অর্পিত(হিন্দু) সম্পত্তির ইজারা ৭ গুন বাড়ানো চলবে না

সুমন দত্ত: সরকার ভারতীয় সম্পত্তি ওরফে শত্রু সম্পত্তি ওরফে অর্পিত সম্পত্তি তথা হিন্দু সম্পত্তির ইজারা ভাড়া তথা সালামি ৭ গুন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটি অনলাইন মিডিয়া সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সরকারের ভূমি মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশ ডিসিদের দিয়েছেন। যা গত ১ জুলাই থেকে কর্যাকর হবার কথা। 

এসব সম্পত্তি যারা ব্যবহার করছেন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে না জেনেই একতরফাভাবে এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। যা অমানবিক ও নিষ্ঠুর।

ধারণা করা হয়েছিল হিন্দুদের সম্পত্তি হিন্দুদের মাঝে বিতরণ করে দেয়া হবে। সেটাই ছিল ন্যায় সংগত। কিন্তু তা না করে হিন্দুদের সম্পত্তির ইজারা মূল্য ৭ গুন করা হলো। হিন্দুদের সম্পত্তি থেকে অর্থ আয় করে মুসলমানদের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করা সাম্প্রদায়িক চরিত্রের বহি প্রকাশ।

বর্তমানে অর্পিত সম্পত্তির যে ইজারা ভাড়া সেটিই পরিশোধ করতে পারে না অনেকে। তার ওপর এই সম্পত্তির ইজারা ভাড়া যদি সাত গুন বাড়ানো হয় তখন বিপদে পড়বে এই সম্পত্তির ভোগদখলকারীরা। সরকারের উচিত ছিল যারা এসব সম্পত্তিতে থাকেন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই সম্পত্তির ইজারা মূল্য নির্ধারণ করা।

অর্পিত সম্পত্তি হিন্দু সম্প্রদায়ের হওয়ায় এর ভোগদখলকারীর মধ্যে অনেক হিন্দু রয়েছে। আবার হিন্দুদের উচ্ছেদ করে বহু মুসলমানও এসব সম্পত্তি ভোগদখল করছে। অনেকে সরকারের কাছ থেকে সরাসরি ইজারা নিয়ে ভোগদখল করছে।

দেশে হিন্দুদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। মুসলমানদের মধ্যেও এমন অনেক পরিবার আছে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তাদের ওপর নতুন ইজারা ভাড়া পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়বে।

নতুন ইজারা ভাড়া কার্যকর হলে এসব সম্পত্তির ভাড়া অনেকে দিতে পারবে না, এমনকি ভাড়াটিয়া খুঁজেও পাবে না। তখন কি করবে সরকার? তখন নিশ্চয় আরেকটি ঘোষণা দিয়ে এসব সম্পত্তির ওপর নিজেদের লোকজন বসাবেন। এমন পরিকল্পনাই নেয়া হয়েছে বলে অনুমান করা যায়।

সবার আগে জানি অর্পিত সম্পত্তি কি? কারা এসব সম্পত্তির মালিক? কারা এসব সম্পত্তি ভোগ দখল করে? কীভাবে করে?

দেশ ভাগের পর যারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের স্থাবর সম্পত্তি ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। তাদের সম্পত্তিকে আইয়ুব খানের আমলে করা হয় শত্রু সম্পত্তি পরে শেখ মুজিবের আমলে করা হয় অর্পিত সম্পত্তি তথা ভারতীয় সম্পত্তি। শুধুমাত্র হিন্দুদের সম্পত্তিকেই অর্পিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সরকার এসব সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করে মাত্র। এসব সম্পত্তির মালিকের নামে বাৎসরিক ভাড়া নেয়া হয়।

সেই ভাড়া থেকে সরকার এসব সম্পত্তি দেখভালের কাজে ব্যবহার করে। অর্থাৎ সরকারের ডিসি ও তার অধীনস্থ অর্পিত সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণকারীদের খরচ চালানো হয় এই ভাড়া থেকে। এটাই এতদিন ধরে হয়ে আসছে। এসব সম্পত্তির আকৃতি প্রকৃতি কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। তবে গুরুতর কিছু ঘটলে ডিসির অনুমোদন সাপেক্ষে তা সংস্কার করা যেতে পারে তবে, শর্ত আকৃতি প্রকৃতি ঠিক রেখে।

যিনি এসব সম্পত্তিতে থাকবেন তিনি অন্য কাউকে বসাতে পারবেন না কিংবা হস্তান্তর করতে পারবেন না। চলে যেতে চাইলে ডিসির কাছে সম্পত্তি বুঝিয়ে দেবেন। এমন বিধানই এসব সম্পত্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।

এখন প্রশ্ন এসব সম্পত্তিতে কারা থাকে? কীভাবে পেল তারা থাকার অধিকার? এসব সম্পত্তিতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ থাকে।

কোন শ্রেণির লোক বেশি থাকে তার কোনো জরিপ হয়নি। তবে সরকারি লোকজন যারা আদালত সংশ্লিষ্ট তারাই বেশি থাকে এসব সম্পত্তিতে। তবে এদের মধ্যে এমন বহু লোক আছে যারা এসব সম্পত্তির মূল মালিকের কাছ থেকে থাকার অনুমতি পেয়েছে কিন্তু কোনো কাগজপত্র পায়নি। এরা বহু পুরানো ভাড়াটিয়া বলে সরকারের বর্তমান নথিতে অন্তর্ভুক্ত। সরকার এদের ওই সম্পত্তিতে বসায়নি বরং সরকারকে তারা ওই সম্পত্তিতে বসিয়ে সম্পত্তির অভিভাবক বানায়। এমন বহু সম্পত্তি সারাদেশেই আছে।

এছাড়া ডিসি তার অধীনস্থ কর্মচারীরা কলমের খোঁচায় অনেক হিন্দু সম্পত্তি অর্পিত ঘোষণা করে বসে আছে। হিন্দুরা পারছেনা নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে। এমন অবস্থায় হিন্দুদের সম্পত্তির তথা অর্পিত সম্পত্তির ভাড়া বাড়ানো অমানবিক।

সরকার এসব সম্পত্তির মালিক নয়। সরকারের কোনো এখতিয়ার নাই এই সম্পত্তির ইজারা মূল্য বাড়ানো। হিন্দুর সম্পত্তির ইজারা মূল্য বাড়ালে অবশ্যই তা হিন্দুদের অন্য প্রকল্পে ব্যয় করতে হবে। গত বছর সরকার হিন্দুদের কল্যাণে বাজেট বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে। তাই হিন্দুদের সম্পত্তির ওপর ইজারা ভাড়া বাড়ানো চলবে না । হিন্দুদের সম্পত্তি ব্যবহার করে মুসলমানের শ্রীবৃদ্ধি করা বর্তমান শাসকদের চরিত্রের সঙ্গে যায় না।

তাছাড়া বলা হয় এসব সম্পত্তির মালিক ভারতে চলে গেছে। তাই ভারত এই সম্পত্তির একটি পক্ষ। এক্ষেত্রে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মতামত কি তা জানা জরুরী বলে মনে করি।

লেখক: সাংবাদিক