৭ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা ও সৈনিক হত্যার বিচার দাবি স্বজনদের

সুমন দত্ত: ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর শুধু মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদেরই হত্যা করা হয়নি। হত্যা করা হয়েছে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও। যারা সেদিন ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন না, তাদেরকেও হত্যা করা হয়েছে তথাকথিত বিপ্লবের নামে। আজ নিহত সেইসব সেনা পরিবারের সন্তানরা তাদের ওপর ঘটে যাওয়া সেদিনের বর্বরতার বিচার চেয়েছে রাষ্ট্রের কাছে। সেদিন যেসব অপবাদ দেওয়া হয়েছে, বিচারিকভাবে তার অবসান চান তারা।

বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে খালেদ মোশারফ ট্রাস্ট কর্তৃক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন সাবেক এমপি মাহজাবিন খালেদ। তিনি সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশারফের কন্যা। তার বাবাকে ৭ নভেম্বর জিয়া মোশতাক চক্র সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছিল। এদিন তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন নিহত কর্নেল (অব) আবু ওসমান চৌধুরীর কন্যা নাছিমা ওসমান। আরও ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার ড. তুরিন আফরোজ, বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম (বোয়াফ) সভাপতি কবীর চৌধুরী তন্ময়, সাবেক তথ্য সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ।

মাহজাবিন খালেদ তার বক্তব্যে শুরুতে ১৯৭৫ সালে নিহত বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। পাশাপাশি ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাসহ ৭ নভেম্বর নিহত সেনা সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে খুনি মোশতাক ক্ষমতা দখল করেন। এতে শক্তিশালী হয়ে ওঠে সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসার ফারুক-রশিদ-ডালিম চক্র। বঙ্গভবনে অবস্থান নিয়ে তারা সব জায়গায় ছড়ি ঘোরাতে থাকেন। এসব সেনা অফিসাররা সেদিন সিনিয়র অফিসারদের প্রতি খবরদারি করছিল। এতে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুরোপুরি ভেঙে যায়। খালেদ মোশারফ এই খুনি চক্রকে শায়েস্তা করে সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। তারই ফল স্বরূপ তিনি ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর এক সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত করে বিচারপতি সায়েমকে ক্ষমতায় বসান। সেদিনের এসব ঘটনায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে একটি গুলিও ছুড়তে হয়নি। কোনো সৈনিক মারা যায়নি। ৬ নভেম্বর রাতে খালেদ মোশারফ তার সহকর্মীরা বঙ্গভবনেই ছিল। সেদিন গোলাগুলির শব্দ শুনে খালেদ মোশারফ কর্নেল হুদার মাধ্যমে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক নওয়াজেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার ইউনিট পরিদর্শনে যান। ভোরের দিকে জিয়াউর রহমান খালেদা মোশারফের অবস্থান জানার পর তার সঙ্গে কথা বলেন। এসময় দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। এরপরই কিছু সৈনিক নওয়াজেশের অফিসের দরজা ভেঙ্গে খালেদ মোশারফ ও কর্নেল হুদাকে বাইরে বের করে আনে। তাদেরকে গুলি করে হত্যা করে। ছেড়ে দেয়নি নওয়াজেশকেও। তাকেও এদের সঙ্গে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। জিয়ার নির্দেশেই এই হত্যা কাণ্ড হয়েছে। কারণ খালেদ মোশারফ জিয়াকে গৃহবন্দি করে ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চান তিনি।

নাছিমা ওসমান বলেন, আমরা ৭ নভেম্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। বিচার হতে হবে সেদিনের ইতিহাস সঠিকভাবে লেখার জন্য। তা না হলে ৭ নভেম্বর নিয়ে অপপ্রচার হতেই থাকবে। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৭ নভেম্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। তিনি আরো বলেন, আমরা বাবা রাজনীতি করতেন না। এমনকি তিনি ঢাকা সেনানিবাসেও থাকতেন না। তারপরও সেদিন ঘাতকরা আমার পরিবারকে খুঁজে বের করে। আমরা গুলশানের এক বাড়িতে থাকতাম। ঘাতকরা আমার তিন বোনকে অন্য একটি ঘরে আটকে রেখে আমার বাবা-মাকে হত্যা করে।

কবীর চৌধুরি তন্ময় বলেন, ৭ নভেম্বর সম্পর্কে আজকের তরুণ প্রজন্ম কিছুই জানে না। তথাকথিত বিপ্লবের নামে সেদিন বহু মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের হত্যা করা হয়েছিল। আমাদের দাবি একটি ট্রুথ কমিশন গঠন করে সেদিনের সঠিক ইতিহাস বের করে আনা। তিনি আরো বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যার বিচারে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি হয়েছে। খালেদ মোশারফ হত্যার বিচার কেন হবে না? মুক্তিযুদ্ধের সরকার ক্ষমতা থাকতে আমরা খালেদ মোশারফ হত্যার বিচার করতে পারছি না। এটা জাতীয় লজ্জা। আমরা চাই তথাকথিত বিপ্লবের নামে যাদের হত্যা করা হয়েছে । যারা এই হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত তাদেরকে বিচারের আওতায় এনে সঠিক ইতিহাস দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা। নতুন প্রজন্ম ৭ নভেম্বরের ইতিহাস জানতে চায়।

নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৭ নভেম্বর জাতির সূর্য সন্তানদের হত্যা করা হয়েছে। অন্যসব হত্যাকাণ্ডের মত এই হত্যাকান্ডেরও বিচার হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় নিয়ে যাবার জন্য এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এতে সহায়তা করেছে তৎকালীন জাসদের অতি বিপ্লবীরা। এই সত্য লুকিয়ে রাখার নয়। বললে পুরোটা বলতে হবে বলে তিনি জানান। একটি ট্রুথ কমিশনের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে পারে। তার জন্য সরকারের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তৎকালীন প্রতি অভ্যুত্থানের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে বলে তিনি জানান।

তুরিন আফরোজ বলেন, নভেম্বরের যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে তার বিচারে আইনগত কোনো বাধা নেই। এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই করতে হবে। এতে রাজনীতি হতে পারে। তারপরও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।

ঢাকানিউজ২৪ডটকম