ডা. দিবালোক সিংহকে যেভাবে দেখি

আসলাম খান:   আঁধার পেরিয়ে আলো, আলো অর্থ দিন। আমরা বলে থাকি দিবালোকের মত স্পষ্ট। নামের সাথে জীবনের যে স্বার্থকতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় তার নাম দিবালোক সিংহ।

আমি যাকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছি প্রায় দুই যুগেরও কাছাকাছি সময় ধরে। রাজনীতিতে কর্মজীবনে বিশেষ করে প্রতি বছর কমরেড মণি সিংহ মেলায় একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তাকে দেখার সুযোগ হয়েছে। কর্মপরিধি ব্যাপক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, রাজনীতিতে যেমন নীতিনিষ্ঠ ঠিক তেমনি দরিদ্র মানুষের ভাগ্যান্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ঝড় বৃষ্টি, ব্যস্ততা, নানা প্রতিক‚লতার মধ্যেও প্রতি সপ্তাহে দূর্গাপুরে যান, অসংখ্য রোগী চিকিৎসা দেন, কখনও কখনও রোগীদেরকে ঢাকার ডিএসকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আর্ত-মানবতার সেবায় এগিয়ে আসার নির্দেশ পেয়েছেন তার ‘মা’ অনিমা সিংহ-র মাধ্যমে।

‘মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থাকবে’ মায়ের এ পরামর্শ তিনি এখনও মেনে চলেন। অক্লান্ত কর্মশক্তির এ মানুষের ব্যক্তি গুণাবলি উল্লেখ না করলেই নয়। হঠকারিতা নয়, দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সাথে যে কোন সমস্যার মোকাবেলা করেন। কথা ও কাজের মিল রাখেন।

দূর্গাপুরে কমরেড মণি সিংহ মেলায় প্রতি বছর সাত দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সম্ভাব্য ২০০৫ সালে ঢাকা থেকে অতিথিবৃন্দ ও শিল্পী নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে অত্র এলাকার প্রভাবশালী অনেকেই একই মঞ্চে যাত্রা অনুষ্ঠান করার উদ্যোগ নেন। এ উদ্যোগে অনেকেই নিমরাজি হলেও অনুষ্ঠান শেষে তিনি বল্লেন, “কমরেড মণি সিংহ মেলার অনুষ্ঠানে এমন কোনো অনুষ্ঠান করা যাবে না যা সংগতিপূর্ণ নয়। আমাদের স্টেজ ভাঙার নির্দেশ দিলেন, স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে আমরা মঞ্চ ভেঙে গুছিয়ে রাখলাম। যেকোনো সংকটে যখন সবাই সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধান্বিত থাকেন তখন তিনি দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার যে ক্ষমতা তা হচ্ছে প্রজ্ঞা। আমি দেখেছি, কর্মজীবনে অনেক ক্ষেত্রে অন্যরা যখন দ্বিধান্বিত, চিন্তিত, সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন তখন তিনি সমস্যার সমাধান দেন। কাজ করার ক্ষেত্রে চিন্তা করার সূত্র ধরিয়ে দেন। যা বলতে চান তা সততার সাথে বলেন।

সমাজ, প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি আজ দুর্নীতিগ্রস্থ। লোভ স্বার্থপরতা অর্থের কাছে মানুষ পরাজিত হচ্ছে এ সময় দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে)’র মতো একটি সংগঠন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার সাথে জিরো টলারেন্সে পরিচালনা করছেন তা একটি কঠিনতম কাজ। গরিব জনগোষ্ঠীর প্রতি দরদবোধ, ক্ষমতায়ন, সংগঠন গড়ে তোলা এবং নেতৃত্ব সৃষ্টি করছেন। তার দুয়ার সব সময় তাদের জন্যে খোলা। তাদের কথা গভীর মনোযোগ সহকারে শোনেন, বুঝতে চেষ্টা করেন এবং ইতিবাচকভাবে সমাধান করেন। ভালো কাজ যে সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করা যায় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ডা. দিবালোক সিংহ। আদিবাসীদের সংগঠন গড়ে তোলা, হাজং ছাত্রাবাস নির্মাণে সহযোগীতা, আদিবাসীদের কর্মের ব্যবস্থা করা, তাদের বিপদ-আপদে সব সময় পাশে থাকেন। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী টংক আন্দোলনের অনেক শহীদ পরিবার ও দুঃস্থ অসহায় পরিবারকে প্রচার ছাড়াই সবার অজান্তে সহযোগিতা করেন।

রাজনীতি এবং কর্মজীবন দুটি ক্ষেত্রেই নীতিনিষ্ঠ এবং অসম্ভব পরিশ্রমী, চিন্তা-চেতনায় মননে কাজে সমান তালে চলেন। রাজনীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল প্রবীণ বিপ্লবী, বিপ্লবীদের পরিবার এবং পার্টি কর্মীদের প্রতি সহানুভ‚তি তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত একই ব্যক্তির মধ্যে একাডেমিক ও সাংগঠনিক দক্ষতা খুব কমই দেখা যায়, এ ক্ষেত্রে সে ব্যতিক্রম। কর্মজীবনে দেখেছি ডিএসকে স্টাফ শুধু নয় যেকোনো মানুষের কাছে একজন নিশ্চিত নির্ভরতা। নিঃস্বার্থভাবে দরিদ্র বঞ্চিত মানুষের সেবায় নিয়োজিত অন্তঃপ্রাণ। তার একটি দরদি মন আছে যা বাইরে থেকে বুঝা যায় না। গরিবের দিন ফেরানোর তাগিদ আছে। সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মন আছে। যা বলতে চান বলতে পারেন। যা বুঝাতে চান বুঝাতে পারেন।

আমার মনে হয় ব্যক্তিগত গুণাবলির ক্ষেত্রে ‘জীন’ ফ্যাক্টর কাজ করে। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামী, টংক আন্দোলনের মহানায়ক কমরেড মণি সিংহ ছিলেন অত্যন্ত সৎ, সাহসী, দৃঢ়তা, নীতিনিষ্ঠ, মানুষের মুক্তির দিশারী। কমরেড অনিমা সিংহ কৃষকনেত্রী বিপ্লবী, আদর্শনিষ্ঠ একজন মানুষ। ডা. দিবালোক সিংহ পরিশীলিত, মানবিক গুণসম্পন্ন একজন মানুষ। তীক্ষ্ণধা সম্পন্ন, বহুমুখী প্রতিভাবান, চিকিৎসা জগতে মানবহিতৈষী, বিপদের বন্ধু, উন্নয়ন দুরদর্শী, অফুরন্ত প্রাণ শক্তি, উদ্যোগী, অন্যের প্রতি দায়িত্বশীল, ধৈর্য ও সহনশীলতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন মানুষ যাকে নিয়ে যথার্থই গৌরব কথা যায়। তিনি যে এত কঠোর পরিশ্রম করতে পারেন, কাছাকাছি না থাকলে বুঝা যাবে না। কোন বিষয়ে কখন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে তা তিনি ভালভাবে বোঝেন।

কমরেড ‘মণি সিংহ স্মৃতি জাদুঘর’ নির্মাণের কাজ চলছে এ ক্ষেত্রে তিনি ধারাবাহিকভাবে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। প্রতি বছর কমরেড মণি সিংহ মেলা উদযাপনে তার অগ্রণী ভ‚মিকা উল্লেখ করার মতো। প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ কমরেড মণি সিংহ মেলায় আসেন, তারা কোথায় থাকবেন, কি খাবেন, কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা এ বিষয়ে তটস্থ থাকেন যাতে করে সামর্থ্য অনুযায়ী সেবা করা যায়। মানুষকে ভীষণ সম্মান করেন। যে কোনো অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে বিদায় জানিয়ে খোঁজ খবর নিয়ে সব শেষে অনুষ্ঠান স্থল ত্যাগ করেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দূর্গাপুর থেকে যে কমরেডই প্রার্থী হন তার জন্য নিজে প্রার্থী হলে যেমন কাজ করতেন তার চেয়ে বেশি সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যান, যা অনন্য দৃষ্টান্ত।

কমরেড মণি সিংহকে নিয়ে আলোকাচিত্রী প্রদর্শনী, সংকলন বের করা বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিষয়ে সার্বিক পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তার কাছে আদর্শের প্রেরণা তার ‘বাবা’ ‘মা’ ও তাদের জীবন দর্শন। আমরা দেখি তার রুমে শোভা পায় ‘কমরেড মণি সিংহ’ ও কমরেড অনিমা সিংহ’র ছবি। পার্টি কমরেডের প্রতি দরদ এবং দায়িত্বশীলতা দেখতে পাই সত্যবান হাজং-এর হত্যার সময়। মৃত্যু সংবাদে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। এ মৃত্যু তাকে গভীর শোকাভিভ‚ত করে তোলে। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের জন্যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বর্তমানে দূর্গাপুরে যে রুমে চিকিৎসা সেবা দেন, সেখানে তিনি বসেন তার পাশে সত্যবান হাজং-এর একটি বড় ছবি টাঙিয়ে রেখেছেন। প্রতিনিয়ত অনুভব করেন সত্যবান হাজংকে।

একজন মানুষের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব যদি মানুষের প্রতি দরদবোধ ভালবাসা থাকে। মহৎ ব্যক্তিরা ভালবাসা থেকেই শক্তি পান। বিপ্লবীরা জীবনকে বাজি রেখে লড়াই করেন। সমাজ রাজনীতি এগিয়ে যায় কিছু মহৎপ্রাণ মানুষের জন্য। সমাজে শুভ, অশুভ দুটো শক্তিই আছে, নিরন্তর লড়াইও চলে। শুভবোধ সম্পন্ন মানুষ না থাকলে অশুভদের দখলে চলে যেত গোটা সমাজ। আলো শুধু বাতি জ্বালায় না আলোকিত করে তার চারপাশ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে। আলোকিত মানুষরা নিজেরা পুড়ে অন্যকে আলো দেয়। আলোর শিখায় থাকতে হয় কর্তব্য নিষ্ঠা, নিজের প্রতি বিশ্বস্ত, সমাজের প্রতি বিশ্বস্ত, মানুষের প্রতি বিশ্বস্ততা, এ ধরনের মানুষরা এমন একটি পর্যায় অতিক্রম করে, অনেক বড় কিছু সৃষ্টি করে যা নিজেকেই ছাড়িয়ে যায়।

আমার দীর্ঘ জীবনের ছাত্র রাজনীতি, শ্রমিক আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, অন্যান্য সামাজিক আন্দোলন করতে গিয়ে এবং সারাদেশের অনেক মানুষের সাথে মেলামেশায় মানুষের জন্য নিবেদিত আলোকিত কম সংখ্যক ভালো মানুষের সন্ধান পেয়েছি। যাদের সান্নিধ্য আমাকে ভাল রাখে, প্রেরণা পাই, মানুষের জন্যে কিছু করার ব্যাকুলতা সৃষ্টি করে তাদের মধ্যে একজন যাকে আমি মনের মধ্যে ধারণ করি তিনি হচ্ছেন কমরেড ডা. দিবালোক সিংহ।
তাকে জানাই জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা।

লেখক : আসলাম খান, সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটি, উপ-পরিচালক ডিএসকে।