উচ্ছেদ আতঙ্কে ঝিমাই পুঞ্জির খাসিয়া জনগোষ্ঠী

সুমন দত্ত: প্রভাবশালী কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের দাপটে মৌলভী বাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ঝিমাই পুঞ্জির পাহাড়ে বসবাসরত খাসিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের ৭২টি পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। মিথ্যা প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে স্থানীয় জেলা প্রশাসন কেদারপুর টি কোম্পানির লিমিটেডের লায়লা কবির ওরফে লায়লা রহমান কবিরকে চা বাগান করার ইজারা দিলে এই উচ্ছেদ আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি চা বাগানের রাস্তা দিয়ে খাসিয়াদের জন্য তৈরি হওয়া গির্জার নির্মাণ সামগ্রী প্রবেশে বাধা দেয় বাগান কর্তৃপক্ষ। তারা নির্মাণ সামগ্রী বহনকারী লোকজনদের মারধর করে। এরপর থেকে ঐ এলাকা এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিরোধের অবসান চেয়ে বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে খাসিয়া আদিবাসীদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ও ভূমিতে নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দাবি পেশ করেছে কয়েকটি মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন।

এদিন এসব সংগঠনের প্রতিনিধি হয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি ও প্রধান আইন উপদেষ্টা নিজামুল হক নাসিম। ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য, আরডিসির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল, নিজেরা করি ও এএলঅঅডি চেয়ারপার্সন খুশী কবির ও একই সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহ সভাপতি ডা. আবদুল মতিন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, বাপা সদস্য ফাদার যোসেফ গোমেজ ।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পড়ে শোনান সঞ্জীব দ্রুং। তিনি বলেন, ঝিমাই পুঞ্জির ৪০৬ একর পাহাড়ি জায়গায় ৭২ টি খাসি পরিবার বাস করে। সেখানে পাহাড়িদের বাড়ি ঘর ছাড়াও রয়েছে তিনটি গির্জা, খেলার মাঠ, ক্লাব, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, স্কুল ও খাসি সম্প্রদায়ের পূর্ব পুরুষদের সমাধি ক্ষেত্র। পান চাষ করে খাসি জনগণ নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে। জীবিকার তাগিদেই খাসি লোকজন বন ও গাছ রক্ষা করে আসছে।

২০১২ সালে ১৫ আগস্ট কেদারপুর টি কোম্পানির লায়লা কবিরকে ৬৬১.৫৫ একর জায়গা চা বাগানের জন্য ৪০ বছরের ইজারা দেয়া হয়। আর এই ইজারা দিতে সরকারি কর্মকর্তারা উক্ত জায়গায় খাসি আদিবাসীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। সেখানে শুধু বন ও বাঁশবন আছে বলে তারা জানায়। যা নির্জলা মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নয়। সরকারি কোনো ডিমার্কেশন ছাড়াই কেদারপুর টি কোম্পানি ইজারা বাইরে ২০০ একর জমি নিজেদের দখলে রেখেছে বলে তিনি জানান। এই ইজারা বাতিলের দাবি জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।

নিজামুল হক নাসিম বলেন, সারাদেশেই ইজারার ক্ষেত্রে এসব ঘটে চলছে। আদিবাসীদের উচ্ছেদের চেষ্টা সব সময়ই করা হয়। ৪০ বছরের ইজারা মানে আদিবাসীরা সেখানে থেকে চলে যান। এমন সিগন্যাল দেয়া। আমরা আশা করব সরকার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন করে বিষয়টির সমাধান করুক।

মেজবাহ কামাল বলেন, যখনই পাহাড়ে ভূমি নিয়ে কোনো সমস্যা বা বিরোধ তৈরি হয় তখনই আমাদের মন্ত্রণালয়গুলো ঘুমিয়ে থাকে। আর এই ঘুমিয়ে থাকার কারণেই যত দাঙ্গা হাঙ্গামা গোলযোগের সৃষ্টি হয়। আমরা জানি কেউ যদি এক নাগারে ১২ বছর কোনো স্থানে অবস্থান করে সেটিতে তার অধিকার তৈরি হয়ে যায়। এখানে কীভাবে গেইট লাগিয়ে খাসিয়া আদিবাসীদের অবরুদ্ধ করার সাহস পায় কেদারপুর টি কোম্পানি। এই কোম্পানির লিজ বাতিল করতে হবে। এরা অনিয়মতান্ত্রিকভাবে লীজ নিয়েছে। তাদের লিজ বাতিল করে খাসিয়াদের ভূমি লীজ দিতে হবে স্থায়ীভাবে। তবেই এই বিরোধ মিটবে।

পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, আদিবাসীরা তাদের পূর্ব পুরুষের জায়গায় থাকবে। এটা আন্তর্জাতিক আইন। তাদেরকে কেউ সেখান থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে না। পাহাড়িদের প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। তাদেরকে চলাচলের অধিকার দিতে হবে।

আবদুল মতিন বলেন, সরকার বলে তারা আদিবাসীদের সব সমস্যা সমাধান করে ফেলেছে। বাস্তবে মাঠ পর্যায়ে যখন আমরা যাই তখন দেখি তারা আদিবাসীদের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে দখলদারদের পক্ষ নেয়। আমরা চাই সরকার দেশের সংবিধান অনুসারে কাজ করুক। তাতেই আদিবাসীদের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ফাদার যোসেফ গোমেজ বলেন, আমার জন্মের পূর্ব থেকে ঝিমাই পুঞ্জিতে খাসিদের বসবাস। সমস্যা তৈরি হয় ২০১২ সাল থেকে ইজারার সীমা বাড়ানোকে কেন্দ্র করে। চা বাগান সম্প্রসারণের নামে এই কাজটি করা হয়। এতে সরকারি কর্মকর্তারা একটি মিথ্যা প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক বরাবর দাখিল করে। এজন্য ওইসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। কীভাবে চা বাগানের লোকজন ঝিমাই পুঞ্জির গাছ কাটতে যায়। যে জায়গা তাদের দখলে নেই। সেই জায়গার গাছও তারা লাগায়নি।

ঢাকানিউজ২৪ডটকম