আমিত্ব ও কুতর্ক পরিত্যাজ্য

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

আমাদের ইগো কারো কম নয়। নিজেরটা সাড়ে তিন হাত, অন্যেরটা খাটো। নিজের ছেলে কানা হলেও সেটা নিজের। চোখের সমস্যার কারণে তার ঐ বিশেষ কাজটি করার যোগ্যতা নেই, তাতে কী? চক্ষুলজ্জা ফেলে তাকেই কাজটা দিতে হবে যে! তাকেই প্রুফ রিডারের চাকুরীটা স্বজনপ্রীতি করে বাগিয়ে দিতে হবে। এটাই যেন আমাদের কারো কারো জীবনের ব্রত।

অনেক সময় উপযুক্ত লিখিত রেফারেন্স বা দলিল প্রমান ছাড়া আমরা অনেক কিছু বিশ্বাস করি। আবার অনেক সময় কোন কিছু না দেখে, না বুঝে, না পড়ে, অন্যের থেকে শোনা মনগড়া কথাই আমরা বেশী বিশ্বাস করি। যুক্তির ধারে কাছেও চলি না। জ্ঞান ও বিজ্ঞানের কথাকে পাত্তা দিই না। মহান আল্লাহ প্রদত্ত পবিত্র ধর্মগ্রন্থকে অবলম্বন করে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করে চলেছেন এমন কতশত বিজ্ঞানী যারা ভিন্ন ধর্মবলম্বী। যাদের অনেকেই গবেষণা করতে করতেই সত্যানুসন্ধানের আলোকবার্তা পেয়ে ঈমান ও আক্কীদার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পবিত্র কুরআনভক্ত হয়ে গেছেন।

কেউ আবার স্বল্প কিছু শিখেই নিজেকে অগাধ জ্ঞানের পন্ডিত মনে করে বসেন। অন্যের কথাকে মোটও পাত্তা দেন না। তারা এক অপরের সাথে জটিল তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েন। অনেক সময় সেটা ঝগড়া-ঝাটি থেকে মারামারি, মারামারি থেকে দলা-দলি, খুন-খারাবি থেকে মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত গড়িয়ে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা ও সামাজিক অশান্তির জন্ম দিয়ে ফেলে। এরুপ দীর্ঘদিনব্যাপী চলতে থাকা অশান্তি সামাজিক ভাঙ্গন সূচিত করে। এভাবে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের অবস্থাটা আমি তুমি থেকে তুই মুঁই পর্যন্ত গড়িয়ে একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে এক বিদিকিচ্ছিরি অবস্থার সৃষ্টি করে। যার ভিতর ও বাহির উভয় দিকের কদর্যরূপ সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

আমি তুমি বইয়ের ভাষা। এগুলো কোন কোন ক্ষেত্রে শুধু ভদ্র লোকদের ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে মাত্র। এগুলো কিছুটা কৃত্রিম। এখানে আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজালও রয়েছে। তাই সতর্কতার দিকটিও অনুসরণ করা হয়ে থাকে।

তুই মুঁই আনুষ্ঠানিকতা মানে না। এগুলো একান্ত দোস্ত-বন্ধুদের ভাষা। এগুলোর একটা ইতিবাচক রূপ রয়েছে। যেটা সমাজের মানুষ সহাস্যে গ্রহণ করে থাকে। তুই-তোকারি সহপাঠিদের ভাষা। মুঁই কথাটি কোন কোন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার অংশ। আমাদের দেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর ও দক্ষিনাঞ্চলের বরিশালে ‘তুঁই মুঁই’ জনপ্রিয় কথার অংশ। এরা তুইয়ের সাথে একটি চন্দ্রবিন্দু যোগ করে নাক দিয়ে ‘তুঁই মুঁই’ উচ্চারণ করে থাকে। এর বহুবচন ‘তোমরা-হামরা’। কেন জনি দেশের মধ্যাঞ্চলে এর ব্যবহার নেই। কোন কোন অঞ্চলে তুই -মুঁই বলা একটা সহজ, সরল ও স্বাচ্ছ্যন্দের অভিব্যক্তি। এখানে আনুষ্ঠানিকতার বালাই নেই, এরা আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণও করে না। কৃত্রিমতা মানে না। কারণ এগুলো প্রেমের বা হৃদ্যতার ভাষাও বটে।

তুই মুঁই-এর একটা নেতিবাচক রূপও রয়েছে। যেটা সমাজের মানুষ সহাস্যে গ্রহণ করে না। যেমন, তুই নষ্টের গোড়া। তুই একটা হতচ্ছাড়া, পাঁজি কোথাকার। তুই ভোট দাতা- এটা সবাইকে বা সব ধরণের ভোটারকে বলা যায় না। আপনি ভোটদাতা বলতে হয়।

তবে কোন চোরকে সাধারণত: আপনি বলে সম্বোধন করা হয় না। যেমন, আপনি ভোট চোর বলা হয় না। বলা হয় তুই ভোটচোর। কারণ, চোরকে তুই বলাটা অনানুষ্ঠানিক, কিন্তু সমাজ স্বীকৃত। যে কোন চোরকে বাগে পেলে সবাই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আইনের কথা ভুলে গিয়ে তখন সবাই আইন হাতে তুলে নিতে চেষ্টা করে। কারো প্রতি চটে গিয়ে বা রাগবশত: অনেক অনানুষ্ঠানিক কথা বলে ফেলা যায়। কারণ এগুলো হৃদ্যতা বা প্রেমের ভাষা নয়। এগুলো ক্ষোভের বহি:প্রকাশও বটে।

দেশে দেশে সভা-সমিতি ও সংসদের ভাষা পরিশীলিত ও সুনির্দিষ্ট। অনেক সময় ভুল তথ্যপ্রদান, নিন্দা, অপবাদ, অপমান ইত্যাদি নানা কারণে সেখানে বিতর্ক জন্ম নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে অনেক সদস্য ধৈর্য্য হারিয়ে মুখ ফস্কে অসংসদীয় ভাষা বলে ফেলেন। তখন তার জন্য আরো বিতর্ক শরু হয়। হট্টগোল এড়াতে স্পীকার সেটা এক্সাপাঞ্জ করেন অথবা বক্তা সেটার জন্য ক্ষমা চান। আবার অনেক সময় এজন্য হাতাহাতি বা চেয়ার ছুঁড়তে দেখা যায়। এজন্য বিভিন্ন সময়ে অনেক সভ্য দেশ যেমন- জাপান, তাইওয়ান ও ইউরোপের অনেক দেশের সংসদে হাতাহাতি ও চেয়ার ছুঁড়তে দেখা গেছে।

তবে উচু পর্যায়ের মানুষের মুখে তুই-মুঁইয়ের যথেচ্ছ ব্যবহার তার নিচু স্তরের ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি প্রকাশ করে। উচু স্তরের মানুষেরা যখন ইনসাফ থেকে দুরে সরে যায় তখন আত্মগরিমা ও অহংকার তাদের নিত্যসাথী হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতিবাজ, বেঈমান ও অসৎ মানুষের ধৈর্য্য কম। একজন পাপিষ্ঠ মানুষ অপরকে বেশী অপবাদ দেয়, গালিগালাজ করে। কারণ, শয়তান ও তৎসদৃশ খারাপ বন্ধুরা তার নিত্যসঙ্গী। শয়তানের ধারাবাহিক ধোঁকাবাজিকে সে বুঝতে পারে না। ফলে ন্যায়-অন্যায় ভুলে গিয়ে পরনিন্দা করে, বদদোয়া করে, অপবাদ ও ভাল মানুষের বিরুদ্ধে অহেতুক কলঙ্ক লেপন করে। যাবতীয় মন্দ জিনিষকে সবসময় পাত্তা দেয়। এজন্য সে নিজের প্রতি সবসময় জুলুম করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।এগুলোর প্রকাশ কারো কারো রাগ ও উষ্মা জানান দেয়। এ থেকে ঘৃণা ও হতাশা বেরিয়ে আসে।

তুই মুঁই গালি হিসেবেও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং ব্যবহারিক দিক থেকে নিন্দিত হয় ও পরনিন্দাকে উস্কে দেয়। তুই মুঁই বলে অনেকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ শরু করে। অনেকে অনেক জ্ঞানী-মানী ও বয়স্ক ব্যক্তির সাথে তুই তোকারী করে হেয় ও অপমান করে বসে। আমি বা মুঁই কী তা অনেকে ভুলে গিয়ে শুধু তুই বা অপরের দোষ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এগুলো নিতান্তই কু-তর্ক যা মস্তিষ্কের কু-চিন্তার ফসল। উদাহরণস্বরুপ- আমার এক সহকর্মী সম্প্রতি ফেসবুকে দারুন একটি পোষ্ট দিয়ে এক মুসলমান বনাম অপর মুসলমানের পারস্পরিক অবস্থানের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।

#মুসলমান বনাম মুসলমান#
===========================
“তুই শিয়া–তুই সুন্নী”
“তুই তাবলীগপন্থী–তুই পীরপন্থী”
“তুই সাদপন্থী–তুই যুবায়েরপন্থী”
“তুই আলিয়া–তুই ক্কওমীয়া”
“তুইতরিকাপন্থী–তুই ওয়াহাবী”
“তুই জামাতী–তুই আহলে হাদিস”
“তুই ইলিয়াছী–তুই মওদুদী”
“তুই চরমোনাই–তুই শর্ষিণা”
“তুই হেফাজত–তুই মাইজভান্ডারী”
“তুই ইহুদীদের দালাল–তুই কাফের”
“তুই দেওবন্দী–তুই নকশ্বন্দী”
“তুই মাজহাবী–তুই লা-মাজহাবী”
“তোর জামাফাঁড়া–তোর টুপিছিদ্র”
“তুই রাসুলের দুশমন–তুই সাহাবীদের দুশমন”

পৃথিবী যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন মুসলমানরা নিজেরাই এধরণের কু-তর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েছি। এই কু-তর্ক, এই বিভক্তি সারা বিশ্বে মুসলমান নির্যাতনের মূল কারণ।

বিশ্ব ছেড়ে যদি দেশের অভ্যন্তরের কথা চিন্তা করি সেখানেও নানা বিভেদের বেড়াজাল আমাদের শক্তি ও উন্নতিকে দাবিয়ে রেখেছে। উদাহরণস্বরুপ- যদি বলি,

বাংলাদেশের মানুষ বনাম বাংলাদেশের মানুষ
==========================================
“তুই ঢাকাইয়া–তুই গাঁইয়া”
“তুই ধনী–তুই গরীব”
“তুই ফকির–তুই মিসকিন”
“তুই কালা–তুই গোরা”
“তুই শিক্ষিত–তুই অশিক্ষিত”
“তুই বড়লোক–তুই ছোটলোক”
“তুই হাভাতী –তুই কাঙ্গালি”
“তুই জানোয়ার–তুই মানুষ”
“তুই ভোটচোর–তুই ভোটডাকাত”
“তুই বড়লোক–তুই ছোটলোক”
“তুই চোর–তুই ছ্যাচ্চোর” -ইত্যাদি।

এভাবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, ক্ষমতা, বিত্ত-বৈভব, ধনী-দরিদ্র, কায়-ক্লেশ, হতাশা, দু:খ বেদনা, সুখ-যাতনা ইত্যাদিতে আমাদের মধ্যে পার্থক্য থাকা বিচিত্র কিছু নয়। এজন্য নানা অভিধায় আমরা আমাদেরকে অভিহিত করতে পারি। তবে তা যেন অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে আমাদের মধ্যে বিভেদ তৈরী না করে, আমাদের অর্জনকে ম্লান করে না দেয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।

ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারের সুবাদে আমাদের সমাজে তুই মুঁই বিতর্ককারীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এরা কায়িক পরিশ্রম করতে ভয় পায়। এদের বহুলাংশই অলস ও কাজে কর্মে ফাঁকিবাজ। সভা-সমিতিতে, অফিস-আদালতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এরা অপরের ছিদ্রান্বষণে ব্যস্ত। কারণ, তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। নেই কোন ফায়ারওয়ালের ব্যবস্থা। যে যার মতো মোবাইল ফোন সেট বা নিজের বা অফিসের কম্পিউটার নিয়ে সারাক্ষণ টিপাটিপি করে সময় পার করে দিলেও সেগুলো দেখভাল করার মত ম্যানুয়েল বা কারিগরি প্রতিরক্ষাব্যুহ এখনও সবজায়গায় গড়ে উঠেনি। তারা কোথাও কোন আনুষ্ঠানিকতা মানেও না। মানার প্রয়োজন মনে করে না। আমাদের আমিত্ব ও বড়াই যেন আমাদের ব্যক্তিত্বকে ব্যাধিগ্রস্থ করে ভুলুন্ঠিত না করে, অপরকে হেয় না করে, আঘাত না দেয়, আমাদের সমাজকে পঙ্গু করে না দেয় সেদিকে সবার খেয়াল রাখা জরুরী।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন,সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জাহিদ/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।