বিজয় এসেছে মুক্তি আসুক

‘বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, আমার দেশ’- এমন আবেগদীপ্ত শব্দাবলিতেই দেশকে সম্বোধন করতে পছন্দ করেছিলেন আমার দেশের কবিকুল। তখনও আমার দেশজননী পরাধীনা। অশ্রুসিক্ত তার চোখ, মলিন তার বেশ।

দেশজননীর সে রকম রূপ দেখেই তার সন্তানদের আবেগ যেন আরও বেশি বন্ধনহীন হয়ে উঠেছিল। সমস্ত দৈন্য ও মলিনতা সত্ত্বেও ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি’- এ রকমটি কবি নিজে বিশ্বাস করতেন এবং সকলকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিলেন। সেই পরাধীনতার যুগেই বৈশ্বিক মানবতায় স্নাত কবি জীবনানন্দ দাশও বাংলার মুখ দেখে এমনই অভিভূত হয়ে পড়েন যে তিনি পৃথিবীর আর কোনো দেশেরই রূপ দেখার আগ্রহ বোধ করেন না। দেশের প্রতি এ রকম আবেগই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনে প্রবৃত্ত হতে, মুক্তির মন্দির সোপানতলে হাসিমুখে প্রাণ বিসর্জন দিতে। এভাবেই সাদা চামড়ার বিদেশি ইংরেজদের কালো শাসনের হাত থেকে আমার দেশ একসময় মুক্তি লাভ করে। কিন্তু অচিরেই দেখলাম ও বুঝলাম যে এই মুক্তি মোটেই মুক্তি নয়; বিদেশি ইংরেজ শাসকদের তাড়িয়েও আমাদের দেশ আমার হয়ে ওঠেনি।

পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি আমাদের আবার নতুন এক অধীনতার শেকলে বেঁধে ফেলেছে। তাই শুরু করতে হলো শেকল ছেঁড়ার নতুন লড়াই। বড় কঠিন সে লড়াই। সে লড়াইয়ে জিততে হলো লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। কিন্তু এত যে প্রাণের মূল্যে বিজয়ী হলাম, বিজয়ী হয়ে আমাদের দেশটিকে পরিণত করলাম একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে- তারপরও কি আমাদের দেশ আমাদের হয়েছে? এ প্রশ্নটির মুখোমুখি হলে আমি খুব দুঃখে-বিষাদে-হতাশায়-আত্মধিক্কারে একেবারে কুঁকড়ে যাই। আমার সব ভাবনা-চিন্তা এলোমেলো হয়ে যায়। তবু প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে পারি না। বারবারই এ প্রশ্ন আমাকে বিদ্ধ করে। আগে আমরা বিদেশি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছি। বলেছি, ওরা বণিক বেশে এসে ছলে-বলে-কৌশলে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। ওদেরকে ঘাড় থেকে নামাতে না পারলে আমাদের দেশটি আমাদের হবে না। নামালাম ওদের। তবু আমাদের ঘরটি খালি হলো কই! আবার ঘাড়ে চেপে বসল পাকিস্তান। ইংরেজ শাসকের মতো পাকিস্তান শাসকও বিদেশি। তাড়ালাম সেই বিদেশি শাসককেও। কিন্তু তারপর? তারপর তো সবই স্বদেশি। আমাদের এ দেশে চারপাশে সব আমাদের মানুষ। চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারী, যে চুরি করে সেও আমার মানুষ- তাদের যে ধরে আনে বা ঘুষ খেয়ে ছেড়ে দেয় পুলিশ, সেও আমার মানুষ। বিচারপ্রার্থী ও বিচারক উভয়েই আমার মানুষ। উকিল-মক্কেল, রোগী-ডাক্তার, ছাত্র-শিক্ষক, আমলা-পাবলিক সবাই আমার মানুষ। যে গাড়ি চড়ে সেও আমার মানুষ, যে গাড়ি চাপা পড়ে সেও আমার মানুষ। বস্তিবাসীও আমার মানুষ, প্রাসাদবাসীও আমার মানুষ। হাটে-বাজারে, বাড়িতে, রাস্তায়, ট্রেনে-বাসে যারা ভিক্ষা করে, তারা যেমন আমার মানুষ- তেমনি ভিক্ষুক দেখে যারা মাফ করো বলে মুখ ফিরিয়ে নেয় কিংবা কাজ করে খেতে পারো না বলে তিরস্কার করে বা উপদেশ ঝাড়ে, তারাও আমার মানুষ। সবাই আমারই মানুষ।

অর্থনৈতিকভাবে শ্রেণিবৈষম্যপূর্ণ আমার এই দেশ, এ কথা যেমন সত্য; এটিও সত্য যে সামাজিকভাবে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়েছে। এগিয়ে যাওয়ার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে এ দেশের মানুষের প্রবল প্রাণশক্তি। প্রচুর কাজের ক্ষেত্র যেমন আবিস্কৃত হয়েছে এই সময়ে, তেমনই প্রচণ্ডভাবে মানুষ সেগুলোকে নিজেদের কর্মক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তবে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম আমাদের সকল প্রত্যাশার আলো বারবার নিভিয়ে দিয়েছে।

আগে আমরা একজনও কোটিপতি ছিলাম না। পাকিস্তানের বাইশটি কোটিপতি পরিবারের রমরমা দেখে কেবলই আমাদের চোখ টাটাত। গায়ে জ্বালা ধরে যেত। এখন তো আমাদের এ স্বাধীন দেশে বাইশের চেয়ে অনেক বেশি পরিবার শুধু কোটিপতি নয়, কোটি কোটিপতি হয়েছেন। কিন্তু সেই কোটি কোটিপতি স্বদেশি হয়েও তো আমাদের চোখ টাটানো কিংবা গায়ের জ্বালা জুড়াতে পারেনি। আমি তো দেখেছি, বিদেশি বাইশ কোটিপতি পরিবারের চেয়েও এখন স্বদেশি কোটিপতিদের আমলে আমাদের দুর্গতির মাত্রা শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুর্মুখেরা বলে, আমাদের মতো অজস্র মানুষের দুর্গতিকে বাড়িয়ে দিতে পেরেছে বলেই কিছু সংখ্যক মানুষের ঊর্ধ্বগতি সম্ভব হয়েছে। বিত্তহীন সংখ্যাগুরু মানুষের মাথার ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিত্তবান সংখ্যালঘুরা। এ রকম সংখ্যালঘুরাই বিগত দিনে যেমন ছিল সংখ্যাগুরুদের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, এখনও তাই আছে। তবে আগে ওরা ছিল বিদেশি, এখন স্বদেশি- তফাৎ শুধু এটুকুই। সংখ্যালঘু স্বদেশিরা যখন আগেকার সেই বিদেশিদের মতই আমাদের কিল-ঘুসি-লাথি মারে, তখন কি সেসব আমাদের কাছে খুব মিষ্টি লাগে?

বিদেশিরা আমাদের দেশের মানুষের রক্ত চুষে নিত বলে তাদের সহ্য করতে পারিনি। সহ্য করতে না পেরে তাদের তাড়িয়েছি। সেই বিদেশি রক্তচোষাদের তাড়িয়েছি কি স্বদেশি রক্তচোষাদের আমাদের রক্ত চুষবার সুযোগ অবারিত ও অধিকার নিরঙ্কুশ করে দেওয়ার জন্য? এমনটিই কি আমরা চেয়েছিলাম?

আমরা না চাইলেও হয়েছে তো তাই। আমাদের স্বাধীন দেশের এই বিত্তবান সংখ্যালঘুরা আজ হয়ে উঠেছে চরম দুর্বৃত্ত। এরাই রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের হোতা, অর্থনীতিতে লুটেরা, সমাজে সন্ত্রাসীদের গডফাদার। এরাই ধর্মের পবিত্রতাকে ধর্মান্ধতার কলুষে আবৃত্ত করে অমানবিক বিদ্বেষের আগুনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে দগ্ধ করে। এরাই মানুষকে মাদকাসক্ত বানিয়ে তার সুস্থ চেতনার অবলুপ্তি ঘটায়। নারীকে লাঞ্ছিত করে ও পতিতা বানায়। নর-নারী নির্বিশেষে সকলের জীবনকে পণ্যে পরিণত করে। এরাই মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। তার স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকারকেও ছিনিয়ে নেয়। এই সংখ্যালঘুদের হাতে আর কতকাল জিম্মি হয়ে থাকতে হবে আমাদের দেশের সংখ্যাগুরু মানুষকে? এ রকম জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো উপায় আছে কি?

উপায় খুঁজে বের করতেই হবে। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের এ লগ্নে দাঁড়িয়ে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

জাহিদ/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।