সোলাইমানির মৃত্যুতে, ভীত নেতানিয়াহু

সোলাইমানি ও নেতানিয়াহু

মোহা: খোরশেদ আলমঃ ইরানি জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরণের যুদ্ধেই জড়িয়ে পড়লেন। প্রায় দেড় বছর যাবত ইরানের সঙ্গে অলিখিত লড়াই চালিয়ে আসছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে পিছু পা হতে হয়েছে কৌশলগত অজুহাত দেখিয়ে। অবশেষে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার কাশেম সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে অঘোষিত যুদ্ধেই জড়িয়ে পড়লেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডিসেম্বরে অভিশংসিত হওয়ার পর তার ২০২০ সালে নির্বাচন সামনে রেখে নিজের দেশে জনগনের নিকট জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে বিভিন্ন কৌশলের অন্যতম কৌশল হিসেবে ইরানের সহিত বৈরি সম্পর্কে অবতীর্ণ হলেন। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে-দেশে নির্বাচনের প্রাক্কালে ক্ষমতাসীনরা সাম্প্রদায়িক ধোঁয়া তুলে, কেউ বা পার্শ্ববর্তী দেশের সহিত যুদ্ধ বাধিয়ে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়ার চেষ্টা করে। আমেরিকার সর্বকালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ২০২০ সালে নির্বাচন ঘিরে সেরকম জটিল সমীকরন সৃষ্টি করছেন।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই সোলায়মানিকে হত্যা করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও তাদের মিত্রদের উপর বিভিন্নভাবে আঘাত আসতে পারে এবং ভবিষ্যতে এসব দায়-দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রকেই নিতে হবে। সোলায়মানিকে হত্যার বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যেই ডেমোক্র্যাট দল প্রশ্ন তুলেছে। সিনেটর ক্রিস মারফি প্রশ্ন তুলেছেন, সোলাইমানি মার্কিন শত্রু ছিলেন, এতে সন্দেহ নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্র কি শুধুই গুপ্ত হত্যাকারী? কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে খুন করে আঞ্চলিক যুদ্ধ বাধানোর ঝুঁকিই তৈরি হলো। সোলাইমানিকে হত্যার বিরূপ প্রভাব ইরাক ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। পাশাপাশি চীন-রাশিয়াসহ অপরাপর দেশগুলো আরো নিজেদের মাঝে ছোট-খাট সমস্যা দূর করে জোট গঠনে মনোযোগী হবে।

২০১৮ সালে ইরান-যুক্তরাষ্টের তিক্ততা সৃষ্টি হয় এবং ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সহিত পারমানবিক চুক্তি বাতিল করে, পাশাপাশি জাতিসংঘকে দিয়ে ইরানের রেভল্যুশনের গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে ঘোষণা দেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে ঘোর বিরোধ সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২০ সালে আমেরিকার নির্বাচন ঘিরে ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলে এবং পূর্বের নির্বাচনের ন্যায় আবারো নতুন কোন কারিশমা দেখিয়ে নির্বাচনী বৈতরনী পার পেতে যাবেন। কিন্তু দুষ্টু রাখাল বালকের ন্যায় তামাশা করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন কোন খেলায় জড়িয়ে পড়লেন ভবিষ্যতই তা বলতে পারবে। কারন পূর্বে আমেরিকা বা তার মিত্র দেশগুলো ইরানের সাথে কোন বিষয়ে জয়ী হতে পারেননি। সৌদি-ইয়েমেনে যুদ্ধ, সিরিয়ায় ইরানের সামরিক উপস্থিতি এবং সেখানে ইরানের বলিষ্ঠ ভুমিকায় আমেরিকার বিভিন্ন চোখ রাঙ্গানিকে তুড়ি মেরেছে ইরান। সেক্ষেত্রে আমেরিকার বিভিন্ন হুংকারই সীমাবদ্ধ ছিল এবং সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরাক থেকে নিজেদের সৈন্য ফেরত নিতে বাধ্য হয়েছে অপমানিতভাবে। সর্বশেষ, গেল বছর ইরানের আকাশ সীমায় আমেরিকার ড্রোন ভূ-পাতিত করলে পাল্টা আক্রমনের হুমকি দিয়ে পরবর্তীতে ইরানের শক্তিমত্তা বুঝতে পেরে তারা পিছু হটে এবং আলোচনা বসার প্রস্তাব দেয় বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্নভাবে। ইরান বার বার আমেরিকার সাথে আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে আসছে। ইরান বলছে তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত আমেরিকার সাথে কোন আলোচনা বসবেনা। বর্তমানে ইরানের কোন দুর্বলতায় আমেরিকা আক্রমন করে বসলো তা পরবর্তীতে দেখা যাবে। বিগত দিনে ভু-মধ্যসাগরে ইরানের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে পশ্চিমা দেশগুলো, ইরান তার চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং ভষিষ্যতেও যে দেখাবে তা আঁচ করতে পেরেই মার্কিন হামলায় ইরানের শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ার পর নিরাপত্তা হুমকির কারণে গ্রিস সফর সংক্ষিপ্ত করে তড়িঘড়ি করে দেশে ফিরে যান ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু। সুলাইমানির মৃত্যুর পর পরই ইসরাইলের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নাফতালি বেনেট নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে জরুরী বৈঠকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়টি স্থান পায়। উদ্ভুত ঘটনা ইসরাইলও চরম ভয় পেয়েছে। সুলাইমানি হত্যায় উদ্ভুত পরিস্থিতি জনসমক্ষে মন্ত্রীদের কোন কথা বলতে নিষেধ করেছেন স্বয়ং নেতানিয়াহু। ইরানের হামলার আশংকায় বিশ্বব্যাপী ইসরাইলের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলোতে জারি করা হয়েছে উচ্চ নিরাপত্তা ও সতর্কতা। এ ঘটনার কঠিন বদলা নেয়ার হুশিয়ারি দিয়েছে আইআরসিজি ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

সাংবাদিক ও কলাম লেখক