আওয়ামী লীগ নেতা এমপি মান্নানের মৃত্যুতে শোকের ছায়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ও বগুড়া

আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার মৃত্যু সংবাদে সর্বত্র গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা ছুটে যান হাসপাতালে ও তার বাসভবনে। গতকাল সকাল সোয়া ৮টায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, গুণগ্রাহী ও শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যসহ রাজনৈতিক নেতারা। আগামীকাল সোমবার ঢাকায় ও বগুড়ায় তিন দফা নামাজে জানাজা শেষে তাকে গ্রামের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে দাফন করা হবে। তার মরদেহ ঢাকা বারডেম হাসপাতালের হিম ঘরে রাখা হয়েছে। কর্মী বান্ধব গণমুখী সংগ্রামী এ নেতার মৃত্যুতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে ও নির্বাচনী এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বগুড়ায় তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার ধানমন্ডি নিজ বাসভবনে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে পপুলার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন রাতে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। গতকাল সকাল সোয়া ৮টার দিকে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদারা মান্নান সারিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সদস্য। তার একমাত্র পুত্র সাখাওয়াত হোসেন সজল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং কন্যা মালিহা মান্নান মৌ আমেরিকা প্রবাসী। মেয়ে আজ আমেরিকা থেকে দেশে ফেরার কথা রয়েছে। আগামীকাল সোমবার সকাল ৮টায় ঢাকায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে কৃষিবিদরা শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর সকাল ১০টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রথম নামাজে জানাজা শেষে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন রাজনৈতিক সহকর্মীরা। পরে হেলিকপ্টার যোগে দুপুর দেড়টায় তার লাশ বগুড়ার সোনাতলায় নিয়ে আসা হবে। সেখানে স্থানীয় শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম মাঠে তার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা শেষে বিকাল ৪টায় সারিয়াকান্দিতে তার গ্রামের বাড়িতে লাশ নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে স্থানীয় পাবলিক মাঠে তার তৃতীয় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। ১৯৫৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হিন্দুকান্দি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল মান্নান। তার পিতার নাম মরহুম জালাল উদ্দিন সরদার, মাতা মরহুম মুনজিলা বেগম। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় সন্তান। আবদুল মান্নানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় ময়ূরের চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। ১৯৬৯ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি এগ্রি অনার্স ও ১৯৭৭ সালে এমএসসি এগ্রি ক্যামেস্ট্রি এবং ১৯৭৯ সালে এমএসসি এগ্রি ক্যামেস্ট্রি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় তিনি বাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৮৩-১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ছাত্র লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সহপ্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং ১৯৯৬ সালে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর আবদুল মান্নান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ পর্যন্ত তিনি দুই মেয়াদে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারি ১০ম সংসদ নির্বাচন, এবং ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৃতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তৃতীয় বারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আগের থেকে আরও দিগুণ উন্নয়নমূলক কাজে হাত দেন।

আবদুল মান্নানের মৃত্যুতে আরও শোক জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বি মিয়া, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক শামীম, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. কামাল উদ্দিন আহাম্মদ, কৃষক লীগের সভাপতি সমির চন্দ চন্দ্র ও সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আকতার ও সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল, ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন। বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপু জানান, শনিবার থেকে তিন দিনের শোক ঘোষণা করা হয়েছে। সকাল থেকে কোরআন তেলাওয়াত, কালো ব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। তার মৃত্যুতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান মজনুসহ সব পর্যায়ের নেতা-কর্মী অত্যন্ত শোকাহত। বগুড়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি তৌফিক হাসান ময়না জানান, তিনি আমাদের উপদেষ্টা ছিলেন। আমরা তার মতো বড়মাপের নেতা হারালাম। আমাদের সকল কাজে তিনি সব সময় সহযোগিতা করেছেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তার মৃত্যুতে পাঁচ দিনের শোক কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

চিফ রিপোর্টার, সাইফ শোভন, ঢাকানিউজ২৪.কম