সরকারের বর্ষপূর্তি-৮ শহরের সুবিধা যাচ্ছে গ্রামে বৈষম্য দূরীকরণ

প্রতিটি গ্রামকে শহরের সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আওয়ামী লীগের অনেক আগের। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নগর ও গ্রামের বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ জন্য কৃষি বিপ্লব, গ্রামে বিদ্যুতায়ন, কুটির শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পের বিকাশ, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন করে গ্রামাঞ্চলে আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তার দেখানো সেই পথে হাঁটতেই ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত করে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’। অর্থাৎ প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি।

এই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে টানা তৃতীয় পর্বে ক্ষমতায় আসার পর গ্রামকেন্দ্রিক কার্যক্রম শুরু করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। গ্রামকে শহরে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ স্ব স্ব অবস্থান থেকে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। অবশ্য এই প্রকল্পভুক্ত অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নের কাজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার অনেক আগেই শুরু করে। ফলে ইতোমধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। নতুন বছর ২০২০ সালে শতভাগ বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিত হবে।

এদিকে গ্রামের রাস্তাঘাটও আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে। ১০ টাকায় কৃষকরা ব্যাংক হিসাব খোলার সুবিধা পাচ্ছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা-উপজেলার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন বেশ ভালো। সড়ক-মহাসড়কে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাস চলছে। নৌপথ ও আকাশপথেও যোগাযোগ তুলনামূলক বেড়েছে। প্রতিটি গ্রামে নেটওয়ার্ক সুবিধা পৌঁছে গেছে। ১২ কোটির বেশি জনগণ এখন মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। ফোনে কথা বলার সুবিধা, ডিজিটাল কৃষি সেবাসহ নানা ক্ষেত্রেই মানুষের উন্নতি হয়েছে।

প্রতিটি গ্রামকে আধুনিক শহরের সব সুবিধাই দেওয়া হচ্ছে। যেমন- উন্নত রাস্তাঘাট, যোগাযোগ, সুপেয় পানি, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা, মানসম্পন্ন শিক্ষা, উন্নত পয়ঃনিস্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও মানসম্পন্ন ভোগ্যপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। গ্রামে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ আরও বাড়াতে এবং নির্ভরযোগ্য করতে সরকার গ্রুপভিত্তিক বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও সৌরশক্তির প্যানেল বসানোর উৎসাহ ও সহায়তা দিচ্ছে। গ্রাম পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র, সেবাকেন্দ্র, ওয়ার্কশপ স্থাপন করে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীণ যান্ত্রিকায়ন সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। অকৃষি খাতের এসব সেবার পাশাপাশি হাল্ক্কা যন্ত্রপাতি তৈরি ও বাজারজাত করতে বেসরকারি খাতের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

এ ছাড়া নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে একাধিক সভা ও ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে সরকার। কমিটি কয়েকটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে দেশব্যাপী প্রতিটি গ্রামে উন্নত রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং যোগাযোগ স্থাপন সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন; গ্রামীণ হাটবাজারের তথ্য সংগ্রহ; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন; নিরাপদ পানির উৎস সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন। এ কর্মপরিকল্পনা বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অংশীজনের অংশগ্রহণে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রেক্ষাপট ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদের গত অধিবেশনে বলেন, ‘১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ২১ বছর বাংলাদেশের জন্য দুঃসময় গেছে। বিশ্বে এটি বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, কঙ্কালসার দরিদ্র মানুষের দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ওই ৫ বছর ছিল স্বর্ণযুগ।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত দুই মেয়াদে বহুমাত্রিক তৎপরতা- যেমন শিক্ষা সম্প্রসারণ, কৃষি ও অকৃষি খাতে দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা-প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, গ্রামাঞ্চলে আর্থিক সেবা খাতের পরিধি বিস্তার, কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ, বিদ্যুতায়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন গ্রামোন্নয়ন প্রয়াসকে ত্বরান্ব্বিত করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতির এই বিকাশ প্রক্রিয়ায় সহায়ক হচ্ছে। ‘

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য এসেছে। কৃষিজ ও অকৃষিজ উভয় ক্ষেত্রে কর্মকা বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমান সরকার কৃষিক্ষেত্রে অসামান্য গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি অকৃষি খাত যেমন- গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, গ্রামীণ পরিবহন ও যোগাযোগ এবং গ্রামীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে। ফলে গ্রামীণ পরিবারের আয় ও কর্মসংস্থানে অকৃষি খাতের অবদান বেড়ে চলেছে।’

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’- নির্বাচনী ইশতেহার-২০১৮ তে প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ উদ্যোগ গ্রহণের বিশেষ অঙ্গীকার করা হয়েছে ও তা বাস্তবায়নে পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। গ্রামকে আধুনিক শহরের সব সুবিধা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, গ্রাম পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র সেবাকেন্দ্র ও ওয়ার্কশপ স্থাপন করে যন্ত্রপাতি মেরামতসহ গ্রামীণ যান্ত্রিকায়ন সেবা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। গ্রামীণ যুবক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান করা হচ্ছে। অকৃষি খাতের এসব সেবার পাশাপাশি হাল্ক্কা যন্ত্রপাতি তৈরি ও বাজারজাত করতে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

ডাক, টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে দেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের সব নাগরিক সেবা ও সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, নাগরিক সেবা পৌঁছে দিতে তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করে দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করা হবে। সৃজনশীল জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার প্রাথমিক স্তর থেকেই শুরু করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গ্রামগুলো ইতোমধ্যে অনেকটা শহর হয়ে গেছে। এমন কোনো গ্রাম নেই,যেখানে উন্নত রাস্তাঘাট নেই। গ্রামের মানুষ গ্যাসের চুলায় রান্না করছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে গৃহস্থালির কাজকর্ম করছে। কৃষি যন্ত্রপাতির আধুনিক হয়েছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যেটুকু বাকি আছে, আগামী চার বছরে তা বাস্তবায়ন করা হবে।

চিফ রিপোর্টার, সাইফ শোভন, ঢাকানিউজ২৪.কম