ধরে শিশুরা গতকাল দাপিয়ে বেড়িয়েছে গোটা উদ্যান। কচিকাঁচাদের কলরবে সপ্তম দিনে মুখর হয়ে ওঠে বইমেলা। একেই বুঝি বলে পাক্কা শিশুপ্রহর। ছুটির দিন হওয়ায়  শুক্রবার সকাল ১১টায় খুলেছিল বইমেলার দুয়ার। প্রথম দুই ঘণ্টা শিশুপ্রহর। আগেই জানানো হয়েছিল, সাড়ে ১১টায় শিশুদের সঙ্গে খেলবে সিসিমপুরের প্রিয় চরিত্রগুলো। চার দেয়ালে বসেই যাদের সঙ্গে গড়ে ওঠে শিশুদের হৃদ্যতা, তাদের সামনে পাওয়ার এই ব্যাকুলতা কম ছিল না। দিনের প্রথম অনুষ্ঠানেই জমে যায় সিসিমপুরের এ মঞ্চটি। ইকরি-মিকরিদের সঙ্গে হাত মেলায় জাফনা, আয়মান, রোদেলা, তাসফিয়া, জোবায়দার মতো ছোট্ট সোনামণিরা।

হালুমরা নেমে গেলে মঞ্চটি চলে যায় শিশুদের দখলে। চারপাশে তাদের অভিভাবকদের প্রাণবন্ত আড্ডা। এরপর তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে বইয়ের স্টলে। কার্টুন, ছড়া আর গল্পের বইয়ে একাকার হয়ে যায় ওদের চাহিদাপত্র, কোনটা রেখে কোনটা চাই। একসঙ্গে অনেক কিছু। আনন্দ আর ধরে না। তাদের ঘিরে এখানে-ওখানে সমানে চলে সেলফি আর ফটোসেশন।

উত্তরার হাউজবিল্ডিং থেকে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে সকালেই মেলায় আসেন চাকরিজীবী মা-বাবা দিলদার আহমেদ ও ফারজানা আক্তার। তারা দু’জনই চাকরি করেন। ফলে দিনের বড় সময় তারা সন্তানদের মমত্ব থেকে দূরে। ছুটির দিনগুলো তাই বাড়তি স্নেহে রাঙিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। বইমেলা চলছে, শিশুপ্রহরে তারা থাকবেন না, এ যেন হতেই পারে না। কয়েক বছর ধরে একাধিকবার তারা সন্তানদের নিয়ে মেলায় ঘুরতে আসেন। সিসিমপুরের প্রিয় চরিত্রগুলো সামনে থেকে দেখার আনন্দ তখনও খেলা করছিল তাদের দুই সন্তান ফাইয়াজ ও তানিয়ার চোখেমুখে।

বিকেল সাড়ে ৩টা এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় আরও দুই দফা সিসিমপুরের মঞ্চে চলে একই আয়োজন। ফলে গতকাল দিনভর শিশু চত্বর ঘিরেই প্রকাশ পায় ছুটির দিনের সব আনন্দ। এই ভিড়ের ছিটেফোঁটাও ছিল না লিটলম্যাগ চত্বরে। সামনে কিছু স্টলে পাঠকের আনাগোনা ছিল, ভেতরের দিকে দোকানিদের কেটেছে অলস সময়। বাংলা একাডেমিতেও গতকাল অন্য দিনের তুলনায় ভিড় বেশি ছিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিভিন্ন প্যাভিলিয়ন ও স্টলে দিনভর পাঠকের সঙ্গে ব্যস্ত সময় কেটেছে প্রকাশক, বই বিক্রেতা এমনকি অনেক লেখকেরও। কয়েকটি স্টলের সামনে বই কিনতে রীতিমতো লাইন ধরতে হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে: প্রচ্ছদ দেখে মনে হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর নতুন বই বেরিয়েছে। মলাট উল্টালেই বোঝা যায় আসলে বঙ্গবন্ধুকন্যাকে নিয়ে লেখা বই এটি। ‘তারুণ্যের আলোয় শেখ হাসিনা’ নামের বইটি প্রকাশ করেছে অন্যপ্রকাশ। দেশের প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ লেখকদের কলমেই তুলে ধরা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মুর্তজা যেমন লিখেছেন, তেমনি লিখেছেন সময়ের জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনও। শেখ রোকনের মতো নদীঅন্তপ্রাণ লেখকের পাশাপাশি অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, জয়া আহসান, মারুফ রসূল, আল নাহিয়ান খান জয়েরাও লিখেছেন মাদার অব হিউম্যানিটিকে নিয়ে।

নতুন বই: আগের পাঁচ দিন মিলিয়ে নতুন বইয়ের সংখ্যা ৩২২টি। এক দিনেই বই এসেছে ৩০৮টি। বাংলা একাডেমির তথ্যের বাইরেও বিচ্ছিন্নভাবে অনেকের বই প্রকাশ হচ্ছে প্রতিদিন। গতকাল প্রকাশিত নতুন বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আনিসুজ্জামান ও আসলাম সানীর ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ (মিজান পাবলিশার্স), সন্‌জীদা খাতুনের ‘রবীন্দ্রকবিতার গহনে’ (শোভাপ্রকাশ), আহমদ রফিকের ‘রাজা আসছেন কুঁড়েঘরে’ (অনিন্দ্যপ্রকাশ), হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা’ (বাংলা প্রকাশ), মুনতাসীর মামুনের ‘বাংলাদেশ ১৯৭১ :মুক্তিযুদ্ধের শত্রুপক্ষ’ (সুবর্ণ), আলী ইমামের ‘শিশুবন্ধু শেখ হাসিনা’ (মিজান), সৈয়দ শামসুল হকের ‘বঙ্গবন্ধুর বীরত্বগাথা’ (বাংলা একাডেমি), নির্মলেন্দু গুণের ‘নির্গুণের মুখপঞ্জি ও সুইডেনের গল্প’ (কাব্যগ্রন্থ), তারেক শামসুর রেহমানের ‘ভারত-চীন দ্বন্দ্ব’ (শোভাপ্রকাশ), আনিসুল হকের ‘ভূত’ (কাকলী), লুৎফর রহমান রিটনের ‘শেখ মুজিবের ছড়া’ (আগামী); ইন্দ্রজিৎ সরকারের ‘খুন করার পর তাকে ভালোবেসে ফেলি’ (দেশ পাবলিকেশন্স), সাদাত হোসাইনের ‘অর্ধবৃত্ত’ (অন্যধারা) ও শান্তনু চৌধুরীর ‘বড় মেজ ছোট’ (অন্বেষা)।

শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা : সকাল সাড়ে ৮টায় অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী। শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা সস্ত্রীক পরিদর্শন করেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় ক শাখায় ২৭০, খ শাখায় ২১৫ এবং গ শাখায় ৯০ জন- সর্বমোট ৫৭৫ প্রতিযোগী অংশ নেয়। আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার দেওয়া হবে।

বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় সৈয়দ শামসুল হক রচিত বঙ্গবন্ধুর বীরগাথা এবং এর অনুবাদ ‘বালান্ড অব আওয়ার হিরো :বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। আলোচনায় অংশ নেন খায়রুল আলম সবুজ এবং আনিসুল হক। অনুবাদকের বক্তব্য দেন সৈয়দ শামসুল হকের মূল গ্রন্থ বঙ্গবন্ধুর বীরগাথা-এর ‘বালান্ড অব আওয়ার হিরো : বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক অনুবাদ গ্রন্থের প্রণেতা ড. ফকরুল আলম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এমরান কবির চৌধুরী।

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন হাসান হাফিজ, গোলাম কিবরিয়া পিনু, নুরুন্নাহার শিরীন ও রেজাউদ্দিন স্টালিন। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল, আলোক বসু এবং কাজী বুশরা আহমেদ তিথি। নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্য সংগঠন ‘বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস’ (বাফা)-এর নৃত্যশিল্পীরা। সংগীত পরিবেশন করেন আজগর আলীম, নারায়ণ চন্দ্র শীল, শান্তা সরকার ও আল মনসুর। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন বেণু চক্রবর্তী (তবলা), নির্মল কুমার দাস (দোতারা), মো. ফায়জুর রহমান (বাঁশি), ডালিম কুমার বড়ূয়া (কি-বোর্ড)।

লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন কুমার চক্রবর্তী, তুষার আব্দুল্লাহ, কাজী রাফি এবং জাহানারা পারভীন।

আজকের আয়োজন : আজ সপ্তম দিনে মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। যথারীতি আজও থাকছে শিশুপ্রহর সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। সকাল ১০টায় অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার প্রাথমিক নির্বাচনও হবে একই সময়ে।

বিকেল ৪টায় মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে এম আবদুল আলীম রচিত ‘বঙ্গবন্ধু ও ভাষা-আন্দোলন’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। আলোচনায় অংশ নেবেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি ও আরমা দত্ত। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।