সর্বজনীন উৎসবের রং ছড়াচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব

নিউজ ডেস্ক:   ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুক্রবার সূচনা ঘটেছে শারদীয় দুর্গোৎসবের। এদিন দুর্গতিনাশিনী দেবীর অধিষ্ঠান, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্বজনীন উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। প্রথম দিন শুক্রবার বিকেলে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বনানী পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। সন্ধ্যা ৭টায় বনানীর পূজার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

পাঁচ দিনব্যাপী দুর্গোৎসবের প্রথম দিনে শুক্রবার ষষ্ঠী তিথিতে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর অধিষ্ঠান হয়। সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে ছিল ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা। এ সময় বেলতলা কিংবা বেলগাছের নিচে দেওয়া হয় ষষ্ঠীপূজা। সন্ধ্যায় দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস ছাড়াও সব মণ্ডপে পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগ আরতির আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যায় বিশেষ আলোকসজ্জাসহ অনেক মণ্ডপে বিশেষ প্রার্থনা ও সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

উৎসবের দ্বিতীয় দিনে শনিবার মহাসপ্তমী। সকালে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার চক্ষুদানের পর সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবীর নবপত্রিকা প্রবেশ, স্থাপন, সপ্তম্যাদি কল্পারম্ভ ও সপ্তমীবিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এভাবে উৎসব চলবে আগামী মঙ্গলবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় এ ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে দেশজুড়ে এখন আনন্দ ও উৎসাহ-উদ্দীপনার আবহ। শুক্রবার ঢাকা মহানগরীর ২৩৭টিসহ সারাদেশের ৩১ হাজার ৩৯৮টি পূজামণ্ডপে উৎসবমুখর পরিবেশে শুরু হয় দুর্গাপূজা। হিন্দুদের পাশাপাশি অন্য ধর্মের মানুষও যোগ দেওয়ায় এ উৎসব সর্বজনীন রূপ নিয়েছে। সারাদেশের মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য, শঙ্খ আর উলুধ্বনির শব্দ দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমনের জানান দিচ্ছে। পূজার মন্ত্রোচ্চারণ, আরতি আর মাইকের আওয়াজে এখন মাতোয়ারা সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলো।

পূজা ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে সারাদেশে। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ, আনসার-ভিডিপির পাশাপাশি কোথাও কোথাও নিযুক্ত আছে র‌্যাব-বিজিবি সদস্য। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদের সতর্ক পাহারাও আছে। অনেক মণ্ডপে আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টরে কড়া তল্লাশির মধ্য দিয়ে মণ্ডপে প্রবেশ করতে হচ্ছে দর্শনার্থীদের। এতসব কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছেদ পড়েনি পূজার আনন্দমুখরতায়।

শুক্রবার পূজা শুরু হলেও রাজধানী ঢাকার মণ্ডপগুলোতে ভক্ত-দর্শনার্থীর ভিড় তেমন একটা দেখা যায়নি। আয়োজকরা জানান, শনিবার মহাসপ্তমীতে দর্শনার্থীর ভিড় কিছুটা বাড়তে পারে। রোববার মহাষ্টমী থেকেই মূলত মন্দিরে ও মণ্ডপে ভক্ত ও দর্শনার্থীর ঢল নামবে।

কেন্দ্রীয় পূজা উৎসব বলে পরিচিত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনের মণ্ডপের সামনে বিশাল প্যান্ডেল ছাড়াও মন্দিরকে সাজানো হয়েছে নতুন রং, সাজ ও আলোকসজ্জায়। এখানে পুলিশের বিশেষ কন্ট্রোল রুমের পাশাপাশি পূজা উদযাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করেছে। বসানো হয়েছে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। সকাল ও সন্ধ্যায় ষষ্ঠীপূজার নানা আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি সন্ধ্যায় ভক্তিমূলক সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এখানে। পূজা শেষে অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও ভোগ আরতি ছিল উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ। পূজার পাশাপাশি মেলাঙ্গন চত্বরে আয়োজিত হচ্ছে মেলা।

একই অবস্থা গোপীবাগের রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ পূজামণ্ডপেও। আকর্ষণীয় প্রতিমার পাশাপাশি মণ্ডপসহ সংলগ্ন এলাকাকে বর্ণাঢ্য সাজ ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ হল পূজামণ্ডপেও দুর্গাপূজা শুরু হয় সাড়ম্বড়ে। রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমের মণ্ডপে সন্ধ্যায় গত বছরের প্রতিমা মন্দিরের পুকুরে বিসর্জন দেওয়া হয়। মণ্ডপসহ পুরো প্রাঙ্গণ সাজানো হয়েছে বাহারি সাজে। হিন্দু অধ্যুষিত পুরান ঢাকার অলিগলিতেও উৎসবের আমেজ দেখা গেছে।

গুলশান-বনানী সর্বজনীন পূজা উদযাপন পরিষদের আয়োজনে বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ-সংলগ্ন বনানী পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে গুলশান-বনানী পূজা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ১২ বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য, ড. বীরেন শিকদার এমপি, একেএম রহমতউল্লাহ এমপি, জয়া সেনগুপ্ত এমপি, আকবর হোসেন পাঠান ফারুক এমপি, ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার বিশ্বদীপ দে প্রমুখ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

রাজারবাগের বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান কমিটির পূজামণ্ডপে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। এ ছাড়া মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির, শাঁখারীবাজারের প্রতিদ্বন্দ্বী পূজামণ্ডপ, পান্নিটোলা, জয়কালী রোডের রামসীতা মন্দির, অভয় দাস লেনের ভোলানন্দগিরি আশ্রম, রাধিকা বসাক লেন, নবেন্দ্র বসাক লেন, ঢাকেশ্বরীবাড়ী, টিকাটুলীর প্রণব মঠ, ঠাঁটারীবাজার পঞ্চানন শিবমন্দির, সূত্রাপুরের ঋষিপাড়া গৌতম মন্দির, বনগ্রাম তরুণ সংসদ, উত্তর মৈশুণ্ডী, ফরাশগঞ্জ জমিদারবাড়ি এবং বিহারীলাল জিও মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপে উৎসবের আমেজে দুর্গোৎসব শুরু হয়েছে।