শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ভাংছেই

নিউজ ডেস্ক:   শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ভেঙেই যাচ্ছে। আলাদা দল গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন দলটির বিক্ষুব্ধ নেতারা। আগামী ২৯ ও ৩০ নভেম্বর সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন দল গঠনের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন তারা। নতুন দলের নাম ও কর্মপন্থা এখনও ঠিক না হলেও সম্মেলনের মাধ্যমে সেটি চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়েছেন ওই নেতারা।

ওয়ার্কার্স পার্টির দশম কংগ্রেস বর্জনকারী কেন্দ্রীয় ছয় নেতার নেতৃত্বেই নতুন এই দল গঠনের উদ্যোগ চলছে। এই উদ্যোগে শামিল করতে আরও কিছু নেতার সঙ্গে আলোচনাও চলছে। একই সঙ্গে সমর্থন পেতে অন্য বামপন্থি ও গণতান্ত্রিক দল এবং সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন নতুন দল গঠনের উদ্যোক্তারা। এ অবস্থায় গতকাল শনিবার শুরু হওয়া ওয়ার্কার্স পার্টির চার দিনের দশম কংগ্রেসে যোগদান থেকে বিরত রয়েছেন বিক্ষুব্ধ নেতারা।

এরই মধ্যে ওই ছয় নেতার নতুন দল গঠনের উদ্যোগ চালিয়ে নিতে একটি সাংগঠনিক কাঠামোও দাঁড় করানো হয়েছে। ‘বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির আদর্শ রক্ষায় কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি’র ব্যানারে কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা। যার সমন্বয়ক করা হয়েছে কংগ্রেস বর্জনকারী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ইকবাল কবির জাহিদকে। এই কমিটি গত কয়েকদিন ধরে বাম গণতান্ত্রিক জোটভুক্ত সিপিবি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ছাড়াও গরিব মুক্তি আন্দোলনসহ বামপন্থি দল ও সংগঠন নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। এসব মতবিনিময় সভায় ওয়ার্কার্স পার্টির মতাদর্শগত সংগ্রাম ও কংগ্রেস বর্জনের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপনের পাশাপাশি কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা। পর্যায়ক্রমে অন্য দলগুলোর সঙ্গেও মতবিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

সূত্রমতে, নতুন দল গঠনের উদ্যোক্তাদের সম্মেলন ২৯ ও ৩০ নভেম্বর যশোরে অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা ও বরিশালের বাইরে যশোরে ওয়ার্কার্স পার্টির একটি ‘শক্ত অবস্থান’ থাকায় সেখানেই সম্মেলন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নতুন দল গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ইকবাল কবির জাহিদের বাড়ি যশোর এবং দলের যশোর জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি তিনি। ইতোমধ্যে যশোর জেলা কমিটির সিংহভাগ নেতাই কংগ্রেস বর্জনের পাশাপাশি ছয় নেতার উদ্যোগের প্রতি সমর্থনও জানিয়েছেন। মূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আদর্শচ্যুতি এবং দলের অভ্যন্তরে আর্থিক অনিয়ম ও বিভিন্ন জেলায় সদস্য সংগ্রহে গঠনতন্ত্র না মানাসহ বিভিন্ন অভিযোগ এনে কংগ্রেস বর্জন করেন যশোরের নেতারা।

নতুন দল গঠনের উদ্যোক্তারা সম্প্রতি ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে বহিস্কৃত পলিটব্যুরোর সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাসের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন। বিমল বিশ্বাস অবশ্য তাদের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানালেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে নতুন দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকার বিষয়ে কিছুটা অনীহাও দেখিয়েছেন। সমকালকে তিনি বলেছেন, ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ছয় নেতা যে মত দিয়েছেন কিংবা কংগ্রেস বর্জনের আহ্বান জানিয়ে যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত তিনি। তবে শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সের কারণে নতুন দলের কমিটিতে থেকে সরাসরিভাবে কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব কিনা তা নিয়ে কিছুটা সংশয়ে রয়েছেন তিনি।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল ও সরকারে থাকা-না থাকার প্রশ্নে এর আগে থেকেই ওয়ার্কার্স পার্টিতে মতাদর্শগত বিরোধ চলে আসছিল। সর্বশেষ দলীয় ফোরামে আলোচনা ছাড়াই দলীয় সভাপতি রাশেদ খান মেননের স্ত্রী লুৎফুন্নেসা খান বিউটিকে দলের কোটায় একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা এমপি নির্বাচিত করা এবং দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও আয়-ব্যয়ের হিসাব দাখিল না করাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধ আরও দানা বাঁধে।

এ অবস্থায় দলের ছয়জন কেন্দ্রীয় নেতা দশম কংগ্রেস বর্জনের জন্য দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের আহ্বান জানিয়ে গত সোমবার বিবৃতি দিলে বিরোধ প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। তাদের বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ১৪ দলে যুক্ত থাকার মাধ্যমে বুর্জোয়া লেজুড়বৃত্তি, মতাদর্শগত বিচ্যুতি ও বিলোপবাদী ধারায় অধঃপতিত হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। এই ছয় নেতা হচ্ছেন ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর দুই সদস্য নুরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও কন্ট্রোল কমিশনের চেয়ারম্যান অনিল বিশ্বাস, জাকির হোসেন হবি এবং বিকল্প সদস্য মোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু ও তুষার কান্তি দাস। বুধবার ওয়ার্কার্স পার্টির এক সংবাদ সম্মেলনে ওই ছয় নেতার কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব বাতিলের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে তাদের দল থেকে বহিস্কারের বিষয়ে কংগ্রেসে আলোচনার পর আগামী কেন্দ্রীয় কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা এমপি। পরদিন বৃহস্পতিবার এক খোলা চিঠিতে ২৯ নভেম্বর পাল্টা সম্মেলন ডাকার ঘোষণা দেন বিক্ষুব্ধ নেতারা।

অন্যদিকে, ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর আরেক সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস গত ২২ অক্টোবর দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে দল ছাড়ার ঘোষণা দেন। ওই চিঠিতে মূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দলীয় আদর্শ থেকে ‘বিচ্যুতির’ অভিযোগ এনে দলের প্রাথমিক সদস্যপদও প্রত্যাহার করে নেন তিনি। ২৬ অক্টোবর দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে বিমল বিশ্বাসকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়।

জানতে চাইলে ‘বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির আদর্শ রক্ষায় কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ইকবাল কবির জাহিদ সমকালকে বলেছেন, ২৯ নভেম্বরের সম্মেলনে দলের সারাদেশের প্রতিনিধিদের ডেকেছেন তারা। সেখানেই তাদের করণীয় ও কর্মপন্থা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপন্থার অভিমুখই হবে কমিউনিস্ট ও বাম ঐক্য প্রতিষ্ঠা।