উচ্চ পর্যায়ের প্রতিবেদন আবাসিকে গ্যাস সংযোগের আশা

নিউজ ডেস্ক:    গ্যাসের ঘাটতির খবর সবারই জানা। এজন্য ২০১০ সাল থেকে কার্যত বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ। তখন থেকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এখন থেকে রান্নার জন্য সিলিন্ডার গ্যাস (এলপিজি-লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সহজলভ্য করা হবে। এলপিজি আমদানিতে শুল্ক্ক ছাড় দেওয়া হয়। ফলে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম আগের তুলনায় কিছুটা কম এখন। সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম এখন স্থানভেদে এক হাজার থেকে ১২শ’ টাকা। আগে ছিল দেড় হাজার টাকার বেশি। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এখন এলএনজি (লিকুইড ন্যাচারাল গ্যাস) আমদানি করা হচ্ছে। এলএনজির দাম কয়েক গুণ বেশি। ফলে জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হচ্ছিল যে বাসাবাড়িতে এই আমদানি করা গ্যাস দেওয়া হবে না। এই গ্যাস ব্যবহার হবে শুধু শিল্প খাতে।

সম্প্রতি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক কমিটি বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে গ্যাস দেওয়ার সুপারিশ করেছে। কমিটি বলছে, এলপিজির চেয়ে এলএনজির দাম কম। তুলনামূলক ঝুঁকিমুক্ত। ফলে বাসাবাড়িতে নতুন করে পাইপলাইনে গ্যাস দেওয়া যেতে পারে। জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী বীরবিক্রমও বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে গ্যাস দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। যদিও জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ মনে করেন, পাইপলাইনে বাসাবাড়িতে গ্যাস দিলে চুরি ও অপচয় বাড়বে।

এলএনজি আমদানিকে সামনে রেখে আবাসিক খাতে কোন গ্যাস সাশ্রয়ী ও নিরাপদ তা যাচাই করতে গত বছরের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী বীরবিক্রমের নির্দেশনায় একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। চলতি বছরের ১৮ মার্চ কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, আবাসিকে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে সিলিন্ডারের চেয়ে পাইপলাইনে গ্যাসই সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। কমিটি আরও বলেছে, আমদানি করা হলেও গ্রাহক পর্যায়ে এলপিজি থেকে এলএনজি মূল্যের দিক দিয়ে ৬৫ শতাংশ সাশ্রয়ী। আর ওজনে ভারী বলে এলপি গ্যাসে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বেশি। তাই শহরাঞ্চলের জন্য বিশেষ করে ঘনবসতি এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের ব্যবহার সুবিধাজনক। এসব কারণে পাশের দেশ ভারতে এলপিজির পরিবর্তে এখন রান্নার কাজে পাইপলাইনে গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে।

বর্তমানে দেশে আবাসিক গ্রাহক সংখ্যা ৪০ লাখ। এ খাতে দিনে ৪৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় গত কয়েক বছরে বিতরণ কোম্পানিগুলোতে নতুন সংযোগের জন্য এক লাখের ওপর আবেদন জমা হয়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, পাইপলাইনে বাসাবাড়িতে গ্যাস দেওয়ার জন্য ব্যাপক চাপ আছে। বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন যে এলাকায় গ্যাসের ব্যবস্থা করবেন। এজন্য অনেকে আবেদন করেছেন। এছাড়া ঢাকায় নতুন আবাসিক ভবনগুলোতে গাসের সংযোগ নেই। সেখানে সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু পাশেরই পুরনো ভবনে পাইপলাইনে গ্যাস আছে। এটা একরকম বৈষম্য। আবাসন ব্যবসায়ীরাও পাইপলাইনে গ্যাসের জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। শুধু পাইপলাইনে গ্যাসের অভাবে বহুস্থানে ফ্ল্যাট বিক্রি হচ্ছে না, বা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। নির্বাচিত এমপিরা প্রতিশ্রুতি পূরণ না করলে আগামীতে ভোটের সময় সমস্যা হতে পারে বলে মনে করছেন। ফলে লাভ-ক্ষতি যাই হোক না কেন পাইপলাইনে গ্যাসের দাবি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হচ্ছে সরকারকে।

বর্তমানে এলএনসহ দৈনিক ৩২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সারাদেশে সরবরাহ করছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসছে ৫৭ কোটি ঘনফুট। বাকি ২৬৩ কোটি ঘনফুট দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে তোলা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে স্থাপিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ ক্ষমতা দৈনিক ১০০ কোটি ঘনফুট।

চাহিদা অনুযায়ী বার্ষিক ১৫ লাখ টনের বেশি এলপিজি সরবরাহ করা দরকার। তবে আমদানি ও বিক্রি হচ্ছে বার্ষিক প্রায় ১০ লাখ টন। এর মধ্যে ২০ হাজার টন এলপিজি সরকারিভাবে বিক্রি হয়।

কমিটি তাদের প্রতিবেদনে বড় শহরের বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে গাস সরবরাহের সুপারিশ করেছে। চুরি ও অপচয় রোধে প্রয়োজনে মিটার স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে। ছোট শহর ও পাইপলাইন নেই এমন স্থানে এলপিজি সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে।