মদ, জুয়া-জিরোর বিরুদ্ধে হিরো সন্তান ও উৎকন্ঠিত নেপথ্যজন

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম:

জুয়াখেলা মানব সভ্যতার আদিম ও ঘৃণ্যতম নেশা। দেশে দেশে জুয়ার রয়েছে নানা অভিধা, নানা বাহারি নাম। প্রাচ্যের দেশগুলোতে কোরিয়ান শব্দ ‘পাচিংকো’ নামে জুয়ার ব্যবসা সরব। পাশ্চাত্যে ইটালিয়ান শব্দ ‘ক্যাসিনো’ নামেই জুয়ার আসর তৈরী ও প্রসার লাভ করেছে। জুয়া ব্যবসার সাথে জুয়াড়–দের ফতুর হয়ে যবার সম্ভাবনা, ঘটনা ও কুফল থেকে নিরুপায় হয়ে নিষ্কৃতি খুঁজতে মদ, বিয়ার ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য গ্রহণের প্রবণতা থেকে আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হিসেবে ‘বার’ ‘পাব’ ইত্যাদি বিস্তার লাভ করেছে। সংগে চুরুট, গাঁজা, আফিম, শিস, ইয়াবা ইত্যাদির বিক্রিও শুরু হয়েছে। ইসলাম ধর্মে জুয়াখেলা ও মাদক সেবন করা নিষিদ্ধ। কারণ মাদকসেবনের প্রভাবে মাতাল হলে যে কোন ভাল মানুষ বে-আইনী, অন্যায় ও অনৈতিক কাজ সংঘটিত করতে পারে। তাই মুসলিম দেশগুলোতে বিদেশীদের জন্য যৎসামান্য সংরক্ষিত স্থান ছাড়া প্রকাশ্যে ‘বার’, ‘পাব’, জুয়া ইত্যাদি নিষিদ্ধ। বাংলাদেশেও ‘বার’, ‘পাব’,জুয়া খেলা নিষিদ্ধ। কিন্তু কিছু বিপথগামী, লোভী মানুষ জুয়াখেলাকে পেশা হিসেবে নিয়ে সাধারণ খেলাধূলা সম্পর্কিত ক্লাবঘরগুলোতে গোপনে দেদারসে বে-আইনী, ঘৃণ্য ব্যবসা শুরু করেছে। এজন্য নিশ্চই সরকারের আইন শৃংখলা বাহিনী রাঘব বোয়ালদের গোপন আঁতাত ও মদদ আছে।

সম্পতি ইয়াবা ইস্যুটি চুপসে গেছে। এখন ক্যাসিনো কাহিনী স্থান দখল করেছে। ক্যাসিনো শব্দটি মূলত: তাসাড়–, মদাড়–, জুয়াড়–দের পাশ্চাত্যে বহুল প্রচলিত আধুনিক নাম। আমাদের দেশে ক্যাসিনো ব্যবসা গোপনে সম্প্রসারিত হলেও অজানা কারনে প্রশাসনের অগোচরে থাকায় এতদিন এটা সাধারণ মানুষের নজরে আসেনি। দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষিত হলেও সংবাদে জানা গেছে এখনও ৮৯% মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়। দুর্নীতি, ঘুষ, মদ, জুয়া ইত্যাদি একই সূত্রে অবস্থান করে। এখানে একজনের কান টানলে অন্যজনের মাথা চলে আসে, যারা সমাজের হোমরা-চোমড়া ও প্রবল ক্ষমতাশালী। তাই ক্যাসিনো ইস্যুতে সরকারী দলের কর্মীরা ধরা পড়ায় চারদিকে চরম উৎকন্ঠা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

তবু আশার কথা যে, র‌্যাবের ডিজি বলেছেন- ‘আমাদের টার্গেট ছিল কোন ক্যাসিনো থাকবে না। আমরা সব ক্যাসিনো গুঁড়িয়ে দিয়েছি’। তাঁর এই উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে মাঝপথে এই অভিযান যেন থেমে না যায় এবং শুধু ঢাকাশহর ভিত্তিক যেন না হয় সেদিকে আশু দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া এই অভিযানের উদ্দেশ্য ও গন্তব্য জনমননে পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করে দেয়া উচিত।  

পাশাপাশি একথা স্মর্তব্য যে, ক্যাসিনো সমস্যা একটি জটিল আর্থ-সামাজিক বিষয়। এর সাথে আমাদের সামাজিক স্বীকৃতিহীনতা, ধর্মীয় নিশেধাজ্ঞা, রুচি, সামজিক ঘৃণা, নৈতিকতা, ইত্যাদি জড়িত। অপরদিকে কালো টাকার লোভ, অবৈধভাবে অর্জিত হলেও দ্রুত ধনী হবার স্বপ্ন ইত্যাদিও জড়িত রয়েছে। তাই শুধু প্রতিকারমূলক প্রাথমিক অভিযান দিয়ে এধরণের সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান আনায়ন করা যায় না। এজন্য চতুমূর্খী লাগাতর লড়াই করা প্রয়োজন।

মনে রাখতে হবে ঘুষখোর ও নেশাখোরদের কোন নৈতিকতা নেই। ওদের ধর্ম নেই, পাপবোধও নেই। নেশাখোররা পরিবারকে সবসময় জ্বালায়, প্রতিষ্ঠনকে পুড়ে মারে, সমাজকে নষ্ট করে ভেঙ্গে ফেলে। নেশাখোরদের লালনকারীদের অপর নাম মাদক ব্যবসায়ী। এই মাদক ব্যবসায়ীরা আমাদের দেশের নব্য ক্যাসিনোর মালিক। এই নব্য অবৈধ টাকার মালিকরা যতই আয় করুক না কেন, আমাদের অর্থনীতিতে এদের অবদান শুন্য। কারন, এদের কালো আয় সরকারী খাতায় জানানো হয় না। চুরি করে হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দেয়। কর ফাঁকি দেয়া ও চুরি ও প্রতারণা করা এদর মজ্জাগত ব্যাপার। অপরাধে সহায়তা করা এদর ধর্ম হয়ে দাঁড়ায়।

কোন কারনে ধরা পড়লে এরা গ্রেপ্তার এড়াতে লবিং করে, মরিয়া হয়ে ওঠে। সৎ মানুষকে নিজের কালো টাকার বিপুর অংক ঘুষ দিয়ে সমাজকে আরো খারাপ বানায়।এদের ঘুষ-দুর্নীতি করার চর্চ্চা খুবই ন্যক্কারজনক ও ভয়ংকর। এরা রাজনৈতিক দল বদল করে ভোল পাল্টায় ও সব সরকারের সময় অবৈধ সুবিধা আদায় করে দেশকে লুট করে।

এ্রা রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের লোকদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সেজে প্রতারণা করে। এরা হিরো সেজে হুমকি দেয় ও নিযমিত কাজে বখরা আদায়ে তৎপর হয়ে চাঁদাবাজ বাহিনী গঠন করে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে গোটা সমাজকে অসাড় করে দেয়। এরাই কালো টাকা সাদা করার পক্ষে সাফই গায়। দেশে অনৈতিকতা বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়ে পাপাচার তৈরীর ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। যেমনটা করেছে অবৈধ ক্যাসিনো ও সেগুলোরে হারাম মদের পশরা সাজিয়ে পাপের ব্যবসা।

মজার কথা হলো-এদর কেউ কেউ প্রতি বছর হজ্জ করতে যায়। বার বার ওমরাহ পালন করে। মসজিদে দান করে। আবার মসজিদের শহর ঢাকাকে ক্যাসিনো-মদের শহর তৈরী করে ফেলে! জনসেবার নামে অবেধ টাকা ছিটিয়ে সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে। ফলে মুদ্রস্ফীতি ঘটে ও দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায। ভোটের সময় অবৈধ টাকার জোরে নমিনেশন কিনে প্রার্থী হয়ে ভোট কিনে ও পেশীর জোর বিজয় ছিনিয়ে নেয়। এই দুষ্ট চক্রের মধ্যে নিপতিত আজকের বাংলাদেশ!

দুর্নীতির বিরুদ্ধে সহ্যের শুণ্য সীমা ঘোষণার এই পর্যায়ে শুধু রোগের উপসর্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চলবে না। ক্যাসিনো-মদের নেপথ্যের বিথগামীদের চিহ্নিত করে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। প্রতিটি ঘটনায় কান টানলে মাথা আসে। সাফাই গাওয়ার জন্যে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি তৎপর হয়ে ওঠে। ক্যাসিনো ইস্যুতে অনেকেই ইতোমধ্যে সাফাই শুরু করেছেন। কেউ বড় পদে থেকে হুঙ্কার দিচ্ছেন যে- জুয়া বন্ধ হলে ছেলেরা রাস্তায় রাহাজানি করবে! আমার কথা হলো যে ছেলেরা অভিভাবকের কথা না শুনে জুয়া খেলে তাদেরকে তো পরিবার থেকে ত্যাজ্য পুত্র করে দেয়া উচিত। এরপর রাস্তায় রাহাজানি করার জন্য নামলে তাদের আইনী শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। আসলে এখন যরা অন্যায়ের পক্ষে সাফাই গাওয়া শুরু করেছেন তারে আমলনামাকেও আমলে নিয়ে তদন্ত করা উচিত। তাদের এত উৎকন্ঠা কেন?

দেশের প্রতিটি খারাপ ইস্যুতে প্রান্তিকজন ধরা পড়ে, নেপথ্যজনকে স্পর্শ করতে এত ভয় কিসের? নাটের গুরুদের চিহ্নিত করা, ধরা ও শাস্তি দেয়া এখন সময়ের দাবী। এ বিষয়ে কোনরুপ ছাড় দেয়া জাতির জন্য লজ্জাকর ও ভয়ংকর। তা না হলে দেশ থেকে মদ, জুয়া -জিরো করার এ্ই মহৎ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বিপথগামী হিরো সন্তান ও তাদের গডমা-গডপা সদৃশ উৎকন্ঠিত নেপথ্যজন সবাইকে শ্রীঘ্র বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শয়তানি অট্টহাস্য করতে দ্বিধা করবে না !

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জাহিদ।