বাংলাদেশ ব্যাংকের সেন্ট্রাল ভল্ট ময়মনসিংহ থেকে অন্যত্র সরানোর চক্রান্ত, দুর্বার আন্দোলনের হুমকী

মো. নজরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ :
স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও বাংলাদেশ বাংকের (বিবি) সেন্ট্রাল ভল্ট স্থাপিত হয়নি। দেশের সর্বশেষ বৃহৎ অত্যাধুনিক এবং সেন্ট্রাল ভল্ট এর পরিকল্পনা নিয়ে ১০তম বাংলাদেশ ব্যাংক, ময়মনসিংহ স্থাপিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা সভার পর পর ৫টি সভায় সিদ্ধান্ত আলোকে অবস্থানগত দিক থেকে সারাদেশের সাথে সহজ যোগাযোগগের কেন্দ্রস্থল ময়মনসিংহে বাংলাদেশ বাংকের সেন্ট্রাল ভল্ট স্থাপনের পরিকল্পণা নেয়া হয়। কিন্তু ইদানিং ময়মনসিংহে বাংলাদেশ বাংকের সেন্ট্রাল ভল্ট স্থাপন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ময়মনসিংহ থেকে সেন্ট্রাল ভল্টটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার নানা পায়তারাও হচ্ছে। যার প্রেক্ষিতে সেন্ট্রাল ভল্টের নির্মাণ কাজও থমকে গেছে। ময়মনসিংহ থেকে অন্যত্র বাংলাদেশ বাংকের সেন্ট্রাল ভল্ট সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা কর হলে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে তা ফিরিয়ে আনা হবে বলে ময়মনসিংহ বিভাগ উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি বর্ষিয়ান জননেতা অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান খান। গতকাল বিকেলে এক মতবিনিময় সভায়এ আহবান জানান। এদিকে সেন্ট্রাল ভল্ট স্থাপনের প্রাথমিকভাবে নকশা প্রণয়ন হয়েছে যা এখন বিবি’র পরিচালনা সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে সেন্ট্রাল ভল্ট স্থাপন করা হলে প্রায় ৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। আর সাধারণ রংপুর ও বরিশালের মতো সাধারণ শাখা হলে দুই শতাধিক লোকে কর্মসংস্থান হবে। টাকশাল থেকে নতুন টাকা ছাপানোর পর প্রথমে যাবে প্রস্তাবিত ময়য়নসিংহের সেন্ট্রাল ভল্টে। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন টাকা সরবরাহ করার কথা। এছাড়া সারা দেশের ছিড়া টাকা জমা হবে সেট্রাল ভল্টে। এখানেই তা ধ্বংস করার কথা ।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জেলা নাগরিক আন্দোলন কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভা সভাপতি বর্ষিয়ান জননেতা অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান খানের সভাপতিত্বে বিভাগ উন্নয়ন পরিষদের মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার নূরুল আমিন কালামের পরিচালনায় আরো বক্তব্য রাখেন বিভাগ উন্নয়ন পরিষদের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট এমদাদুল হক মিল্লাত, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক কাজী আজাদ জাহান শামীম, পরিবেশ রক্ষা উন্নয়ন আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন, ময়মনসিংহ জেলা ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মাহমুব বিন সাইফ, জেলা নাগরিক আন্দোলনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও গণকল্যাণ পরিষদ (জিকেপি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোঃ সিরাজুল ইসলাম, ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ নজরুল ইসলাম প্রমূখ।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও বাংলাদেশ বাংকের মূল ভল্ট স্থাপন হয়নি। স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তান আমলে করাচিতে ছিলো মূল ভল্ট এবং ঢাকার মতিঝিলে স্থাপন হয় সাব-ভল্ট। এখনো সাব-ভল্ট দিয়েই চলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রম। অবশেষে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের দায়িত্ব পালনকালীন বাংলাদেশ বাংকের পর পর ৫টি বোর্ড মিটিংএর সিদ্ধান্ত আলোকে অবস্থানগত দিক থেকে সারাদেশের সাথে সহজ যোগাযোগগের কেন্দ্রস্থল ময়মনসিংহে ১০ম শাখায় বাংলাদেশ বাংকের মূল ভল্ট স্থাপনের পরিকল্পণা নেয়া হয়। সে মোতাবেক জমি অধিগ্রহন ও এখন পর্যন্ত টি ডরমেটরী স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে।

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ ময়মনসিংহ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড প্রসার ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত এবং কৃষি ও কৃষি ভিত্তিক শিল্প বিকাশের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ম শাখা উদ্বোধন হয় ২০১৩ সালের ১৬ জানয়ারী।
দেশের সর্বশেষ বৃহৎ অত্যাধুনিক এবং সেন্ট্রাল ভল্ট এর পরিকল্পনা নিয়ে ১০তম বাংলাদেশ ব্যাংক, ময়মনসিংহ অফিসটি প্রাথমিক ভাবে একটি ভাড়া করা বিল্ডিং নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল গত ২০১৩ সালের ১৬ জানয়ারী।

বৃহত্তর ময়মনসিংহের ছয়টি জেলায় বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় ছয়শ’ শাখা রয়েছে যা বাংলাদেশের মোট শাখার ৭ শতাংশের বেশি। এই ব্যাংক শাখাগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয় থেকে মনিটর করা দূরুহ ব্যপার কিন্তু ময়মনসিংহ অফিসের মাধ্যমে মনিটরিং প্রক্রিয়া সহজ ও জোরদার হবে। তাছাড়া, নতুন নোট প্রদান, পুরাতন ও ছেঁড়াফাটা নোট পরিবর্তন, সঞ্চয়পত্র ও প্রাইজবন্ড ক্রয়-বিক্রয়, ট্রেজারি কার্যক্রম পরিচালনা, ক্লিয়ারিং হাউজ পরিচালনা হবে সহজ ও দ্রুত। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির সাথে সঙ্গতি রেখে সম্প্রসারিত হয়েছে দেশের আর্থিক খাত এবং বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। শিল্প, বাণিজ্য ও কৃষির সম্প্রসারণের সাথে সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এবং লেনদেন ও মুদ্রার চাহিদা। ক্রমবর্ধমান এ সকল চাহিদা ও কর্মকান্ড বিবেচনা ও এর যথাযথ সঞ্চালন নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিনিয়ত প্রবর্তন করে চলেছে নতুন নতুন কৌশল এবং নিয়োজিত করছে দক্ষ জনবল। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত প্রধান কার্যালয় ও মতিঝিল অফিস হতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার অনেকাংশই যথাযথভাবে বিবেচনায় আনা এবং পূরণ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামাজিক গুরুত্বের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও মতিঝিল অফিসের বিভিন্ন কাজ যথাযথভাবে এবং যথাসময়ে সম্পাদনের দিক বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক,ময়মনসিংহ অফিসটির প্রয়োজন ছিলএকান্ত অপরিহার্য।

যদিও অফিসটির প্রয়োজনে প্রাথমিক ভাবে ১০ একর জায়গার সিদ্ধান্ত ছিল কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারণে তা নেয়া হয় ৬.৩ একর। অফিসটি পরিপূর্ণ হলে লোকবলের যেমন চাহিদা বাড়বে তেমনি প্রমোশনের ক্ষেত্র হবে প্রসারিত।
তাই সার্বিক বিবেচনা করে নিজস্ব ভবনের কাজ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক, ময়মনসিংহ শাখার নিজস্ব জমি ক্রয়, নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী সীমানা দেয়াল, দুটি ডর্মেটরী ভবন নির্মাণ ইতোমধ্যে হয়ে থাকলেও মূল ভবনের কাজ শুরু করা নিয়ে একটি ষড়যন্ত্রকারী দল ষড়যন্ত্র করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৫টি সভায় সিদ্ধান্ত হয়। (১) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল ভল্ট হবে ময়মনসিংহ অফিসে। (২) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডাটা ব্যাকআপ থাকবে ময়মনসিংহ অফিসে। (৩) কেন্দ্রীয় ভল্টে গাজীপুর সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে নতুন টাকা রাখা হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সব শাখায় সরবরাহ করা হবে।পুরাতন সব টাকা ময়মনসিংহ শাখায় আসার পর ধ্বংস করা হবে। (৪) ময়মনসিংহ অফিস প্রধান নির্বাহী পরিচালক দেয়ার কথা থাকলেও অদ্যাবধি পোষ্টিং দেয়া হয় নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি স্বাধীনতা বিরোধী মহল বর্তমান সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডকে বাধাগ্রস্থ করার জন্য ষড়যন্ত্র করে চলেছে। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ভল্ট করা হলে নিদেনপক্ষে পাঁচ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। ময়মনসিংহের বাইপাস রোডে বাংলাদেশ ব্যাংকের ময়মনসিংহ শাখায় মূল ভল্ট স্থাপন করে ক্যাশ বিভাগ দ্রুত চালু করার অনুমতি দেয়ার জোর দাবী জানিয়েছেন ময়মনসিংহ বিভাগ উন্নয়ন পরিষদের মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার নূরুল আমিন কালাম।
কৃষি শিল্প, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ময়মনসিংহের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে গণকণ্যাণ পরিষদ (জিকেপি) নির্বাহী পরিচালক, জিকেপি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজসেবক ড. মোঃ সিরাজুল ইসলাম বলেন বিবি ময়মনসিংহ শাখায় হওয়ায় বৃহত্তর ময়মনসিংহের ৬টি জেলায় বিভিন্ন ব্যাংকের ৬শ’ শাখার নিবিড় মনিটরিং ও পর্যবেক্ষণ করার কথা। এখান থেকে নতুন নোট প্রদান, পুরাতন নোট ও ছেঁড়া-ফাটা নোট পরিবর্তন, সঞ্চয়পত্র ও প্রাইজবন্ড ক্রয়-বিক্রয়, ট্রেজারি কার্যক্রম পরিচালনা, ক্লিয়ারিং হাউজিং পরিচালনা কার্যক্রম সম্পাদন করার পরিকল্পণা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। তা বাস্তবায়নের জন্য আমরা ময়মনসিংহবাসী কর্তৃপক্ষর কাছে জোর দাবী জানাচ্ছি।

ড. মোঃ সিরাজুল ইসলাম আরো বলেন, ময়মনসিংহে রয়েছে কৃষি, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিশেষ করে চালকল, পাটজাত পণ্য, তাঁত ও হস্তশিল্প, মৎস্য চাষ, মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ, পোলট্রি ও ডেইরি ফার্ম, কৃষি যন্ত্রপাতি ও হাল্কা প্রকৌশল শিল্প। এছাড়াও এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ নারী হলেও এখানে নারী উদ্যোক্তা তেমন গড়ে ওঠেনি। এসব সম্ভাবনার দিকটির প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে ব্যাংকের শাখাটিকে আরো বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত। এসব খাতে সময় মতো কৃষি ও এসএমই ঋণ প্রদানের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি সৃষ্টি করা হলে এতে একটি বিশাল ভূমিকা রাখবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।