রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যাচ্ছে নভেম্বরে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব :  নোয়াখালীর ভাসানচরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া আগামী নভেম্বরে শুরু হচ্ছে। ইতোমধ্যে ভাসানচরে আবাসন অবকাঠামোসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পথে। চলতি মাস থেকেই সেখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু যোগাযোগসহ নানা প্রতিকূলতার কারণে নভেম্বরে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কয়েকটি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করেছে সরকার। স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছে নতুন আসা রোহিঙ্গারা, নতুন জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা শিশু পরিবার এবং মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে অনাগ্রহীরা। এ জন্য নতুন রোহিঙ্গা যারা আসছে, তাদের আলাদাভাবে নিবন্ধন করা হচ্ছে। নতুন জন্ম নেওয়া শিশু এবং তাদের পরিবারও চিহ্নিত করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক কমডোর আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী জানান, ভাসানচরে পুনর্বাসনের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে গুচ্ছগ্রামে এক হাজার ৪৪০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের কাজও প্রায় শেষের পথে। ১২ কিলোমিটার সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণসহ অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের জন্য ৪০ কিলোমিটার রাস্তার কাজ ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সম্পন্ন হয়েছে চারটি ওয়্যারহাউস, একটি মেগাওয়াট সোলার হাইব্রিড প্লান্ট, এক মেগাওয়াট ও দুটি ৫০০ কিলোওয়াট ডিজেল জেনারেটর স্থাপনের কাজ। এ ছাড়া চারটি এলসিইউ নির্মাণের কাজও ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। নৌযান চলাচলে স্থাপন করা হয়েছে পাঁচটি পন্টুন। ভাসানচরে এক হাজার ৭০০ একর জায়গা জুড়ে পুনর্বাসনে বিশাল কর্মযজ্ঞ ও আবাসন সুবিধা গড়ে তোলা হয়েছে। এ চরে মোট জমির পরিমাণ ১৭ হাজার একর। এখানে আরও দুই লাখ রোহিঙ্গাকে পুনর্বাসনের সুযোগ রয়েছে।

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে ভবনগুলো করা হচ্ছে সাইক্লোন শেল্টারের আদলে। প্রতিটি রুমের আয়তন ১২ বাই ১২ ফুট। পুরুষ ও নারীদের জন্য থাকছে আলাদা স্যানিটেশন ব্যবস্থা। কয়েকটি পরিবার মিলে এগুলো ব্যবহার করবে। রান্নাঘরের আয়োজনে থাকবে কমন পদ্ধতি। তবে একটি রুমে একটিই পরিবার থাকবে। পরিবারের সদস্যসংখ্যাও থাকবে নির্ধারিত। এই এলাকায় নিরাপত্তাসহ সার্বিক তদারকির জন্য ২০টি অফিস থাকবে। অতিরিক্ত সচিব থেকে সহকারী পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই পুনর্বাসন এলাকার তদারকির কাজে নিয়োজিত থাকবেন।

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় ভাসানচরে একটি থানা স্থাপন করা হবে। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট, চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক এবং দুটি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল স্থাপন করা হবে। জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। ভাসানচরে পুকুর ও জলাশয় এবং পর্যাপ্ত চাষাবাদযোগ্য খালি জায়গা রয়েছে। এসব জায়গা মৎস্য চাষ, গবাদি পশুপালন ও শাকসবজি চাষাবাদে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। এতিম রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নেওয়া হবে। মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতায় ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু করা হবে। প্রয়োজনে ল্যান্ডফোনের সুবিধা সম্প্রসারণসহ নেটওয়ার্ক সুবিধা বৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাও স্থাপন করা হবে।

নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত সব মিলিয়ে দেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। এর মধ্যে নিবন্ধিত এগারো লাখ।

এক লাখ রোহিঙ্গা পুনর্বাসনে প্রস্তুত ভাসানচর :কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে এক লাখ জনের পুনর্বাসনে নোয়াখালীর ভাসানচর প্রস্তুত রয়েছে বলে সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ তথ্য জানানো হয়।

দুই বছর আগে নোয়াখালীর হাতিয়ার চরঈশ্বর ইউনিয়নের ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের আবাসনে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুবিদ আলী ভুইয়ার সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য মোতাহার হোসেন, নাসির উদ্দিন, মহিবুর রহমান এবং নাহিদ ইজাহার খান।

বৈঠকের পরে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভাসানচরে আবাসন এবং দ্বীপের নিরাপত্তায় নেওয়া প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে এবং এক লাখ বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকের পুনর্বাসনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য সরকারের তহবিল থেকে দুই হাজার ৩১২ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে দুই হাজার ২৬৫ কোটি ৯০ লাখ ৪৪ টাকা ব্যয় হয়েছে। বাকি ৪৬ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা ‘জরুরি তহবিল’ হিসেবে রাখা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে নৌবাহিনী এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

বৈঠকে প্রতিরক্ষা সচিব আখতার হোসেন ভূঁইয়া, সেনাসদর দপ্তরের লে. জেনারেল সফিকুর রহমান, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংসদ সচিবালয়ের সংশ্নিষ্টরা অংশ নেন।