দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে আসছে

সুমন দত্ত: দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন পরিণত হয় সম্পাদক সম্মেলনে। আবরার হত্যার সুবিচার নিয়ে সন্দিহান জনগণ। আর সরকার রয়েছে ভাবমূর্তি সংকটে। সমালোচনার পরিবেশ নেই। শাসক শ্রেণির বাক স্বাধীনতা আছে। জনগণের নেই। মত প্রকাশ করলে হয় মামলা।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত বাক স্বাধীনতা হুমকির মুখে শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন আমন্ত্রিত বক্তারা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুপ্রিমকোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। এদিন তার সঙ্গে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ড. সি আর আবরার, ড.রুবাইয়াত ফেরদৌস, ড. আসিফ নজরুল, ব্যারিস্টার জৌর্তিময় বড়ুয়া। আলোচনা সভায় কম লোকের উপস্থিতি দেখে হতাশা প্রকাশ করেন ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, কেউ আসুক না আসুক আমাদের কাজ হচ্ছে মসজিদের মুয়াজ্জিনের মত আযান দেয়া। আমরা সেই কাজটাই করে যাব। বাংলাদেশের ইতিহাস প্রতিবাদের ও প্রতিরোধের ।

রুবাইয়াত ফেরদৌস বলেন, আজ উপস্থিতি কম, তবে আমরা কোয়ালিটিতে বিশ্বাসী কোয়ানটিটিতে নয়। আজ বাংলাদেশে মানুষের বাক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে আসছে। হুমায়ুন আজাদকে বাক স্বাধীনতার কারণে চাপাতির কোপে ফালি ফালি করা হয়। তার দোষ তিনি পাক সার জমিন বাদ লিখেছিলেন। একটি বইয়ের মাধ্যমে তিনি মত প্রকাশ করেছিলেন। তাই তাকে হত্যা করা হলো। অভিজিৎ বই লিখেছিল। তাকে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বই মেলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার বাবা এখন ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে ক্লান্ত।

তিনি আরো বলেন, বাক স্বাধীনতা চর্চা কারণে তসলিমা নাসরিনকে দেশ ত্যাগ করতে হয়। আজ বিভিন্ন স্থানে ফেসবুক আইডি হ্যাক করে হিন্দু সম্প্রদায়ে বাড়ি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। এর প্রধান কারণ সরকারের সমালোচনা করতে না দেয়া। আবরারকে হত্যা করা হয়েছে কেন? মত প্রকাশের জন্য তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। দেশে আজ সোশ্যাল ক্রসফায়ার হচ্ছে। শবেবরাতে গাবতলীতে ৫ কিশোরকে পিটিয়ে মেরে ফেলা সোশ্যাল ক্রসফায়ারের উদাহরণ। আর এটা এসেছে র‍্যাবের ক্রসফায়ার থেকে উৎসাহিত হয়ে। মানুষের মনের মধ্যে ধারণা জন্মেছে যে আমরাও মারতে পারি। যে সমাজে তর্ক নেই। সেটা মৃত সমাজ। সেটা বদ্ধ সমাজ। চিন্তা ও ভাব প্রকাশ না থাকলে সমাজে সাহিত্য সৃষ্টি হয় না। আইমে জাহেলিয়াতের সময় ইমরুল কায়েসের লেখা এখনো মাদ্রাসাতে পড়ানো হয়। এরপর সৌদি শাসনে সব বন্ধ হয়ে গেল। হামদ আর নাথ ছাড়া কিছুই নাই তখন। তেমনি রুশ বিপ্লবের আগে সব সাহিত্য ছিল। এরপর আর কিছু তৈরি হয় নাই। অর্থাৎ যে সমাজে চিন্তা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না সে সমাজে সাহিত্য তৈরি হয় না। চিন্তার বিকাশ ঘটে না। আজ বিশ্ব নেতাদের স্ট্যাডার্ড নিচে নেমে গেছে। ট্রাম্প, মোদি, দুর্তাতে, পুতিন, কিম এরা কেউ ভালো কোনো নেতা নয়। অথচ এরা নির্বাচিত।

ব্যারিস্টার জৌর্তিময় বড়ুয়া বলেন, দেশে সেন্সেরশীপ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। সাংবাদিক বলেন কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবী সংগঠন। সবার ওপর সেন্সরশীপ আজ আইনের মাধ্যমে চলে এসেছে। রাষ্ট্রের বাহিনী এখন দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। পার্লামেন্ট এখন ব্যবসায়ীদের সংগঠনে পরিণত হয়েছে। কারা আইন তৈরি করে? কাদের স্বার্থে? আইনগুলো আজ মালিকদের স্বার্থে। শ্রমিকদের স্বার্থে ও কৃষকদের স্বার্থে কোনো আইন তৈরি হচ্ছে না। একেকটা আইনে ৬০-৭০ ধারা থাকে।তার মধ্যে একটা ধারা থাকে যেটার প্রয়োগ করার জন্যই গোটা আইনটা তৈরি করা হয়। যেমন ৫৭ ধারার সঙ্গে অনেকগুলো ধারা ছিল। সেই সব ধারায় কি কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে? হয় নাই। বুঝতে হবে ৫৭ ধারার জন্যই ওই আইনটা তৈরি করা হয়েছিল। এখন ৫৭ ধারা নতুন আইনের ভিতর চলে গেছে। বিলুপ্ত হয় নাই।

সি আর আবরার বলেন, বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার রেটিং গেল বছর ছিল ১৪৬। এখন ১৫০। এই অবনমন কেন? জাতির বিবেক অনেক ক্ষেত্রে নীরব থকেন। কেন? রেহমান সোবহানের মতো মানুষ আজ বলেন, এখন কিছু লিখলে ৭দিন চিন্তা করতে হয়। পাকিস্তান আমলে এমন ছিল না। আবরার হত্যার বিচার হবে কিনা জানি না। কারণ যে আদালত বিশ্বজিৎ হত্যার আসামীদের ছেড়ে দেয় সেই আদালতের বিচারের ওপর আমরা সন্দিহান।

ড. আসিফ নজরুল বলেন, ইউটিউবে ট্রাম্পকে নিয়ে আমরা একটা ভিডিও দেখলাম। বহু মানুষ ট্রাম্পকে অপমান করছে। কেউ কিছু বলছে না। বাংলাদেশে এসব কি সম্ভব? বাক স্বাধীনতা শাসকের আছে। অন্যদের নাই। যে কারণে শাসক গোষ্ঠী ড. কামাল হোসেন, ড. ইউনুস, খালেদা জিয়াকে নিয়ে যা খুশি বলতে পারে। বিপরীতে তাদের নিয়ে কিছু বলা যাবে না। এদেশে সংবাদ সম্মেলন হয় না। হয় সম্পাদক সম্মেলন। তাতে প্রধানমন্ত্রী সম্পাদকদের প্রশ্ন করে নাস্তানাবুদ করে দেয়। আর সম্পাদকরা বেহায়ার মতো একটা হাসি দেয়। লজ্জা নাই এদের। অন্যদিকে ট্রাম্প কিংবা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন দেখুন সেখানে সাংবাদিকরা তাদের প্রশ্ন করে নাস্তানাবুদ করে ছেড়ে দেয়।

ড. শাহদীন মালিক বলেন, বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে চায়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা চায়। সেই পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য আমরা এ ধরনের অনুষ্ঠান বার বার আয়োজন করে যাব। সরকার নিজের ভাবমূর্তির কথা ছেড়ে দিক। এসব ভাবমূর্তির কথা রাজ বাদশাহর আমলে চিন্তা করা হতো। কারণ তখন রাজা বাদশাহরা ছিলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। এখন আর সেই কনসেপ্ট নেই। এখন যেকেউ যেকোনো কিছু নিয়ে শাসক শ্রেণিকে প্রশ্ন করতে পারে।তাতে কারো ভাবমূর্তি চলে যায় না। বাংলাদেশের সরকারকে সেকেলে ভাবমূর্তি রক্ষার দর্শন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ১৭৫০ সালে যা উঠে গেছে তা নতুন করে আনার প্রয়োজন নেই। এখন কেউ সরকারের বিরুদ্ধে বললেই মামলা। বিভিন্ন জায়গা থেকে মামলা হয়। এটা ব্যক্তির বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। আমেরিকার সংবিধানে লেখা আছে বাক স্বাধীনতাকে খর্ব করে এমন কোনো আইন কংগ্রেস পাস করতে পারবে না। আমাদের দেশে বাক স্বাধীনতা দেয়া আছে শর্ত সাপেক্ষে। তাই আমেরিকার সঙ্গে আমাদের তুলনা চলে না।

ঢাকানিউজ২৪ডটকম