প্রবীণরা বোঝা নয়, তাঁরাই আমাদের পথপদর্শক

সেলিনা আক্তার:  ‘প্রবীণ’, উচ্চারণ করা মাত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একজন শুভ্রকেশধারী মানুষ যিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। আনন্দ-বেদনা আর পাওয়া না পাওয়ার মানব জীবনের শেষ অধ্যায় হলো পৌঢ় বা প্রবীণ বয়স। শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও প্রবীণদের সঞ্চিত পরিপক্ক অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মকে পথ দেখায়। কিন্তু আমরা তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা কতখানি দিয়ে থাকি জানি না, তবে অযত্ন, অবহেলা ও উপেক্ষা সম্ভবত নিত্য সঙ্গী তাঁদের। তাঁদের অস্তিত্ব বা উপস্থিতি প্রায়শঃ উপেক্ষিত নয়নে দৃষ্টির অগোচোরে থেকে যায়।

ফরাজ আলী বয়সের ভারে ন্যুব্জ। আজ তার শরীরে শক্তি নেই, দৃষ্টিশক্তিও কম। জীবন সায়াহ্নে অনেক কিছুর জন্যই এখন সে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। পেশাগত জীবনে ছিলেন একজন চাকুরিজীবী। তিন ছেলে ও দুই কন্যাসন্তানের পিতা তিনি। ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু এতো কিছুর পরও কোথায় যেন তার অশান্তি। যখন যৌবন ছিল, ছেলেমেয়েরা ছোটো ছিল তখন ফরাজ আলী ও তাঁর স্ত্রী তাঁদের জীবনের সুন্দর সময়ের সেরা প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তাদের মানুষ করতে। আজ তারা ভালো আছে। সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু আজ এই বয়সে এসে জীবনের হিসেবের খাতা খুলতে বসে কোথায় যেন গরমিল আছে বলে মনে হয় তাঁর। যে মানুষটা একসময় প্রচণ্ড মনোবল নিয়ে সংসারের হাল ধরে ছিলেন, আজ সে সংসারেই তাঁর অনাদর।

নিজেদের সংসার ও সন্তান নিয়ে তারা এত ব্যস্ত থাকে যে বৃদ্ধ পিতার দিকে নজর দেওয়ার তাদের যেন সময় নেই। বর্তমান পৃথিবী এমন একটা সময় অতিবাহিত করছে যখন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা এবং নির্ভরশীল বয়স্ক মানুষের সংখ্যা সমানুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নয়নের ফলে জন্ম ও মৃত্যুহার কমে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাওয়া এর অন্যতম প্রধান কারণ। কোন বয়স থেকে একজন ব্যক্তিকে প্রবীণ বলা হবে আন্তর্জাতিকভাবে তা নির্ধারিত নেই। তবে বিশ্বব্যাপী সাধারণভাবে ৬০ বা তদুর্ধ্ব বয়সি ব্যক্তিকেই প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৩ সালে প্রণীত জাতীয় প্রবীণ নীতিমালাতেও ৬০ বা তদুর্ধ্ব বয়সি ব্যক্তিকেই প্রবীণ বলা হয়েছে।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০৩০ সাল অর্থাৎ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯০ কোটি থেকে ১৪০ কোটিরও বেশি হবে। এর অর্থ হচ্ছে ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি যুবকের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ বেশি পড়বে। ফলে বিশেষত স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়ে সার্বিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রবীণ লোকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য মতে ২০১১ সালে বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১২ লক্ষ, যা ২০৬১ সাল নাগাদ প্রায় ৫ গুণ বেড়ে আনুমানিক ৫ কোটি ৬০ লক্ষে উন্নীত হবে। ২০৫০ সালে এ দেশের শিশু প্রবীণের অনুপাত হবে ১৯:২০। সীমিত সম্পদ আর বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা ভবিষ্যতে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে অবির্ভূত হবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ধারায় প্রবীণরা প্রথমত নিজ পরিবারেই তাঁদের ক্ষমতা ও সম্মান হারাচ্ছেন এবং ধীরে ধীরে সমাজের সব কর্মকাণ্ড হতে বাদ পড়ছেন। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের প্রবীণদের বার্ধক্যজনিত সমস্যা আর চরম আর্থিক দীনতার কারণে তাঁরা পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই সকল ধরনের সেবা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে প্রবীণ এই জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন যা আগামীতে একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

প্রবীণদের উন্নয়নের বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রবীণদের সমস্যা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য জাতিসংঘ ১৯৯১ সাল থেকে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে “The Journey to Age Equality” বাংলাদেশেও দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে।

প্রবীণদের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াসে জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘৯০ এর দশকেই সরকার প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকায় প্রবীণদের জন্য একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও প্রবীণ নিবাস এবং তৎকালীন পাঁচটি বিভাগীয় শহরে প্রবীণদের জন্য বিশেষ ক্লিনিক স্থাপন করে। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে প্রণীত বয়স্ক ভাতা কার্যক্রম প্রবীণদের জন্য সরকারের সবচেয়ে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। সারাদেশের চার লাখ প্রবীণের জন্য প্রতিমাসে ১০০ টাকা হিসেবে ভাতা প্রদানের কর্মসূচির আওতা ও অর্থের পরিমাণ ধারবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমান ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৪ লাখ বয়স্ক ব্যক্তির জন্য জনপ্রতি মাসিক ৫০০ টাকা হারে ২৬৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার যথেষ্ট প্রবীণবান্ধব। ১৯২৫ সালে বৃটিশ প্রবর্তিত পেনশন ব্যবস্থার ৭২ বছর পরে প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী উদ্যোগে ১৯৯৭ সালে চালু করা হয়েছে বিশ্বনন্দিত বয়স্কভাতা কর্মসূচি, অবসর গ্রহণের বয়স ৫৯/৬০ বছর করা হয়েছে, অনুমোদিত হয়েছে বহু প্রতীক্ষিত প্রবীণ বিষয়ক ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩’। এই নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশের ষাটোর্ধ্ব প্রত্যেক নাগরিক প্রবীণ হিসেবে গণ্য হবেন এবং তাদেরকে রাষ্ট্রের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে তারা বিশেষ পরিচয়পত্র পাবেন এবং সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রসমূহে বিভিন্ন সেবার অধিকারী হবেন। পর্যায়ক্রমে সরকার তাদের জন্য অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও নিশ্চিত করবে।

‘মাতাপিতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩’ সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই আইনের আওতায় সন্তান বা সন্তানগণ মাতাপিতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করবেন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন এবং তাদের সাথে একত্রে বসবাস করবেন। চাকুরির কারণে দূরে থাকতে বাধ্য হলে মাতাপিতার নিয়মিত খোঁজখবর রাখবেন। মাতাপিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনোই তাদেরকে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে না। এই আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তি অনুর্ধ্ব এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাস কারাদণ্ড ভোগ করবেন। এছাড়াও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘প্রবীণ উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘের’ দেশব্যাপী প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বার্ষিক বরাদ্দ বৃদ্ধি প্রবীণবান্ধব সরকারের দূরদর্শী চিন্তার ফলশ্রুতি।

জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনযাপন স্বাচ্ছন্দ্যময় করার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এবং তাঁদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করাসহ নানাবিধ জটিল সমস্যা সমাধানে সম্মিলিতভাবে কাজ করার জন্য গত ১৪ জুলাই ২০১৮ ঢাকায় ‘বাংলাদেশ সিনিয়র সিটিজেন ফোরাম’ নামক একটি ফেসবুকভিত্তিক অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও সেবামূলক সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। এই ফোরামের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সংগঠনটি দেশের সকল প্রবীণকে এক পতাকাতলে আনার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

প্রবীণদের কল্যাণে শুধু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নয়, পাশপাশি বেসরকারি এবং জনকল্যাণমূলক সংগঠনগুলোকেও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে যা প্রবীণদের সুন্দর জীবন নিশ্চিত করতে পারে। সিনিয়র সিটিজেনদের আর্থিক সমস্যা বিবেচনায় এনে গণপরিবহণে তাঁদের জন্য আসন সংরক্ষণসহ টিকেট ৪০% অথবা ৫০% রেয়াতে প্রদানের ব্যবস্থা করা; তাদের মানসকি ও শারীরিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে বেড ও কেবিন সংরক্ষণসহ কনসেশন রেটে (২০% বা ৪০%) স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থা করা এবং ঔষধ ও পথ্যসামগ্রী পাওয়ার ব্যবস্থা করা; আর্থিক সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাংকে তাদের জন্য হেলপ ডেস্ক ও পৃথক কাউন্টার রাখার ব্যবস্থা করা; সার্কিট হাউজ, ডাকবাংলো, পর্যটন মোটেল এবং বেসরকারি হোটেল রিসোর্টে তাঁদের জন্য হ্রাসকৃত মূল্যে সিট সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা; জাতীয় বিভিন্ন সমস্যা, দুর্যোগে সিনিয়র সিটিজেনদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা এবং সর্বশেষ সরকারি-বেসরকারি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ট্রেনিং সেন্টারে রিসোর্স পার্সন অথবা অতিথি বক্তা হিসেবে সিনিয়র সিটিজেনদেরকে সম্পৃক্ত করার ব্যবস্থা বা পরিকল্পনা নেয়া যেতে পারে।

কাজ মানুষকে গতিশীল রাখে। প্রবীণরা যেহেতু বয়সের কারণে কম কর্মোক্ষম বা সরাসরি উৎপাদনশীল কাজের সাথে নিজেদের হয়তো জড়িত করতে পারেন না, তাই তারা যাতে সৃজনশীল, আনন্দদায়ক, হালকা বা সহজ এবং পাশাপাশি বিশ্রাম নিতে পারেন, সেদিকে নজর দিতে হবে।

প্রবীণ বা বৃদ্ধকাল আমাদের জীবনেও আসবে। প্রত্যেকের জীবনের এটি একটি স্বাভাবিক পরিণতি। যৌবনকালে প্রবল প্রাণশক্তিতে ভরপুর কোনো ব্যক্তি যেন এক সময় বৃদ্ধ হয়ে হতাশায় না ভোগেন, অসহায় হয়ে না পড়েন, তাঁদের ত্যাগ ও অবদানের প্রতিদান পান, তা নিশ্চিত করতে হলে সরকারের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও সামাজিক সংগঠনসমূহকে এগিয়ে আসতে হবে।