সাকিব উপাখ্যান, চক্রান্ত না নাটক

সুমন দত্ত : ক্রিকেট নিয়ে মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। বাংলাদেশে ফুটবলের চাইতে ক্রিকেট নিয়ে মানুষের উন্মাদনা বেশি। ক্রিকেট নিয়ে দেশের অর্জন অনেক বেশি। দেশের বর্তমান ক্রিকেটাররাই এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। আর যাদের নৈপুণ্যের ওপর ভিত্তি করে এই অর্জন তারা আজ তথাকথিত জুয়ারিদের খপ্পরে।

হঠাৎ করেই বাংলাদেশে তারকা ক্রিকেটাররা নানা দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন ও ধর্মঘটের ডাক দিলেন। দেশে এতো নামী দামী ক্রীড়া সাংবাদিক আছে, তারা কেউ আচই করতে পারলো না এমন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। ক্রিকেটারদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। বোর্ডের অর্থ উপার্জন নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ নিয়ে কারো মাথা ব্যথা ছিল না। হঠাৎ করেই এসব ইস্যু দাড়িয়ে গেল। আবার হঠাৎ করেই আইসিসির সাজা ঘোষণা। যার কোপে তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল-হাসানের এক বছর সব ধরনের ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ। দুটো ঘটনাই হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া। আগে ভাগে কেউ জানতে পারেনি। এখানেই নানা রহস্য লুকিয়ে আছে।

সাধারণ ক্রিকেট ফ্যানরা মনে করে সাকিব ক্রিকেটারদের নিয়ে আন্দোলন করার কারণে বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপন তাকে এই সাজা আইসিসির মাধ্যমে দিয়েছে।

আমার কাছে এমনটা মনে হচ্ছে না। আসলে পুরো ঘটনাটাই আম পাবলিকের চোখে ধূলা দেয়ার মতো। আইসিসি চলে তাদের নিজস্ব নিয়মে। সেখানে সাকিবের বিষয়টি ঝুলে ছিল। এখন ঝুলে থাকা জিনিস গাছ থেকে পারল কে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।

ছোট বেলা আমরা ইংরেজি শিখতে একটা ট্রান্সলেশন পড়তাম। ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল। অথবা ডাক্তার আসিবার পর রোগী মারা গেল। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে এখন এমন ট্রান্সলেশন করা যায়।

সাকিব আন্দোলন করাতেই আসিসির সাজা ঘোষণা হইল। অথবা আইসিসির সাজা ঘোষণার পূর্বেই সাকিব আন্দোলন শুরু করল। এখানে কোনটা সত্যি? যদি শেষেরটা সত্যি হয় তবে পুরো ঘটনাটাই সাকিবকে কেন্দ্র করে বিসিবি একটা নাটক করেছে।

আর যদি আগেরটা সত্যি হয় মানে সাকিব আন্দোলন করাতেই আসিসির সাজা ঘোষণা হইলো। তবে এটা নিশ্চিত ভাবে চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু না।

লোকজন সাকিবের ওপর আইসিসির সাজাকে চক্রান্ত হিসেবেই দেখছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে ভাবে আমি একে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একটা সফল নাটক হিসেবেই দেখতে চাই। কারণ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জোর গলায় বলছে তারা সাকিবের পাশে আছে। জুয়ারিদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে তাকে ঘৃণা করাই উচিত ছিল সবার। সেটা না করে তার পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা করছে বোর্ড। তার মানেটা কি?

এর আগে জুয়ারিদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে ক্রিকেটার আশরাফুলকে বিদায় নিতে হয়েছিল। আশরাফুল তখন ফর্মে ছিল। তার প্রতি বোর্ড দয়ামায়া দেখালো না। এদিকে সাকিবের প্রতি বোর্ডের দয়ামায়া উপচে পড়ছে।

জাতীয় দলের প্রতিটি ক্রিকেটার দিয়ে সাকিবের প্রতি সহানুভূতিশীল বয়ান নেয়া হচ্ছে। এসব দেখেই পুরো ঘটনাটা নাটক মনে হচ্ছে। সাকিবের এক বছরের বহিষ্কারের ঘটনাটা ভিন্নখাতে নেয়ার জন্যই সাকিবকে দিয়ে আন্দোলনের নাটক করানো হয়েছে। যাতে আম পাবলিক বিশ্বাস করে আন্দোলন করার জন্যই সাকিবকে এই সাজা দেয়া হয়েছে।

সাকিবের ওপর আসিসির সাজাটা যদি আন্দোলনের আগে আসত তখন ক্রিকেট বোর্ড বেশি সমালোচিত হতো। পাপনের ওপর খড়গ পড়তো। কীভাবে বোর্ডকে না জানিয়ে ক্রিকেটাররা জুয়ারিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করলো? এই জবাবদিহিতাটা পাপনকে দিতে হতো। এখন এটা আর করতে হবে না। কারণ সাকিব পাপনের কথা মতো নিজের দোষ স্বীকার করে নিয়েছে। পাশাপাশি দলে ফেরার গ্যারান্টিও নিয়ে নিয়েছে।

আর আসিসির আইনটা শুনে হাসি পায়। জুয়ারিদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলে তা বলতে হবে। আর তা না হলে সাজা পেতে হবে। ক্রিকেটারদের ওপর এই আইন আইসিসি কি চিন্তা করে তৈরি করল তার পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা নাই। বলা হচ্ছে, ক্রিকেটকে জুয়ামুক্ত, ম্যাচ ফিক্সিং রুখতে এই আইন। এভাবে কি জুয়া কিংবা ম্যাচ ফিক্সিং রোখা যায়?

বিষয়টা বোঝাতে পাপন-সাকিবের জুয়া নিয়ে একটা মিথ্যা গল্প বলি। ধরুন পাপন এক জুয়ারির কাছ থেকে ১০ হাজার ডলার নিলো। সে সাকিবকে বললো, সাকিব আজ তুমি শূন্যে রান করে আউট হয়ে যাও।তার বিনিময়ে তুমি ৫ হাজার ডলার পাবা। এদিকে পাপন তার বন্ধু লোকমান হোসেন ভুঁইয়াকে এই বলে অন্য জুয়ারিদের খবর দিল আজকের ম্যাচে সাকিব ১০ এর বেশি রান করতে পারবে না। করলে ২০ হাজার ডলার না করলে ১০ হাজার ডলার। লোকমান জানে কি ঘটবে? সে ১০ হাজার ডলারের বাজিটাই খেলবে। এভাবে একটি সুন্দর বাজি খেলা সম্ভব আইসিসির আইনকে পাশ কাটিয়েই। কারণ আইসিসির আইনটা শুধু ক্রিকেটারদের জন্য ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য নয়।

ক্রিকেট থেকে সত্যিকার অর্থে জুয়া রোধ করতে হলে আইনটি সবার জন্য হতে হবে। তা না হলে বিভিন্ন দেশের বোর্ডগুলোই নানা ধরনের সিরিজ চালু করে জুয়া খেলে যাবে। আর তাদের ব্যবসায় ক্রিকেটাররা ভাগ বসালে তারা নানা সাজার মুখে পড়বে। আইপিএলে (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগে) জুয়া ওপেন সিক্রেট তা আজ প্রমাণিত। কয়েকটা দল নিষিদ্ধও ছিল। তারপরও আইপিএল জুয়ামুক্ত হতে পারেনি। ভারতের লোকসভায় আইপিএল জুয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। বাংলাদেশের বোর্ড প্রধান নাজমুল হাসান পাপন নিজেই এক জুয়ারির সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে মিডিয়ায় প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন। এমন এক পরিস্থিতিতে পাপন ভালো না সাকিব ভালো এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠানোই অবান্তর।

বিভিন্ন দেশের যেসব ক্রিকেট বোর্ড আছে সবগুলোই দুর্নীতিগ্রস্থ। এসব বোর্ডের মধ্যে কোনো জবাবদিহিতা নেই। নেই কোনো স্বচ্ছতা। ক্রিকেটাররা যে হোটেলে উঠে জুয়ারিরা তার পাশেই রুম ভাড়া করে। আর এ কারণেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে হেরে যায় পাকিস্তান। আর পাকিস্তানের সাউথ আফ্রিকান কোচ ববউলমারের হোটেল রুমে মৃত্যু ঘটে।

কিং কমিশনের কাছে জুয়ারি মুকেশগুপ্তের কথা বলে হানসি ক্রনিয়ে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। বহু ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে গেছে জুয়ারিদের খপ্পরে পড়ে। কিন্তু জুয়ারিরা আছে বহাল তবিয়তে। কারণ আইসিসির আইনটাই হচ্ছে জুয়ারিদের জন্য। ক্রিকেট কিংবা ক্রিকেটারদের জন্য নয়।

লেখক: সাংবাদিক