একটি ফুরালে আরেকটি আনি সিলিন্ডারের আয়ু কি জানি?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

পাশের বাসার ভাবী সেদিন আমাদের বাসায় এসে তুমুল বক্তব্য দিচ্ছিলেন। বিষয় ইউটিউবে রান্নার বাহারী পদ। তাঁর কথা হলো- নারকেলের ঘনদুধ, ডিমের কুসুম, কাজু বাদামের পেষ্ট, ঘি, মধু, দিয়ে একত্রে মাখিয়ে ওভেনে বিশ মিনিট আঁচ দিলে এমনিতেই তো মুখরোচক একটি মিষ্টান্ন তৈরী হয়ে যাবে। এর একটি বাহারী কঠিন নাম দিলেই তো বাজিমাত। মিষ্টান্নপ্রিয় যে কোন খাদক সেটা মুখে দিয়ে বলবে হুম-ভেরী গুড। রাধুনীর এতে কৃতিত্ব কোথায় তা বুঝলাম না। গল্পটা ভিন্নদিকে মোড় নিয়ে ‘ঝালে মজা নয়- জ্বালে মজা’-র দিকে এগিয়ে অর্থাৎ চুলার জ্বালের তাপের দিকে যেতে যেতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনার কাছে গিয়ে থামলো।

আজকাল রান্না-বান্না নিয়ে টিভি ও ইউটিউবে যে কি শুরু হয়েছে তা না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবেন না ভাবী। আসলে যাদের রান্নার দামী উপাদান কেনার সামর্থ্য নেই, যাদের ওভেন নেই, বাসায় ইন্টারনেট নেই, এমনকি বিদ্দুৎ যায় আর আসে তাদের জন্য এসব রান্না নয়। বিশেষ করে বিদ্দুৎ বিলের ভয়ে এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে সাশ্রয়ী হিসেব মেনে চলতে হয় তাতে আমার দ্বারা ওসব হবে না ভাবী। এদিকে যখন-তখন গ্যাসের লাইনে চাপ থাকে না। তাই খাবার গরমে কেনা সিলিন্ডারের গ্যাসেই আমার ভরসা। জানেন ভাবী, গতকালও রঙীন বেলুন কিনতে যাওয়া নিষ্পাপ চারজন শিশুসহ গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনায় পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছে। তিনদিন আগে পাঞ্জাবের রহিম ইয়ার খান স্টেশনের কাছে ট্রেনের মধ্যে ডিম সিদ্ধ করার সময় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৭৩ জন আগুনে দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। একই পাড়ার আরেকজন সহকর্মীর মেয়ে কোন এক সুন্দর সকালে স্কুলে যাবার পূর্বে তড়িঘড়ি করে নাস্তার জন্য ডিম ভাজতে গিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ হয়ে মুখের সৌন্দর্য্য হারিয়েছেন। এখন তিনি কোন রকমে উচ্চ শিক্ষা সমাপ্ত করে চাকুরী খুঁজছেন। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও বাবা মা তার বিয়ে দিতে পারেননি। এরকম করুণ অধ্যায়ের কতশত জীবন হয়তো আমাদের অনেকেরই আশে-পাশেই রয়েছে। আমরা হয়তো কারুর-ই খোঁজ খবর নেবার ফুরসৎ পাই না অথবা প্রয়োজন মনে করি না। এর জন্য দায়ী কে? এর ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য কেউ কি আইনগতভাবে ও নৈতিকভাবে দায়ী নয়? আমাদের দেশে গ্যাস সিলিন্ডার জনিত দুর্ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলেছে। গেল বছর ঢাকার চুড়িহাট্টায় এতবড় দুর্ঘটনায় ৭৮ জনের করুণ মৃত্যু ঘটে গেল। আবার আনন্দের বেলুন কিনতে গিয়ে এতগুলো কচি প্রাণ হঠাৎ বেলুনের হাওয়ার সাথে আকাশে মিশে গেল- কি যে ভয়ংকর আগামী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

আমি তো একটি সিলিন্ডার ফুরালে আরেকটি নিয়ে আসি। সেগুলোতে কোন তারিখ বা মেয়াদ লেখা থাকে না। কোন কোনটাতে কোম্পানীর নামও দেয়া থাকে না। থাকলেও ঘষামাজা করা, পড়ে বুঝার উপায় নেই। এর অনেকগুলো রং করা নতুন মনে হয়। কোনটা আবার রঙচটা, মুখঢিলা। লক্কর-ঝক্কর মার্কা মিনি ট্রাক অথবা ভ্যান গাড়িতে এগুলো পরিবহন করা হয়ে থাকে। আজকাল বাসা-বাড়ি, হোটেল রেষ্টুরেন্টে রান্না-বান্না, নির্মাণ কাজ ছাড়াও সব ধরনের কাজে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়। গ্যাস বর্তি সিলিন্ডার এখন উন্নয়ন কাজের জরুরী অনুসঙ্গ। এসব গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনায় প্রতিনিয়ত বহু জান-মালের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। বহু প্রাণের বিনিময়ে এই উন্নয়ন কাজের আদৌ কি কোন প্রয়োজন আছে-বলে তিনি আক্ষেপ করলেন।

একটানে কথাগুলো বলছিলেন আর হাঁপাচ্ছিলেন তিনি। রান্নার জন্য ছাড়াও আমাদের দেশে ২০০০ সালে শুরু হয়েছে যানবাহনে গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার। সিএনজি কনভার্সন সেন্টারর সংখ্যা ১৮০টি। এর মধ্যে চালু রয়েছে ১০-১২টি। বর্তমানে পাঁচ লক্ষ চল্লিশ হাজারেরও বেশী গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবৃহত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাইভেট কার বেশী। কারণ দামে সাশ্রয়ী তাই। গাড়ির মালিকেদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে প্রতিবছর অন্তত: একবার পরীক্ষা করে নেয়ার। কেউ কি সেটা নিয়মিত মনেন? বি.আর.টি.এ. এ কাজটা করেন না। এল.পি.জি. পরীক্ষা করে আলাদা কোম্পানী। এদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে সংবাদে জানা গেছে।

নতুন দম্পতি নতুন ঘর-সংসার সাজানোর জন্যে নতুন গ্যাস বার্ণার কিনে আনলেন। তাদের চুলার বয়স একদিন। কিন্তু সেই চুলা জ্বালানোর জন্য কেনা গ্যাস সিলিন্ডারের বয়স কত, তা কি জানেন? আমাদের দেশে ডিজেল, পেট্রোল , অকটেনের চেয়ে সস্তা হলো গ্যাস। তাই এটা কিছুটা সাশ্রয়ী ও এর গ্রাহক বেশী ও ব্যবহারের মাত্রা বেশী। দেশে এল.পি.জি. গ্যাসের চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। প্রতিদিন এই চাহিদা বেড়েই চলেছে।

মানুষ রান্না-বান্নার জন্য দামী সিলিন্ডার না কিনে সস্তাটাই কিনেন। সিলিন্ডার যেহেতু হাত বদল হয় সেহেতু দামী ও বেশী নিরাপদটা কেনার প্রয়োজন মনে করেন না। বেলুন বিক্রেতাগণ দু’পয়সা লাভের আশায় পুরনো সস্তা ও ফেলে দেয়া অকেজো সিলিন্ডারটাকেই খুঁজে নিয়ে ব্যবসা করতে চান।

গ্যাস সিলিন্ডারের প্রতিবর্গ ইঞ্চিতে তিন হাজার পাউন্ড চাপে গ্যাস ভরা হয়ে থাকে। এক একটি বড় বাস বা ট্রাকে ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার থাকে। সেগুলো উচ্চ চাপে ভরা গ্যসের মাধ্যমে ভাঙ্গা-চোরা রাস্তায় বিপজ্জনকভাবে চালানো হয়। মালপত্র, মানুষ বা যাত্রীতে ঠাসা থাকে সেসব যানবাহন। যে কোন সময় বিস্ফোরিত হতে পারে এসব গ্যাস বোমা সদৃশ সিলিন্ডার। প্রতি গাড়িতে ছয় থেকে আটটি সিলিন্ডার হলে সাড়েে পাঁচ লক্ষ গাড়িতে ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ ভয়ংকর গ্যাস বোমা সাথে নিয়ে দিবা-রাত্রিতে ছুটে চলেছে আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিবহন। উন্নত দেশে রাস্তা ভাল, গাড়ি ও সিলিন্ডার মেয়াদ মেনে রাস্তায় চলে। তাই তাদের বিস্ফেরণের খবর কদাচিৎ শোনা যায়। আর আমরা প্রায়শই: শুনি করুণ মৃত্যু সংবাদ।

লেগুনায় আ্ইনের তোয়াক্কা না করে অক্সিজেনের জন্য ব্যবহৃত হাল্কা সিলিন্ডারের মধ্যে উচ্চ চাপের গ্যাস ভরে গাড়ি চালানো হয়। সাধারণত: সেখানে কোন ধরনের তারিখ বা মেয়াদ দেয়া থাকে না। এগুলোর নতুন অবস্থা থেকে ব্যবহার শুরু করলে মাত্র ১০-১৫ বছরের জন্য ব্যবহারযোগ্য। কিন্তু আমাদের দেশে একযুগ আগে মেয়াদ পুর্তি হয়ে গেলেও অতি পুরনো গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার যত্রতত্র লক্ষ্যণীয়। এগুলো দায়িত্বশীলদের নাকের ডগায় ঘটছে। শুধু পেটের দায়ের ওছিলা দিয়ে কেউ কেউ এসব যানবাহন চালানোর কথা বললেও এর মালিকরা বেশ ধনী ও শহরে বসে বিলাসী জীবন যাপন করে থাকেন। তারা গ্রাম থেকে পেটের দায়ে ছুটে আসা নদীভাঙ্গা অভাবী অনভিজ্ঞ মানুষ ও তাদের ছোট ছোট ছেলেদের এসব ভাঙ্গা-চোরা গাড়িতে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার সংযোজন করে পরিবহন ব্যবসা চালু করেন। এরা অনেকেই দিনে গাড়ি চালায় আর রাতের আঁধারে মাদক ও দেহ ব্যবসায় নেমে পড়ে। এগুলোতে চাঁদার ভাগ নেয় পাতি রাজনৈতিক নেতা, দায়িত্বশীল সরকারী শৃংখলা বাহিনী ও তাদের দোসররা। এভাবে শহুরে জীবনে ভাঙ্গা-চোরা গাড়ি অবৈধ পরিবহনের ব্যবসা অবাধে চলছে। এটা এখনও একটা দুষ্ট চক্র হিসেবে বিবেচিত।

এই দুষ্ট চক্র আধুনিক শহরের উন্নত পরিবহন ও জীবন-যাপন ব্যবস্থা ব্যবস্থা চালু করার ক্ষেত্রেও বিশেষ অন্তরায়। এই ধরনের গ্যাসচালিত পুরনো গাড়িগুলোকে ডাম্পিং করে মালিকদেরেকে নতুন গাড়ি ও নতুন সিলিন্ডার ব্যবহারে বাধ্য করার আইনী ব্যবস্থা নেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে। এছাড়া বেলুন, ফানুস ইত্যাদিতে গ্যাসের খোলা ব্যবহার বিধির জন্য কঠোর আইন ও তার নির্ভেজাল বাস্তবায়ন থাকা জনস্বার্থে জরুরী হয়ে পড়েছে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জাহিদ/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।