ঘুমপাড়ানি গানের কানকাটা কুকুর ও ক্যাসিনো

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম:

তখনকার দিনে দাদী-নানীদের দায়িত্ব ছিল অনেক। মায়েরা সন্তান জন্মদান করে রান্ন-বান্না, ঘরকান্নার কাজে ব্যস্ত থাকতেন আর কোলের শিশু ‘মানুষ’ করতেন পরিবারের বয়স্ক দাদী-নানী ও পড়শীরা। মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো হয়ে গেলে ঘুমপাড়ানোর দায়িত্ব বর্তাতো বড়দের। শুধু কি তাই- পরিবারের সব ছোট বাচ্চাদের রুপকথার গপ্প শুনিয়ে তাপর ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে সবাইকে কল্পরাজ্যে ডুবিয়ে ঘুমিয়ে দিয়ে দাদী-নানীদের ছুটি জুটতো। কেউ তারপরও ঘুমুতে না চাইলে জুজুবুড়ি, ট্যাপট্যাপার মাও, রাক্ষস-খোক্কসের ভয়ের গল্প শোনাতো। দাদীর নিকট শোনা নিদের বা ঘুমের একটি গান এখনও মনে আছে। সেটা এক কান কাটা হিংস্র কুকুরকে নিয়ে। গানের প্রথম কলিটা এমন- ‘আয় নিদু, বায় নিন্দু তেঁইতুলের পাত- কান কাটা কুকুর (সারমেয়) আইসে ঝিত্ করিয়া থাক্’।

আজকের দু’টি সংবাদ পড়ে হঠাৎ কান কাটা কুকুরের গানটার কথা মনে হলো। আসলে একসময় বর্গী হানাদারদেরকে কানকাটা পাগলা কুকুরের সংগে তুলনা করে শিশু ঘুমপাড়ানি এই ফোক গানের প্রচলন হয়েছিল বলে মনে হয়। আধুনিক যুগে শিশুদেরকে ঘুমপাড়ানি গান শোনাতে হয় না। ওরা ঘুমাতে চায়না, ওদের ঘুমানোর সময়ও নেই! শিশুদের জন্য এত যন্ত্র,এত খেলনায় বিচিত্র গান, ভিডিও গেম, ইন্টারনেটের এত জানালা-এগুলে রেখে ঘুমাবে কখন? শিশুরা নিজে ঘুমায় না অথচ পরিবারের সবার ঘুম হরণ করে। ওরা ভয়ংকর নৃশংস গেম খেলতে অভ্যস্ত। শিশুরা ব্লু-হোয়েল গেম খেলে নিজের শরীর কেটে রক্তাক্ত করে, কেউ আত্মহত্যা করে, কেউ গ্যাং বানিয়ে বন্ধুদের হত্যা করে কেউবা অপরের কান কেটে পলিথিনে ভরে উল্লাস করতে কুন্ঠিত করে। সংবাদে জানা গেল টুঙ্গিপাড়ার শ্রীরামকান্দি গ্রামের সোহাগ সর্দারের বাঁ কানটি কেটে পলিথিনে ভরে উল্লাস করেছে রাজিব শেখ। সে একই গ্রামের বাসিন্দা। নিকটস্থ পাটগাতি বাসস্ট্যান্ডের বাস কাউন্টারে বিকেল ৪.৩০ মিনিটে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে। রাজিব শেখ ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার ছেলে। উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি তার বাবা। দ্বিতীয় আরকেটি ঘটনায় লেখা হয়েছে- সামান্য পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী তার স্বামীর একটি কান কেটে নিয়েছেন। তিনি কাটা কানের যন্ত্রনায় হাসপাতালের বিছানায় ছট্ফট্ করছেন।

এগুলোকে কেহ বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে পারেন। কেন্তু ঘটনাগুলো মোটেই ফেলনা নয়। যে কোন কারনেই হোক মানুষের মধ্যে প্রতিবাদের ভাষার রুপ পালিয়ে গেছে। মানুষ আজকাল বড় নির্দয় ও নির্মম হয়েছে। এগুলোর কারন অযৌক্তিক ও সীমাহীন লোভ, আইনকে ভয় না করা। অন্যায় ও নীতিহীন কর্মকান্ডের ওপর মানুষের সাহস বেড়ে গেছে। কারণ, বে-আইনী কাজ করেও সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে সহজে পার পাওয়া যায়। সেটা লাগাম ছাড়া তা আজকে এক পুলিশ কমিশনার খোলাসা করে বলে দিয়েছেন। তিনি নিজেই থানায় বসে ডিসিগিরি করার কথা বলেছেন। ‘ভাল পুলিশ ও মন্দ পুলিশ’-দের তিনি আলাদা করে চিহ্নিত করতে বলেছেন। তার এই চমৎকার ও নজিরবিহীন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কারন আমাদের দেশে থানাই হচ্ছে অপরাধ নিয়ন্ত্রনের মূল জায়গা। থানার কাজ থানাকেই করতে দিতে হবে। থানাকেই তার কাজের সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা দিতে হবে। কোন অপরাধের শাস্তি কি হবে তার তার প্রাথমিক ও মূল তদন্ত সাধারণত: থানার কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। তাই তাদেরকে আসল ঘটনার রহস্য উন্মোচনে স্বাধীনতা দিতে হবে। থানার কাজ সামলাতে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর আইএসএসবি-র মত বা স্পেশাল কমিশন-এর মাধ্যমে চৌকষ মেধাবীদের থানায় নিয়োগ দিতে হবে। সিদ্ধান্ত নেবার ভার যদি ওপরওয়ালাদের হাতে বা রাজনৈতিক নেতাদের হাতে তুলে দেয়া হয় তাহলে সেখানে নেপোটিজম ও দুর্নীতির বেড়াজাল তৈরী হতে বাধ্য। এভাবে নির্ভেজাল প্রক্রিয়া তৈরী না করা পর্যন্ত বর্তমানের আমলাপ্রবণ ব্যবস্থায় ভাল কিছু করা বেশ দুরুহ বলে মনে হয়।

যেমন আমাদের সংস্কৃতি বিরুদ্ধ মাদক সেবন মাদক ব্যবসা কে একধাপ এগিয়ে রাখছে। যারা নিজ জাতিস্বত্তাকে অবহেলা করে অন্যায়ভাবে মাদক সেবন করেন তারা যে কোন অবৈধ কাজ বা পাপ ব্যবসা করতে দ্বিধা বা ঘৃণা করেন না এটাই স্বাভাবিক। এই শ্রেণীর আধিক্য ও প্রাবল্য আমাদের সমাজে খুব বেশী চোখে পড়ে। তাদের জন্য অনেকের করুণা হয় বটে কিন্তু করার কিছুই থাকে না। সেজন্য ধর্মীয়ভাবে নিষেধ থাকা সত্তেও জুয়া, বার, পতিতাবৃত্তি, ঘুষ-দুর্নীতি ইত্যাদির প্রতি এক শ্রেনীর বিষয়-সম্পত্তি লোভী মানুষের কোন ঘৃণা বা আক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না। আর এরই যদি অফিস-আদালতের চেয়ারে পাহারার দায়িত্বে থাকেন তাহলে তো কথাই নেই। এরা চেয়ারে থাকলে সরকারী শুদ্ধাচার অভিযান জনমভর অশুদ্ধিই থেকে যাবে।

এদের প্রভাবেই দেশে বর্তমানে গড়ে উঠেছে হাজারো ক্যাসিনো বা আধুনিক জুয়াখেলার ঘর। জানা গেছে আধুনিক জুয়া হিসেবে ১৯৯৪ সালে ঢাকার আরামবাগে আগমন ঘটেছিল ‘ওয়ান টেন’ খেলার। এর জনপ্রিয়তা দেখে সব পাড়ায় এটি ছড়িয়ে যায়। একসময় লাভের টাকার হিসেবে গড়মিল সারাতে মারামারি লেগে জুয়াড়ীদের হাতে একজন মারা যায়। ২০০১ সালে তৎকালীন সরকারের উদাসীনতায় ঢাকায় গজিয়ে উঠে শতাধিক ক্যাসিনো। তখন গেন্ডারিয়ার রাইফেল্স ক্লাবে সায়েম ও মহসীন নামের দুই যুবককে জুয়ার জেরে হত্যা করা হয়। তাদেরকে নৃশংসভাবে বারো টুকরা করে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর তত্তাবধায়ক সরকার এলে সব ধরনের জুয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তারপর কিছুটা দমে গিয়েছিল ক্যাসিনোর অবৈধ ব্যবসা।

এখন আবার নতুনরূপে ক্যাসিনো ব্যবসাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে। বিদেশীর ’এস্কট গার্ল’ নামক কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে এটাকে পরিচালনা করছে। প্রশাসন সহায়তা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একসময় যুবদল এগুলো পরিচালনার দায়িত্বে থাকলেও এখন এটা দখলে নিয়ে সরকারী দলের ছত্রছায়ায় কিছু অসাধু লোকেরা পরিচালনা করছে বলে সংবাদ মাধ্যমে জানা গেছে। ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসার বড় বড় ষাটটি স্পট রয়েছে যেগুলোতে ২৪ ঘন্টা দ্বার খোলা থাকে এবং প্রতিদিন গড়ে ১২০ কোটি টাকা উড়ছে। এগুলো কিশোর-যুবকদের বিপথগামী হবার দরাজ দ্বার বৈ কিছু নয়। কারণ এখানে মাদক ব্যবসা, অশ্লীল ছবি প্রদর্শণ, পতিতাবত্তি জড়িত রয়েছে। পাশাপাশি সন্ত্রাসী কাজের সূতিকাগার হিসেবে এসব ক্যাসিনো নামধারী প্রতিষ্ঠান প্রভূত ভুমিকা রাখতে সহায়তা করে।এসকল কাজে যারা জড়িত তারা নিজেকে বপুমোটা মনে করে বুক উঁচিয়ে চলাফেরা করে। সবজায়গায় এদের গডফদার ও বড়ভাই আছে। এরা নিজেকে এসব কাজের জন্য অপরাধীও মনে করে না। তারা অনেক সময় আইনের ধরা ছোঁয়ার উর্দ্ধে বিরাজ করে থাকে। কিন্তু এসব হিরোদেরকে স্পর্শ না করে জিরো টলারেন্স তাহলে কার বিরূদ্ধে নেয়া হচ্ছে?

একসময় ভিনদেশী বর্গী ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আন্দোলন করা হতো। শিশুরা যাতে সেই আন্দোলনে শরীক হতে পারে সেজন্য তাদেরেকে ঘুমপাড়ানি গানের মাধ্যমে কানকাটা কুকুর এসেছে বলে সতর্ক বার্তা দেয়া হতো। আর এখন আমরা কার বিরূদ্ধে শিশু-কিশোরদেরকে সতর্ক করব? ওরা যে আমাদের ঘর-বাড়ি, অফিস-আদালত, বাজার-ঘাট তথা রক্ত-মাংসের মধ্যেই মিশে গেছে ! এখন আমাদের নিজেদের সৃষ্ট কানকাটা কুকুর ও পাপচার তৈরীর ক্যাসিনোগুলোকে নিজেরাই ধ্বংস করার উদ্যোগ না নিলে আমাদের সবার আত্মা দু’জনমে-ই কষ্ট পেতে থাকবে বৈ কি?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জাহিদ।