নতুন নেতৃত্ব, নতুন প্রত্যাশা রাজনীতি

হাসান আজিজুল হক:  নতুন নেতৃত্ব, নতুন প্রত্যাশা- এ কথাটা বলা সর্বাংশে হয়তো সঠিক হবে না। তার পরও বলছি যেহেতু জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে, সেখানে পুরোনোরা থাকলেও দলীয় নেতৃত্ব তিন বছরের জন্য নির্ধারণ করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেহেতু নতুন নেতৃত্ব, নতুন প্রত্যাশা বলাটা একেবারে যে অমূলক তাও কিন্তু নয়। যেমনটি ধারণা করা গিয়েছিল, এর খুব একটা ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে দলের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। নবগঠিত কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা আগামী তিন বছরের জন্য দলকে নেতৃত্ব দেবেন। শেখ হাসিনাকেই যে দলীয় প্রধান হিসেবে বেছে নেওয়া হবে, এটা তো প্রায় নিশ্চিতই ছিল। কারণ এটা অবশ্যই সত্য যে, দলে এখনও তার বিকল্প নেই। সাধারণ সম্পাদকের পদটি নিয়ে অবশ্য নানা রকম জল্পনা-কল্পনা চলছিল, নানারকম গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ওপরই বর্তেছে। চার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে দু’জন নতুন মুখ দেখা গেল।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি এই দুটি বৃহৎ দলের জাতীয় কমিটিতে পরিবর্তনে সাধারণ মানুষের কী আসে যায়। নাগরিক সমাজের এ নিয়ে এত মাথাব্যথাই-বা কেন? আমি মনে করি, এর সঙ্গত কারণ আছে। রাজনৈতিক দল সংবিধান স্বীকৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডসহ জনগণের অধিকারের পথ মসৃণ করার বিষয়টি রাজনৈতিক দলের কার্যকারিতার ওপরই নির্ভরশীল। রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এটিই সত্য। আর যে কোনো দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে পরিবর্তন কিংবা সংযোজন-বিয়োজনের ওপর গোটা রাজনীতির আবহও অনেকটাই নির্ভর করে। আমাদের প্রথমেই প্রত্যাশা, তাদের নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বপ্নের বাংলাদেশের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে তারা আরও বলিষ্ঠভাবে দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবেন। আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথ মসৃণ নয়, গণতান্ত্রিক কার্যধারাও অনেক ক্ষেত্রেই নয় প্রশ্নমুক্ত। তাই এই বিষয়গুলো তাদের যথাযথভাবে আমলে রেখে কাজ করতে হবে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে জনপ্রত্যাশা মতো।

সরকারের নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আছে। প্রায় এক যুগ ধরে তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। নিঃসন্দেহে অর্জন অনেক আছে, উন্নয়ন-অগ্রগতি যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রও কিন্তু কম পুষ্ট নয়। দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের থাবা এখনও কম বিস্তৃত নয়। সরকারের যদিও দুর্নীতির ব্যাপারে ‘শূন্য সহিষুষ্ণতা’র অঙ্গীকার রয়েছে, এরপর নানারকম দুর্নীতির চিত্র উঠে আসছে। আমরা জানি, বর্তমান বাস্তবতায় দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের মূলোৎপাটনের কাজটি সহজ নয়। কিছুদিন আগে ক্যাসিনোকাণ্ডের পর সরকারের নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতি নির্মূলে দৃঢ় উচ্চারণ আমরা শুনেছি। এখনও তিনি একই কথা বলছেন। কিন্তু অনেকেই বলে থাকেন, দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযানের কাজটি তিনি যেভাবে শুরু করেছিলেন, এখন যেন ঠিক সেভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এই বাস্তবতায় বলব, আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃবৃন্দকে সর্বাগ্রে দলকে পরিশুদ্ধ করার জন্য সব রকম কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে অবশ্যই নিতে হবে নির্মোহ অবস্থান। এর ফলে শুধু দেশ-জাতির কল্যাণই যে নিশ্চিত করার পথটি সুগম হবে তাই নয়, দলের জন্যও তা বয়ে আনবে ইতিবাচক বার্তা।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রাম যাই বলি না কেন, এর পেছনে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, শোষণ-দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্য এর অন্যতম। আইনের শাসন, ন্যায়বিচারের পথ মসৃণ করা ইত্যাদিও পুরোনো জনদাবিই। এসব ক্ষেত্রে আমরা প্রত্যাশার পূর্ণতা এখনও লাভ করতে পারিনি। ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বিপুল কর্মযজ্ঞ চলছে। এরপর রয়েছে ‘ভিশন ২০৪১’। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যেতে চান শেখ হাসিনা। আরও বহু পরিকল্পনাই সরকারের রয়েছে। সবকিছুর মূলে হলো সরকারের দক্ষতা। দলের নেতাদের দূরদর্শিতা ও যোগ্যতা এসব লক্ষ্য পূরণে সরকারকে সহযোগিতা করবে এও সত্য। কাজেই সম্মেলনের মাধ্যমে যারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বভার কাঁধে নিলেন, তাদের সামনে রয়েছে বিরাট চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে ইঙ্গিত মিলেছে (যদিও বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সম্পূর্ণ নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত), নতুন বছরের প্রথম দিকেই মন্ত্রিসভায়ও হয়তো পরিবর্তন আসবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজনীতি যদি জনকল্যাণের অপর নাম হয়, তাহলে ভোগের নয়, ত্যাগের দৃষ্টান্তই পুষ্ট করতে হবে। সম্মেলনে চমক দেখা গেল কিনা সেটি বড় কথা নয়, বড় কথা হলো- ওই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে যারা দলের নেতৃত্বের ভার কাঁধে নিলেন, তারা কর্তব্যনিষ্ঠা, কর্মদক্ষতা, স্বচ্ছতা, দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবেন কতটা। তাদের কাজ করতে হবে বৈষম্য নিরসনে। এ দেশে এখনও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষরা নানারকম বঞ্চনা-নিপীড়নের শিকার। শুভবোধসম্পন্নদের জন্য বিষয়গুলো অত্যন্ত পীড়াদায়ক।

মানুষের আস্থা কিংবা বিশ্বাস অর্জন করাই হচ্ছে মূলকথা। জনগণের কথা বলে, জনগণের অধিকার আদায়ের নামে একটি রাজনৈতিক দল যা ইচ্ছা তাই করে টিকে থাকতে পারে না। এমন দৃষ্টান্ত দূর অতীত বাদ দিলেও স্বাধীন বাংলাদেশেই যথেষ্ট আছে। সাম্প্রদায়িকতা আমাদের বাস্তবতায় এখনও ব্যাধি হয়ে আছে। এই ব্যাধির নিরসনে সরকারকে যেমন আরও কঠোর হতে হবে, তেমনি আওয়ামী লীগকেও নৈতিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে ব্যাপক কাজ করতে হবে। উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ নির্মূলে থাকতে হবে সজাগ-সতর্ক। কোনোভাবেই ভাবা ঠিক হবে না যে, এদের হাত-পা ভেঙে গেছে, তারা তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছে। ক’দিন আগেও কয়েকজন উগ্রবাদী গ্রেপ্তার হলো, যাদের নাশকতার বড় পরিকল্পনা ছিল- সংবাদমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। দুর্বৃত্তরা প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় কমবেশি রয়েছে। বিশেষ করে দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন তারা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীনরা যদি দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে এর বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হতে বাধ্য। এই বিষয়গুলো আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে আমলে রাখতে হবে। প্রয়োজনে দলে সংস্কার করতে হবে।

গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র মূলনীতির এই মুখ্য বিষয়গুলো নিয়েও টানাহেঁচড়া কম হয়নি। গণতন্ত্রে অবশ্যই অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিত করা একটি বড় বিষয়। এ নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনও নানারকম কথাবার্তা আছে। গঠনমূলক সমালোচনা গ্রাহ্য করার মানসিকতা অবশ্যই থাকতে হবে। গঠনমূলক সমালোচনা নিজেকে শুধরে নেওয়ার পথ বাতলে দেয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে বৈষম্য বাড়ছে, এই সত্য অস্বীকার করা যাবে না। এই বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকলে মানবাধিকার, সাম্য, সামাজিক সুবিচার ইত্যাদি প্রশ্নবিদ্ধ হতেই থাকবে। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সব শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মানবে এও প্রত্যাশিত। ভিন্নমত প্রকাশের যে অধিকার সে ক্ষেত্রেও নেতিবাচক কথা শোনা যায় কখনও কখনও। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব বাধা দূর করতেই হবে। ছাত্র রাজনীতিকে করতে হবে দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত। ছাত্র রাজনীতির নামে বেশ কিছু অপকাণ্ড সাম্প্রতিককালেও জনমনে উদ্বেগের দাগ মোটা করেছে। রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম যদি স্বচ্ছ হয়, নেতৃবৃন্দ যদি দায়বদ্ধ থাকেন, তাহলে রাষ্ট্রশক্তি জনকল্যাণমুখী হতে বাধ্য। মানুষের মনের কথা বুঝতে হবে। অনুভূতির মূল্য দিতে হবে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনগণই মূলশক্তি- এটি নিশ্চয়ই কথার কথা নয়।

এ দেশের রাজনীতি নিয়ে নানারকম নেতিবাচক কথা হয়। কিন্তু এ কথা মনে রাখা প্রয়োজন, রাজনীতি ছাড়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না, অধিকারের পূর্ণতা আসে না। রাজনীতির দোষত্রুটি রাজনীতির মধ্য দিয়েই দূর করতে হবে। রাষ্ট্রক্ষমতায় অগণতান্ত্রিক, অরাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতির বিরূপ ফল কতটা প্রকট হয়, হতে পারে- এ রকম তিক্ত অভিজ্ঞতাও তো আমাদের আছে। ২১তম জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্তরা জনগণের অনুভূতির মূল্য দিতে সক্ষম হবেন- এই আস্থা রাখতে চাই।

কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ