শৃঙ্খলায় আসছে ৩০ হাজার সমবায় প্রতিষ্ঠান

নিউজ ডেস্ক:   অবশেষে সমবায়ের নামে ব্যবসার সুযোগ বন্ধ হচ্ছে। সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো আমানত সংগ্রহ, ঋণ প্রদানসহ অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালাতে পারবে না। সরকার নির্ধারিত কয়েকটি পণ্যে উৎপাদন ও চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে সমবায় সদস্যদের। তাছাড়া এই পণ্য উৎপাদনে এককালীন অনুদান দেবে সরকার। পরে পণ্য বাজারজাত করে সরকারের সেই ব্যয় শোধ করতে হবে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। আর লভ্যাংশের অর্থ সমবায় প্রতিষ্ঠান ও সরকার ভাগ করে নেবে। এমন বিধান রেখে সম্প্রতি পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের এক বৈঠকে ‘সমবায় আইন ২০১৯’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

শিগগিরই খসড়াটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। খসড়া আইন অনুযায়ী, যেসব পণ্য সমবায় প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন ও চাষ করতে হবে সেগুলো হচ্ছে- পোলট্রি, চাল, লবণ ও সবজি। আর প্রক্রিয়াকরণ পণ্যের মধ্যে রয়েছে আনারসের জুস, তরমুজের জুস. পেপের জুসসহ কয়েকটি পণ্য। এগুলো তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনুদান দেবে সরকার। এর আগে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে।

যেসব কারণে আইন সংশোধন: সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সরকারের কোনো পদক্ষেপই কাজে আসছে না। আইনের মারপ্যাঁচে সমবায়ের নামে চলছে ব্যাংকিং ব্যবসা। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠছে সমবায় প্রতিষ্ঠান। এমনও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধনই নেই। এর পরও সেগুলো কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ব্যবসা করছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রয়েছে গ্রাহকের টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ। সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি আইন থাকলেও তা প্রয়োগ করা হচ্ছে না। আইনের অস্পষ্টতা ও তদারকির অভাবে বন্ধ হচ্ছে না সমবায় প্রতিষ্ঠানের এসব কার্যকলাপ। এ সরকার সমবায় প্রতিষ্ঠানকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সমবায় আইন ২০১৯ প্রণয়ন করার উদ্যোগ নিয়েছে।

সমবায় সমিতি আইনে ২০০২ সালে প্রথম সংশোধনী আনা হয়। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন সমবায়ের বিদ্যমান আইন দিয়ে সম্ভব নয়। তাই এ আইন সংশোধন করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যমান আইনে সমবায় প্রতিষ্ঠানের আমানত সংগ্রহ ও ঋণ প্রদানে কোনো বিধিনিষেধ নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো সদস্যের বাইরেও যে কারও কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করতে পারে। পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ দেওয়ার চেয়ে বেশি লভ্যাংশে বড় ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে তারা ঝুঁকে পড়েছে। একদিকে তারা বেশি লভ্যাংশের আশা দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে, অন্যদিকে বেশি সুদে ঋণ দিচ্ছে। তারা ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঋণের বিপরীতে প্রায় ২২ শতাংশ সুদ নিচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে ব্যাংকিং খাতে। অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি লভ্যাংশের আশা দিয়ে আমানত সংগ্রহ করে হাওয়া হয়ে গেছে। ফলে আমানতকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন কাজকর্ম রোধে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সংশ্নিষ্ট বিভাগ।

এ ব্যাপারে সমবায় অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সমবায় প্রতিষ্ঠানের কাজে স্বচ্ছতা আনতেই নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। এ আইনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী করা। এ ছাড়া বিদ্যমান আইনের কয়েকটি ধারায় অস্পষ্টতা রয়েছে। নতুন আইন হলে এটি দূর হবে।’ তিনি বলেন, ‘নতুন আইনে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সংশোধন ও নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সমবায়ের সদস্যরা যাতে প্রতারিত না হন, সে জন্য আইনে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক বিধান রাখা হয়েছে।’

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান যা করছে: বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০ হাজার সমবায় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগের নিবন্ধন দেওয়া হয়। নিবন্ধনের সময় তাদের শর্ত দেওয়া হয়, তারা শুধু ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম করবে। কিন্তু নিবন্ধন নেওয়ার ৬ মাস পার না হতেই তারা ব্যাংকিং ব্যবসা শুরু করে। দেশের প্রায় জেলাতেই শাখা প্রতিষ্ঠা করে আমানত সংগ্রহ শুরু করে। পাশাপাশি তারা ছোট ছোট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে ঋণ না দিয়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়। তারা তাদের এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যবসা শুরু করে সমবায় আইন লঙ্ঘন করে। আবার এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো ব্যবসার আড়ালে রাজনৈতিক দলের কর্মকা পরিচালনা করে। বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদেও প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা ক্ষুদ্রঋণের আড়ালে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করে দিয়ে শোকজও করা হয়। কিন্তু বিদ্যমান আইনে কঠোর শাস্তির বিধান না থাকায় এগুলো পার পেয়ে যায়।

নতুন আইনে যা থাকছে : নতুন আইনে প্রতারণার দায়ে কোনো সমবায় প্রতিষ্ঠানের শাস্তির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনেও আসছে বেশ কিছু পরিবর্তন। বিদ্যমান আইনে একজন সদস্য প্রতিষ্ঠানে একই পদে দুই মেয়াদে আসীন থাকতে পারেন। খসড়া আইনে দুই মেয়াদের পরিবর্তে তিন মেয়াদ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ আইনে সমবায় সমিতিগুলোর সমবায়ভিত্তিক কাজকর্মে নজরদারি ও তদারকির জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া যেসব সমিতি নিবন্ধন নিয়ে কোনো কাজকর্ম করছে না, তাদের বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল বিষয়েও একটি বিধান রাখা হচ্ছে আইনে। এ ছাড়া সমিতি অকার্যকর হলে তা গুটিয়ে ফেলার আগে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধের বিধান রাখা হয়েছে। পাওনাদারের টাকা বাকি রেখে কোনো অবস্থায়ই সমবায় প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে ফেলা যাবে না। আর গুটিয়ে ফেললেও সমবায় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের ব্যক্তিগতভাবে এ টাকা পরিশোধের বিধান রাখা হয়েছে। সংশোধনীতে শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিধিবহির্ভূত কাজকর্মের শাস্তি ৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা ১০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর ও ১২ লাখ টাকা করা হচ্ছে।