মানবাধিকার কমিশনকে হাইকোর্টের ৭ দফা নির্দেশনা

নিউজ ডেস্ক:    কমিশনের সুপারিশ সরকার অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট কমিশন আইন ও সংবিধান অনুসারে তা হাইকোর্টের নজরে আনাসহ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতি সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। মিরপুরের গৃহকর্মী খাদিজাকে নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা রিটের ওপর সোমবার বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ নির্দেশনাসহ এ মামলার রায় দেন।

আদালতে মানবাধিকার সংগঠন চিলড্রেন চ্যারিটি অব বাংলাদেশের করা রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার আবদুল হালিম। তাকে সহযোগিতা করে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান। শুনানির পর রায় ঘোষণা করে আদালত জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রতি সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।

নির্দেশনাগুলো হলো :

১. মানবাধিকার কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে যে খসড়া বিধিমালা তৈরি করেছে সেই বিধিমালাটি সুশীল সমাজের পরামর্শ নিয়ে যথোপযুক্ত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে গেজেট প্রকাশ করতে হবে।

২. কমিশনকে আইনের ১৬ ধারা অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ১৬ ধারা অনুসারে কমিশন দেওয়ানি আদালতের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে এবং তদন্ত বা অনুসন্ধানের স্বার্থে সাক্ষীকে তলব, নথি তলব বা জামিনযোগ্য পরোয়ানাও ইস্যু করতে পারে।

৩. যদি কমিশনের কোনো সুপারিশ সরকার মান্য না করে তাহলে সংশ্লিষ্ট কমিশন আইনের ১৯ ধারা এবং সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিকার চাইতে হাইকোর্টের নজরে আনতে হবে।

৪. কমিশন থেকে যেসব আদেশ দেওয়া হয় সেসব আদেশের সত্যায়িত অনুলিপি ৩০ দিনের মধ্যে ইস্যু করতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কমিশনকে তাদের পদ্ধতিগুলো নির্ধারণ করে নিতে হবে।

৫. কমিশনে কোনো অভিযোগ আসার পর তা যেন একজন ব্যক্তির স্বার্থে নিষ্পত্তি বা আদেশ দেওয়া না হয়। কমিশন আইনের ১১(৩) বা ২৮ ধারার নিয়ম অনুসারে যথাযথ ক্ষমতা প্রয়োগ করে আদেশ প্রদানকারীদের নাম ও পরিচয় লিখতে হবে।

৬. মানবাধিকার কমিশন যেহেতু একটি আধাবিচারিক কর্তৃপক্ষ সেহেতু কমিশন যে আদেশ দেবে, প্রত্যোকটি আদেশের পেছনেই যথাযথ কারণ উল্লেখ করতে হবে যাতে ন্যায় বিচারের পরিপন্থী না হয়।

৭. খাদিজার বিষয়ে মানবাধিকার কমিশনকে ৬০ দিনের মধ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ সময়ে খাদিজা ও পরিবারের বক্তব্য শুনে খাদিজার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেলে কমিশনের ১৯ ধারা অনুসারে অন্তবর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে সুপারিশ করতে হবে।

পরে ব্যারিস্টার আবদুল হালিম বলেন, ‘রায় ঘোষণাকালে আদালত বলেছেন, এতদিনে হয়ত পুলিশ খাদিজার পরিবারকে পক্ষপাতদুষ্ট করে ফেলেছে, যেটা প্রতিবেদনে দেখা গেছে। ওই প্রতিবেদনে খাদিজার কোনো অভিযোগ নেই এবং তার বাবা সংক্ষুব্ধ নন। এ কারণে আদালত বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এবং হতাশা প্রকাশ করেছেন। আদালত বলেছেন, পাঁচ বছর পরে একজন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বসে থাকবে না। পুলিশ ইতিমধ্যে তাদের পক্ষপাতদুষ্ট করে ফেলেছে। এরপরও যেহেতু বিষয়টি মানবাধিকার কমিশনে গিয়েছে, তাই কমিশনের এখনো অনেক কিছু করণীয় আছে। তাই কমিশনকে খাদিজার অভিযোগ পর্যালোচনা করে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারকে সুপারিশ করতে বলা হয়েছে।’

প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৩ সালে রাজধানীর মিরপুরে গৃহকর্মী খাদিজাকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় একটি জাতীয় পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই প্রতিবেদন সংযুক্ত করে মানবাধিকার সংগঠন চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গহণে চিঠি দেওয়া হয়। এরপর পাঁচ বছর কেটে গেলেও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত গত ৯ জানুয়ারি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় যথাযথ পদক্ষেপ নিতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ব্যর্থতা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। রুলের চূড়ান্ত শুনানি করে আজ রায় দেওয়া হয়।