চশমখোর ব্যক্তি শুদ্ধিকে পাত্তা দেয় না

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

ভালরা চিরকালই লাজুক। তারা নিজের প্রশংসা শুনলে ঘেমে ওঠে। কেউ অহেতুক তাদের সমালোচনা করলে বা দোষ খুঁজে বের করলে তারা বেশী বিব্রত না হয়ে বরং নিজেকে সংশোধনে মনযোগী হয়ে ওঠে। কোন কিছুর প্রতিবাদ করার আগে ভেবে দেখে সময় ক্ষেপন করে, চিন্তা করে। মন্দরা তার উল্টো। তারা সামান্য সমালোচনা বা কথাও সহ্য করতে চায় না। মন্দরা চিরকাল বেপরোয়া। তারা নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ব্যাতিব্যস্ত থাকে সবসময়। এরা সত্যের সংগে মিথ্যে মিশিয়ে ভাল ভাল কথা বলে মানুষের মন জয় করতে চায়। তবে ভাল-মন্দ মিলেই আমাদের সমাজ। একটি সমাজে দৈনন্দিন কাজের মধ্যে যখন মন্দপ্রভাব বেশী হয় তখন বেঁচে থাকার জন্য শুরু হয় অসম প্রতিযোগিতা। অসম প্রতিযোগিতা মানুষকে ব্যক্তি থেকে পরিবারের মধ্যে হতাশায় নিমজ্জিত করে ফেলে। ব্যক্তি ও পারিবারিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা সামাজিক অসুস্থতা সৃষ্টি করে সামজিক ভাঙ্গন তৈরী করে। এভাবে সামাজিক ভাঙ্গনে পর্যুদস্থ একটি অসুস্থ সমাজের সভ্য জীব তথা বেচেঁ থাকা মানুষগুলোর মধ্যে শুদ্ধাচার হারিয়ে যায়। তাইতো একটি অসুস্থ সমাজ শুদ্ধিকে পাত্তা দেয় না। কারণ তারা ক্রমান্বয়ে চরম অসহিষ্ণু চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো নিজেদের মধ্যে ধারণ করে ফেলে।

মানুষ তার চরম অসহিষ্ণু চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলো নিজেদের মধ্যে ধারণ করার আগে পারি পারশিকতা থেকে তা দেখে দেখে অভ্যস্থ হয়ে ওঠে। তখন তারা সত্য ও মিথ্যের মধ্যে প্রভেদ করা ভুলে যায়। কথায় বলে- একটি মিথ্যে কথা যদি সাতবার সত্য বলে প্রচার করা হয় তাহলে সেটাকে একসময় মানুষ সত্য বলে ধরে নেয়। আর সেই প্রচারটা যদি প্রভাবশালী কেউ কেউ বার বার করেতে থাকেন তাহলে অধ:স্তনরা ‘না পারে সইতে না পারে কইতে’- তারা সত্যটা মিথ্যেটার মাঝে মুখ বুঝে সহ্য করে যায়। এভাবে সত্য হারিয়ে সমাজ হয়ে উঠে ক্ষয়িষ্ণু ও অসহিষ্ণু। সত্যটা গুমরে কেঁদে কেঁদে সমাজের সকল বস্তুগত ও অবস্তুগত দ্রব্যের মধ্যে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ঠাঁই নিয়ে নেয়। বঞ্চিত ও নিগৃহিত মানুষ একদিন নিরুপায় হয়ে সেই অবুঝ ভাষায় অজান্তে কথা বলতে শুরু করে।

প্রতিবছর অগ্রহায়নে আমাদের দেশে নতুন ধানে নবান্ন শুরু হয়। এবারও তাই হয়েছে। কিন্তু নবান্নে নেই আনন্দ। নতুন ধানের আগমনে চালের দর কমে যাওয়ার কথা। অথচ মওশুমের শুরুতেই গ্রামের প্রান্তিক পরিবারগুলোর মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে। সকালের পান্তা ভাতের সাথে কাঁচামারিচ ও একটি পেঁয়াজের সুগন্ধ যেন ওর দামের ঝাঁঝের সাথে উপহাস করছে। এমনকি ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এসে নতুন মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসার পরও কেজিপ্রতি পেঁয়াজের দর প্রতিবছরের এই সময়ের ন্যায় না কমায় ভোক্তারা খুবই ত্যক্ত-বিরক্ত।

বেশ ক’দিন যাবত বিদেশ থেকে পেঁয়াজের আমদানী হয়েচে প্রচুর। নতুন উৎপাদিত পেঁয়াজও এর সাতে সংযুক্ত হয়েছে। কিন্তু নিত্য ব্যবহার্য্য এ পণ্যটির দাম না কমে উল্টো বেড়ে যাওয়ায় স্বয়ং বাণিজ্য মন্ত্রী মহোদয় বড়ই আক্ষেপ করে ‘পদত্যাগ করা এক মিনিটের ব্যাপার’ বলে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে ফেলেছিলেন। আরেকজন ডাকসাইটে মন্ত্রী এটাকে ‘কথার কথা’ বলে তাঁকে পদত্যাগ না করার জন্য বিষয়টি হাল্কা করে দিয়েছিলেন।কিন্তু বিষয়টির পেছনে যে বিরাট কারসাজি তার গভীরতা অনুভব করেতে পেরেই বাণিজ্য মন্ত্রী মহোদয় হয়তো অভিমানের সুরে কথাটি ব্যক্ত করেছেন। তিনি এক শ্রেণির অতি ব্যবসায়ীক মানুষের মূল্যবোধের নিচতাকে অনুভব করতে পেরেছেন। যারা তাঁর আশেপাশেই নিত্য বিরাজ করছে। তারা কি না করতে পারে?

এই শ্রেনিটি যা করতে জানে সেটাই আজকের বাংলাদেশের বড় সমস্যা। যে সমস্যাটা সামাজিক শুদ্ধি অভিযানকে ভুলুন্ঠিত করে চলেছে বার বার। এই শ্রেণির কারণে সমাজের দেহ-মনে আবর্জনার ভাগাড় তৈরী হয়েছে। চশমখোর ও অতি মুনাফালোভীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ব্যক্তি চরিত্রে পচন ধরেছে। গোষ্ঠী চরিত্রে ধরেছে চরম লোভ ও স্বার্থপরতা। এমনকি দেশের চরিত্রে ধরেছে চরম বিভেদের দলকানা রোগ। যেটাকে বলা যায়- একজন অন্যজনের পা টেনে ধরে সামনে যবার পথ রুদ্ধ করে দেয়ার অপচেষ্টা। এ অবস্থা আমাদের গোটা দেশের সকল মানুষের জন্য অমঙ্গলকর ও অমর্যাদাকর বৈকি ।

এ অবস্থায় কার শুদ্ধি ও কিসের শুদ্ধি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করে থাকেন। আমাদের সততার পরীক্ষা কে দেবে? কে বা নিবে? আর কেই বা সেই সততার পরীক্ষায় পাশ করবে তা নিয়ে হিসেব মেলানো বড় দায়। আমাদের দেশের আইন প্রণেতাদের শতকরা আশিভাগই ব্যবসায়ী। তাঁদের হাতে আমদানী রপ্তানীর ব্যবসা। তাদের পরিবার ও বন্ধু-স্বজনদের হাতেই ভোগ্যপণ্যের মজুত, দেশের ধান-চালকলের সিংহভাগের মালিকানা অথবা নিয়ন্ত্রণ। তবে কেন নিত্যপণ্যের দাম বাড়া নিয়ে হাহাকার করতে হচ্ছে সেটাই আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

আমাদের দেশে ঋণ করে ঘি খাওয়ার প্রবাদ প্রচলিত। কারো কারো মাথায় বিলিয়ন টাকার খেলাফী ঋণের বোঝা। এত কর্জ্য নিয়েও তাদের চিন্তা নেই, নেই নৈতিক কোন দুর্বলতা। খেলাফী ঋণের পাহাড় সমান বোঝা নিয়েও তাদের রাতের ঘুমের মোটেও ব্যাঘাত হয় না। তারা আইনকে ভয় পায় না, শুদ্ধিকেও ভয় পায় না। তারা আমাদের এই সমাজের মানুষ হলেও যে কোন প্রয়োজনে সীমানা ডিঙ্গিয়ে অন্য সমাজে উড়ে যাবার সব পথ তাদের কারো কারো জন্যে সব সময় খোলা থাকে। তাদের উপযুক্ত চিকিৎসা করার জন্য আমাদের সমাজের চিকিৎসক কে? ওষুধই বা কী?

প্রবাদে আছ- যৌবনে কাকও সুন্দরী, শ্রাবণে নদীও কুমারী। ক্ষমতা থাকলে মিথ্যাও সত্য বাণী; শক্তি আর টাকা থাকলে মূর্খ্যরাও জ্ঞানী। আমাদের অসুস্থ সমাজে অসুস্থ মানুষগুলোর হীন প্রতিযোগিতা সভ্য জাতি হিসেবে আমাদেরকে আর কত নিচে নামাতে থাকবে তা বিবেকের কাছে আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। শুদ্ধি নিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে নিত্য শুধু হা-পিত্যেশ না করে বহু ‘ইনডিজিনাস’ নীতিমালা দ্বারা চশমখোরদের নৈতিকতা উন্নয়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা জরুরী।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জাহিদ/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।