কংগ্রেস কি ভারতকে বাঁচাতে পারবে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী:   গত মাসে (ডিসেম্বর ২০১৯) ভারতের কংগ্রেস দলের ১৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হয়েছে। সারাদেশেই দিবসটি উদযাপন করা হয়েছে। তবে দিল্লিতে দলীয় কার্যালয়ে সভাপতি সোনিয়া গান্ধী পতাকা উত্তোলন করে দিবস পালনের উদ্বোধন করেন। দিল্লির অনুষ্ঠানে সোনিয়া গান্ধী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, দলের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী প্রমুখ বক্তৃতা করেছেন। প্রিয়াঙ্কা বক্তৃতা করেছেন লখনৌর অনুষ্ঠানে। দলটির পারিবারিককরণ এখন চরমে পৌঁছেছে। কংগ্রেসের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখন মাতা সোনিয়া গান্ধী, পুত্র রাহুল গান্ধী ও কন্যা প্রিয়াঙ্কার হাতে। বয়স ও অভিজ্ঞতায় রাহুল গান্ধী সর্বভারতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণের যোগ্য হয়ে ওঠার আগেই তাকে দলের সভাপতি করায় গত সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে। তবে এর ভালো দিক এই যে, এই পরাজয়ের পর রাহুল গণতন্ত্রের নিয়ম মেনে পদত্যাগ করেন। কিন্তু সভাপতি পদে রাহুল ইস্তফা দেওয়ার পর কংগ্রেসের মতো প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরোনো ও বনেদি দলটি বহুকাল দেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল, যে দলটি একজন নেতা খুঁজে পায়নি তাদের সভাপতি করার জন্য।

রাহুল গান্ধী স্বেচ্ছায় সভাপতি পদে ইস্তফা দিয়ে কংগ্রেসকে তার পরিবারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার একটা সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতারা সে সুযোগ গ্রহণ করতে পারেননি। তারা অসুস্থ সোনিয়া গান্ধীকে আবার সভাপতি পদে ফিরিয়ে এনেছেন। সাধারণ সম্পাদকের পদ গ্রহণ করেছেন তার কন্যা প্রিয়াঙ্কা। অর্থাৎ যে কংগ্রেসের স্বর্ণযুগে মহাত্মা গান্ধী অঘোষিতভাবে দলের নেতৃত্বে ছিলেন, তথাপি দলটি নেহরু, আজাদ, প্যাটেল, সুভাষচন্দ্রের মতো ক্ষণজন্মা নেতাদের জন্ম দিতে পেরেছে এবং তারা বিভিন্ন সময়ে দলের সভাপতি পদে বসেছেন। গান্ধী ও নেহরুর মৃত্যুর পরও কংগ্রেসে নেতার অভাব হয়নি। কংগ্রেস তখন গণ্য হতো হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সারা ভারতের মানুষের একমাত্র জাতীয় দল হিসেবে। এ জন্য ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে কংগ্রেস সভাপতিকেই বলা হলো রাষ্ট্রপতি। নেহরু, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, ইন্দিরা ও রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর সেই কংগ্রেসে আর নেতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইন্দিরা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেই কংগ্রেসে ভাঙন ধরে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মতান্তরের কারণে দলের অধিকাংশ প্রবীণ নেতা ইন্দিরা গান্ধীকে ত্যাগ করে আদি কংগ্রেস গঠন করেন। ইন্দিরার নেতৃত্বে দলের যে অংশ থাকে, তার নাম হয় ইন্দিরা-কংগ্রেস।

ইন্দিরা ও তার পুত্র রাজীব গান্ধীর মৃত্যুর পর ডায়নেস্টির আর কেউ তখন প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। অর্থাৎ কাউকে পাওয়া যায়নি। তখন প্রধানমন্ত্রী হন নরসীমা রাও। তিনি ইন্দিরা ও রাজীব দুই মন্ত্রিসভাতেই মন্ত্রী ছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী বেঁচে থাকতে তার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গ্রুম করেছিলেন কনিষ্ঠ পুত্র সঞ্জয় গান্ধীকে। তিনি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি। ইন্দিরার পর প্রধানমন্ত্রী হন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজীব গান্ধী। রাজনীতিতে তার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় তাকে বলা হতো ভারতের টেকনোক্র্যাট প্রধানমন্ত্রী। সঞ্জয় গান্ধীকে তার মায়ের প্রধানমন্ত্রিত্বের আমলে বলা হতো ‘ক্রাউনপ্রিন্স’। সবাই জানত, ইন্দিরার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বও যাবে তার হাতে। ফলে দলের নেতাকর্মীরা তাকে সমীহ করে চলত এবং তিনিও সবার সঙ্গে যুবরাজের মতো ব্যবহার করতেন।

সঞ্জয়ের স্বেচ্ছাচারী আচার-আচরণের ফলে ইন্দিরা-কংগ্রেস জনপ্রিয়তা হারায়। ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। কংগ্রেসের ইতিহাসে এই তাদের প্রথম নির্বাচনী পরাজয়। সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় ফিরে আসেন এবং রাজীব গান্ধীকে রাজনীতিতে টেনে আনেন। রাজীব তার মায়ের নিহত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হন বটে; কিন্তু জনপ্রিয়তা আর ফিরিয়ে আনতে পারেননি। তিনিও আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর তার ইতালিয়ান স্ত্রী সোনিয়া প্রথমে প্রধানমন্ত্রী হতে বা কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণে রাজি হননি। রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাও তখন প্রাপ্তবয়স্ক ছিল না। এ সময় গান্ধী-নেহরুর ডায়নেস্টির বাইরে নরসীমা রাও কংগ্রেসের নেতৃত্ব পান এবং দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তিনি গান্ধী-নেহরুর গণতান্ত্রিক ভারতের ঐতিহ্য রক্ষা করে চলতে পারেননি। তার আচার-আচরণ অনেকটা ছিল কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো। ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ গান্ধী হত্যায় প্যাটেলের সংশ্নিষ্টতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও কপালে সিঁদুরের লম্বা চিহ্ন রাখতেন। হিন্দু ধর্মীয় আচার-আচরণ কঠোরভাবে অনুসরণ করতেন। তার আমলেই বিজেপি ও তার অঙ্গ দলের নেতারা বাবরি মসজিদ ভাঙে। নেতৃত্ব দেন বিজেপির তৎকালীন শীর্ষ নেতা আদভানি। পরে যিনি বিজেপির বাজপেয়ি সরকারের উপ-প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এই মসজিদ ভাঙার পর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়। বহু লোক মারা যায়। এই অবস্থাতেও প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও বিজেপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অসম্মত হন। বলেন, ‘এই নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার রাজ্য সরকারের। কেন্দ্রীয় সরকারের নয়।’ বাংলাদেশে যেমন বিএনপির আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে এবং আওয়ামী লীগের দুর্বলতায় জামায়াত ও হেফাজতের উত্থান, তেমনি ভারতে কংগ্রেসের নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদীদের অনুপবেশ এবং প্রভাব বিস্তার বজরং পরিবারের উত্থানের অন্যতম কারণ। নেহরু হিন্দু মহাসভাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেই নিষিদ্ধ হিন্দু মহাসভা থেকে জন্ম নেওয়া ভারতীয় জনতা পার্টিকে অনেক কংগ্রেস নেতা স্নেহের চোখে দেখেছেন। সোনিয়া কংগ্রেস নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমবার যে সাধারণ নির্বাচনের সম্মুখীন হন, সেই নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা অনুসরণই হবে কংগ্রেসের লক্ষ্য। কংগ্রেস সেই নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল।

কথা ছিল সোনিয়া প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু তিনি ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত হওয়ার অভিযোগ ওঠায় সোনিয়া গান্ধী সরে গিয়ে ড. মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী পদে মনোনয়ন দেন। এই মনোনয়ন পাওয়ার কথা ছিল বাঙালি প্রণব মুখার্জির। তিনি ঝানু রাজনীতিক। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে কংগ্রেস সরকারকে শক্তিশালী নেতৃত্ব দিতে পারতেন এবং কংগ্রেস সরকারের সঙ্গে সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বাম মোর্চার সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু কংগ্রেসের যখন পড়ন্ত অবস্থা, তখনও দলে ও সরকারে একটি সবল নেতৃত্ব বসানোর পরিবর্তে সাবেক আমলা ড. মনমোহন সিংকে ক্ষমতায় বসানোর ফলে শুরু থেকেই কংগ্রেস সরকার হোঁচট খাওয়া শুরু করে। ড. মনমোহন সিং খুবই ভালো মানুষ। অর্থনীতি ভালো বোঝেন, রাজনীতি নয়। তিনি সোনিয়া পরিবারের কাছে খুবই বাধ্য ও অনুগত থাকবেন- এটা বিবেচনা করে এবং তার দুর্বল ব্যক্তিত্বের কথা জেনেই প্রণব মুখার্জির বদলে তাকে মনোনীত প্রধানমন্ত্রী করা হয়। অবশ্য পরে এই ভুল বুঝতে পেরে ইন্দিরা কংগ্রেস প্রণব মুখার্জিকে রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে তাকে সান্ত্বনা পুরস্কার দিয়েছিল। তাতে কংগ্রেসের পতন রোধ করা যায়নি।

রাহুল গান্ধী সাবালক হয়ে উঠতেই কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক পদ দেওয়া হয়। তিনি মনমোহন সিংয়ের মাথায় ছড়ি ঘোরাতে শুরু করেন, একাধিকবার তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এটা অনেক সময় বুঝে ওঠা ভার ছিল যে, দেশের ক্ষমতা কার হাতে, মনমোহন সিং, না রাহুল গান্ধীর হাতে? জনগণের মধ্যে এই বিভ্রান্তিতে কংগ্রেসের প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়েছে। নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির জনপ্রিয়তা দেখে কংগ্রেসের তিন নেতা সোনিয়া, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা হয়তো ভেবেছিলেন, ভারতের মানুষের কাছে হিন্দুত্ববাদ অত্যন্ত প্রিয়। তাই গত সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেসের শতাব্দী প্রাচীন গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ত্যাগ করে তারা বিজেপি নেতাদের চেয়েও বড় হিন্দুত্ববাদী সাজেন এবং ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটদাতাদের হয়তো বোঝাতে চেয়েছিলেন, তারা মোদি-অমিত শাহের চেয়েও বড় হিন্দুত্ববাদী। রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা মাথায় সিঁদুরের ছাপ, গায়ে পট্টবস্ত্র চাপিয়ে মা সোনিয়াকে নিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরতে শুরু করেন। রাহুল ঘোষণা করেন, তিনি একজন শিবভক্ত, শাক্তধর্মের অনুসারী। কংগ্রেস নেতাদের এসব কাণ্ডকারখানা দেখে মোদি-অমিত শাহ হয়তো মুচকি হেসেছেন এবং আবারও সাধারণ নির্বাচনে বিরাট বিজয় অর্জন করেছেন। শিবভক্ত রাহুলের দল লোকসভায় বিরোধী দল গঠনের মতো সদস্যসংখ্যা পেতেও হিমশিম খেয়েছে। রাহুলকে দলের সভাপতি পদে ইস্তফা দিতে হয়েছে।

কংগ্রেসের বর্তমান দুরবস্থার জন্য বালখিল্য নেতৃত্ব ছাড়াও মনমোহন সরকারের দুর্বল রাজনৈতিক নীতিও দায়ী। ক্ষমতায় বসেই মনমোহন তার পূর্ববর্তী বিজেপির বাজপেয়ির পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ শুরু করেন। এই নীতি ছিল নেহরুর জোটনিরপেক্ষ বিদেশনীতি থেকে সরে এসে অটল বিহারি বাজপেয়ির নীতি অনুসরণ। বাজপেয়ি সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ইসরায়েল-ঘেঁষা বিদেশনীতি অনুসরণ শুরু করেছিলেন। ইসরায়েলির মোসাদ ভারতের সামরিক নীতি পরিচালনায় অনুবেশ করে। কংগ্রেসের মনমোহন সরকার শুধু এই মার্কিন ও ইসরায়েল-ঘেঁষা নীতি অনুসরণেই ক্ষান্ত থাকেননি, তারা আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু সহযোগিতা চুক্তিও সম্পাদন করেন। কংগ্রেস সমর্থক বাম মোর্চা এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। কংগ্রেস সরকার তাতে কান না দেওয়ায় বাম মোর্চা সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে। গত সাধারণ নির্বাচনে তো ভোটদাতাদের মোহিত করতে পারবেন ভেবে কার্যত ধর্মনিরপেক্ষতার বদলে হিন্দুত্ববাদের মুখোশ ধারণ করেন রাহুল গান্ধীরা। ফল আবারও তাদের শোচনীয় পরাজয়। এখন দলের ১৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করতে গিয়েও সোনিয়া, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা অতীতে দেশব্যাপী কংগ্রেসের যে বিরাট প্রতিষ্ঠা, নেহরু ও ইন্দিরার শাসনামলে কংগ্রেস দল ও সরকারের যে বিরাট সাফল্য, সেগুলোকে মূলধন করে দেশের মানুষকে কংগ্রেসমুখী করার চেষ্টা করছেন।

কিন্তু তা কি সফল হবে? ইন্দিরা গান্ধী যেমন তার শাসনামলের ব্যর্থতাগুলো স্বীকার করে জনসাধারণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার সৎসাহস দেখিয়েছিলেন, সেই সৎসাহস দেখিয়ে রাহুল গান্ধীরা কি পারবেন, তাদের গত দেড় দশকের একের পর এক ভুল ও ব্যর্থতাগুলো স্বীকার করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইতে? কংগ্রেসের আগের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে ফিরে গিয়ে গান্ধী-নেহরুর গণতান্ত্রিক ভারত গঠনের বাস্তব ও কার্যকর করা যাবে, এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে?

অন্ধ ব্রেক্সিটনীতির দরুন গ্রেট ব্রিটেন এখন তার গ্রেটনেস হারাতে বসেছে। আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, এমনকি ওয়েলসে পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব শক্তিশালী হয়ে উঠবে। ভারতেও এক বা একাধিক সর্বভারতীয় দলের পরিবর্তে আঞ্চলিক দলগুলো এখন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিজেপির ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার নীতি ভারতে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। একটি সর্বভারতীয় অসাম্প্রদায়িক দলরূপে কংগ্রেস আবার পূর্ব মর্যাদা উদ্ধার করতে না পারলে, জাতিগত বিভিন্নতা থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমের অনেক রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। পরিণামে ভারতের অখণ্ডতা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে। কংগ্রেসের ত্রয়ী নেতা যে এ কথা জানেন না, তা নয়। তাই কংগ্রেসের ১৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিল্লি অনুষ্ঠানে রাহুল গান্ধীর কণ্ঠে ‘ভারত বাঁচাও, সংবিধান রক্ষা করো’ এই স্লোগান শোনা গেছে। কিন্তু বিজেপির কবল থেকে ভারতকে বাঁচাতে হলে, ভারতের সেক্যুলার সংবিধানের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা করতে হলে হিন্দুত্ববাদী উগ্রতা ও ধর্মান্ধতা থেকে ভারতকে বাঁচাতে হবে। কংগ্রেসের বর্তমানে যা অবস্থা, তাতে একা যুদ্ধ করে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। কংগ্রেসকে উদ্যোগী হয়ে অসাম্প্রদায়িক বিভিন্ন আঞ্চলিক দল এবং বাম গণতান্ত্রিক মোর্চার সঙ্গে হাত মিলিয়ে শক্তিশালী ভারত বাঁচাও আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নইলে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা শুধু ভারতের নয়, সারা উপমহাদেশের জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনবে।

এটাকে ঠেকাতে হলে কংগ্রেসকে প্রথম নিজেকে অসাম্প্রদায়িক করতে হবে। তারপর অন্যান্য অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে মিলে সর্বভারতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট তৈরি করতে হবে এবং তাতে বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক সবাইকে এনে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করতে হবে। এখন দেখার রইল, রাহুল গান্ধীরা এই প্রতিরোধ মোর্চা গড়ে তোলার পথে এগোবেন, নাকি গতানুগতিকভাবে কংগ্রেসের ১৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের হাঁকডাকের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন! বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের জন্যও আমার এই সতর্কবাণী প্রযোজ্য।