কালো তালিকাভুক্ত আট জঙ্গি সংগঠন নিষিদ্ধ হয়নি

নিউজ ডেস্ক:  পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখায় একটি তালিকা দিয়েছে। আল্লাহর দল, উলামা আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত, নব্য জেএমবি, দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশ, হেযবুত তাওহিদ, আত-তামকীন, তামীরউদ্দীন বাংলাদেশ ও তৌহিদী ট্রাস্ট নিষিদ্ধ করার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার একজন উপসচিব বলেন, নতুন করে আটটি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা হয়েছে। এ ব্যাপারে প্রস্তাবটি যাচাইবাছাই করা হচ্ছে। আটটি জঙ্গি সংগঠন ছাড়াও আরো প্রায় অর্ধশত সংগঠনের ব্যাপারে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছে পুলিশ-র্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে—ছদ্মনাম ব্যবহার করে জঙ্গি নেতারা সংগঠনকে শক্তিশালী করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠন কালো তালিকাভুক্ত রয়েছে। এসব সংগঠনকে আমরা মনিটরিং করছি। এর মধ্যে তামীরউদ্দীন বাংলাদেশ, নব্য জেএমবি ও আল্লাহর দলসহ বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় অ্যাক্টিভিস্ট গ্রেফতার হয়েছে। যখন যেখানে গোপনে বা প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা চালাচ্ছে—আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের গ্রেফতার করছে। তবে আল্লাহর দল নামে জঙ্গি সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া চলছে। এটি শিগিগর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। বাকি সংগঠনগুলোও মনিটরিং করে পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, জোট সরকারের আমলে জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে শাহাদত-ই-আল হিকমা, হরকাতুল জিহাদ (হুজি), জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) নিষিদ্ধ করা হয়।

নিষিদ্ধ করার পরও হুজি ও জেএমবির কার্যক্রম চলতে থাকে। এখনো হুজি ও জেএমবির কার্যক্রম রয়েছে। মহাজোট সরকারের আমলে ২০০৯ সালের ২২ অক্টোবর হিযবুত তাহরীরকে নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৩ সালের ১১ মে বরগুনায় আহলে হাদীস বাংলাদেশ ও আনসার আল ইসলামের আধ্যাত্মিক নেতা জসীমউদ্দিন রাহমানী গ্রেফতার হন। এরপর জসীমউদ্দিন রাহমানীর কাছ থেকে গোয়েন্দা পুলিশ জানতে পারে যে, তার সংগঠনের নাম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। ২০১৫ সালের ২৫ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ঐ বছরেই সারা দেশে বেশ কয়েকজন লেখক, শিক্ষক, ব্লগার ও বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করে জঙ্গি সংগঠন। আনসার আল ইসলাম নামে একটি জঙ্গি সংগঠন এসব হত্যার দায়ভার স্বীকার করে। ২০১৭ সালের ৫ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ পর্যন্ত সাতটি জঙ্গি সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর একদল সশস্ত্র ব্যক্তি মতিঝিলে বলাকা ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় পুলিশ উলামা আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের ৮ জন সশস্ত্র কর্মীকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা জানায়, তারা রাজারবাগ বড়ো পীর হুজুর সৈয়দ দিল্লুর রহমানের অনুসারী। উলামা আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত সংগঠনটি সেখান থেকে পরিচালিত হয়। হুজুর সৈয়দ দিল্লুর রহমানের নির্দেশে তারা বলাকার মূর্তি ভাঙচুর করেছে। এ ঘটনার কয়েক মাস পর উলামা আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাতের সশস্ত্র অনুসারীরা বিমানবন্দর গোলচত্বরে বাউলের ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলে। ২০১৭ সালে হাইকোর্ট চত্বরে লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। ভাস্কর্যটি স্থাপনের কয়েক দিনের মধ্যে উলামা আঞ্জুমানে আল বাইয়্যিনাত সেটি সরিয়ে ফেলতে উড়োচিঠিতে হুমকি দেয়। পরবর্তীতে ঐ বছরের ২৬ মে গভীর রাতে উচ্চ আদালত কর্তৃপক্ষ লেডি জাস্টিসের ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলে। এসব জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই সংগঠনটিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে।

আল্লাহর দল জঙ্গি সংগঠনটি ১৯৯৫ সালে জাতীয় সংসদের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আব্দুল মতিন মেহেদী ওরফে মুমিনুল ইসলাম ওরফে মহিত মাহবুব ওরফে মেহেদী হাসান ওরফে মতিনুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয়। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও সাদুল্যাহপুর থানা এলাকা থেকে এই সংগঠনের সদস্য সংগ্রহ করা হয়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে জেএমবির সিরিজ বোমা হামলার সঙ্গে আল্লাহর দলের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মেলে। ঐ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ধানমন্ডির গ্রিন রোডস্থ সরকারি কোয়ার্টার থেকে র্যাব মতিন মেহেদীকে গ্রেফতার করে। বর্তমানে মতিন মেহেদী ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়ে টাঙ্গাইল কারাগারে বন্দি রয়েছেন। মতিন মেহেদীর অনুপস্থিতিতে গ্রেফতার আব্রাহিম আহমেদ হিরো আল্লাহর দলের ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ১৯ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় র্যাব অভিযান চালিয়ে আব্রাহিম আহমেদ হিরো (৪৬), আবদুল আজিজ (৫০), শফিকুল ইসলাম সুরুজ (৩৮) ও রশিদুল ইসলামকে (২৮) গ্রেফতার করে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের হাতে নব্য জেএমবির শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়। এছাড়া ডিবি ও র্যাবের হাতে দাওলাতুল ইসলাম বাংলাদেশ, হেযবুত তওহিদ, আত-তামকীন, তামীরউদ্দীন বাংলাদেশ ও তৌহিদী ট্রাস্টের নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হয়। এসব সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব জঙ্গি সংগঠন কবেনাগাদ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে—এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার কোনো পদস্থ কর্মকর্তা বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে আরো অর্ধশত সংগঠনের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করছে গোয়েন্দারা। যেসব সংগঠনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে সেগুলো হলো—আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ, জামাত-আস-সাদাত, শাহাদত-ই-নবুয়ত, জামাত-আস-সাদাত জামিউতুল ফালাহ, ইসলামিক সলিডারিটি ফ্রন্ট, মুসলিম মিল্লাত, আল হারাত-আল-ইসলামিয়া, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট, তৌহিদী জনতা, আল খিদমত, হিজবুল মাহদি, হিজবুল্লাহ ইসলামী সমাজ, দাওয়াতি কাফেলা, বাংলাদেশ এন্টি টেররিস্ট পার্টি, আল মারকাজুল আল ইসলামী, আল ইসলাম মার্টেনস ব্রিগেড, সত্যবাদ, শরিয়া কাউন্সিল, জমিয়ত আহলে হাদিস আন্দোলন, তাজির বাংলাদেশ, হায়াতুর ইলাহা, ফোরকান মুভমেন্ট, জামিউতুল এহজিয়া এরতাজ, আনজুমানে তালামিজ ইসলামিয়া, কলেমার জামাত, সাহাবা পরিষদ, কাতেল বাহিনী, মুজাহিদিন-ই-তাজিম, এশার বাহিনী, আল ফাহাদ, হরকাতুল মুজাহিদিন, জাদিদ আল কায়দা ও জাদিদ আল সাবাব।