ভারতের নাগরিকত্ব নয়, চাই হিন্দুদের বাংলাদেশে পুনর্বাসন

সুমন দত্ত: ভারতের নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনা করবেন। আগামী অক্টোবরে শেখ হাসিনার ভারত সফর এই বার্তালাপ হবে । বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি নাগরিকপঞ্জি নিয়েও আলোচনা হবে। এমন কথা জানিয়েছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা হিন্দুস্তান টাইমস।

খবরটি প্রকাশের পর বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রবাদ আছে ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। বাংলাদেশের অবস্থা এখন এরকম। ১২ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে এমনেতেই বাংলাদেশ হিমশিম খাচ্ছে।

আর বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে রয়েছে কয়েক লাখ বিহারি রিফুজি। যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সহযোগিতায়। এখন ভারত থেকে যদি লাখে লাখে রিফুজি আসে তখন কি হবে এদেশের অবস্থা? এমন এক সংকটের দিকে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

এ কারণে মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠক গুরুত্ব-সহকারে দেখা হচ্ছে। বৈঠকের ফলাফল জানতে পুরো বাংলাদেশ উদগ্রীব।

ভারত ভাগ হয়েছে একবার। কিন্তু এই ভূখণ্ড (বাংলাদেশ) ভাগ হয়েছে দুবার। যার ফলে বিভিন্ন সময়ে এদেশ থেকে লোক অন্য দেশে চলে গেছে। তাই বর্তমান ভারতে পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি থাকাটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা না। এখনো বহু পাকিস্তানি হিন্দু ও বাংলাদেশি হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে। এ খবর ভারতের মিডিয়ায় প্রকাশও হচ্ছে। তাই ভারত তার বহু পুরানো নাগরিক আইন সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগ ভারতের পার্লামেন্টে বাতিল হয়ে গেছে।

আর এরই মধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন পার্টি বিজেপি দেশে অনুপ্রবেশকারী সনাক্ত করার জন্য চালু করেছে এনআরসি প্রকল্প। আসামে এই প্রকল্প চালু করতে গিয়ে নানা ভুল ভ্রান্তি চোখে পড়েছে। দেখা গেছে বৈধ ভারতীয় নাগরিকরা অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে যাদেরকে লক্ষ্য করে এই প্রকল্প চালু করা হয়েছিল তাদের নাম এনআরসিতে ঠিক মতো উঠে গেছে।

পর্বতের মূষিক প্রসবের মতো ঘটনা ঘটেছে আসামের এনআরসিতে।

হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি করতে গিয়ে বিজেপি নিজেই হিন্দুদের অভারতীয় প্রমাণ করে ছেড়েছে। এখন তাদের নেতারা দায় এড়ানোর জন্য বলে বেড়াচ্ছে একজন হিন্দুকেও ভারত থেকে তাড়ানো হবে না।

বিজেপি নেতাদের এ কথা বলার ভিত্তি কি? এটা যারা বলছেন তারা কিন্তু এর উত্তর দিচ্ছেন না। আসামে বাদ পড়া অভারতীয়দের মধ্যে ১১ লাখ হিন্দু ৬ লাখ মুসলিম ২ লাখ অন্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী। তাই এনআরসি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

ভারত শক্তিশালী এক রাষ্ট্র। বাংলাদেশে সেই তুলনায় কিছুই না। এখন ভারতের কথা না শুনলে বাংলাদেশ সরকার চাপের মধ্যে পড়বে। এটা নিশ্চিত। আবার বর্তমানে সরকারের সঙ্গে ভারতের রয়েছে মধুর সম্পর্ক। তাই ভারত বর্তমান সরকারকে চাপ দেবে এমনটা শেখ হাসিনার শত্রুরাও মনে করে না। বিষয়টা পরস্পরের আপোষ মীমাংসায় টেবিলে নিষ্পত্তি হবে। এমনটাই ভাবা হচ্ছে।

ভারত-বাংলাদেশে ছিট মহলা সমস্যা, সীমান্ত চিহ্নিত সমস্যা, গঙ্গা চুক্তি, সবই টেবিলে নিষ্পত্তি হয়েছে। সমুদ্র সীমানাও আন্তর্জাতিক আদালতে সমাধান হয়েছে ভারতের সঙ্গে কোনো বিবাদে না গিয়ে। এমন অবস্থায় শরণার্থীর সমস্যা সমাধান হবে না, এমনটা মনে করা যায় না।

শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারী নিয়ে ভারত বাংলাদেশকে কি বলে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো জাতি। বাংলাদেশ এর জবাবে কি বলে সেটাও জানতে চাইবে সবাই। কারণ রাজনীতিতে মাঠের বক্তব্য আলোচনার টেবিলে হয় না। রাজনীতির মঞ্চে জনগণকে মিথ্যা বলে ধোঁকা দেয়া যায়। আলোচনার টেবিলে তা করা যায় না। সেখানে সিরিয়াস আলোচনা হয়।

ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়েছে ভারতবর্ষ। তার আগে সবাই ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক ছিল। মোদ্দা কথা ব্রিটিশ আমলেই নাগরিক আইন, জমি আইন তথা দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনসহ সব ধরনের জন কল্যানমূলক আইন তৈরি হয়। তার আগে ভারতে কোনো আইন কানুন ছিল না। যে যার মত করে দেশ শাসন করত। তাই ব্রিটিশ আমলের আগে কে ভারতে ছিল আর কে ছিল না তার দালিলিক প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না।

কথা গুলো এ কারণে উঠছে, আজ স্বাধীন ভারতে এক শ্রেণির মানুষ নিজেকে নতুন করে ভারতীয় বানাচ্ছে। অতীত ইতিহাস ও রাজনীতি ভুলে গিয়ে তারা এসব করছে। যার কারণে তৈরি হচ্ছে নানা সমস্যা। ভারতবর্ষ ভেঙ্গে তৈরি হয়েছে পাকিস্তান পরে পাকিস্তান ভেঙ্গে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক এই উত্থান পতনে দেশ বদলের খপ্পরে পড়ে বহুলোক। যার ফলে একজন পাকিস্তানির ভারতে থাকা কিংবা একজন ভারতীয়র বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানে থাকা অসম্ভব কিছু না।

রাজনীতিবিদদের ভণ্ডামি সাধারণ মানুষ ধরতে পারেনি। কে জানত নেহেরুর বন্ধু কংগ্রেসের চ্যাম্পিয়ন সেক্যুলার মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাতারাতি সাম্প্রদায়িক হয়ে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্তান চাইবে।

আবার তারও পরে কে জানত চ্যাম্পিয়ন মুসলিম লীগার হোসেন সোরাওয়ার্দী ও তার শিষ্য শেখ মুজিব রাতারাতি সেক্যুলার হয়ে বাংলাদেশ দাবি করে বসবে?

রাজনীতিবিদদের এই চরিত্র বদলে সাধারণ জনগণ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়। হয় বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ভারতে লোকজন স্থানান্তর। উপমহাদেশের রাজনীতিবিদদের চরিত্র বদলে সাধারণ জনগণের হয় দেশ বদল।

আজ বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারি মুসলিমদের কথাই ধরুন। পাকিস্তান বলে আটকে পড়া ভারতীয় মুসলিম। কারণ বিহার পাকিস্তানে নেই। ওটা ভারতে ছিল। তাই ওরা ভারতীয়। অথচ এই মুসলমানরা পাকিস্তানের আশায় ভারতের বিহার রাজ্য ছেড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে এসেছিল। কে জানত? তখন এই পাকিস্তান বাংলাদেশ হয়ে যাবে। রাজনীতিবিদদের ডিগবাজির কারণে এরা হয়ে গেল রিফুজি। একই ভাবে বাংলাদেশ হওয়ার পর বহু হিন্দু বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আসে। কারো পরিবারে বিভক্ত হয়ে দুই দেশে থেকে যায়।

এই যখন ইতিহাস তখন কে ভারতীয় আর কে ভারতীয় নয় তা খোজা অর্থহীনই।

এক রক্তাত্ত্ব ইতিহাসের মধ্য দিয়ে ভাগ হয় দেশগুলো। তাই লোকজন কোথায় থাকবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি অধিকাংশ লোক। এ কারণে মুসলমানদের এক বিরাট অংশ ভারতে থেকে যায়। তারা পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশে গণহারে যায়নি। অন্যদিকে হিন্দুরা গণহারেই পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। যে কারণে পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু তেমন একটা নেই।

বাংলাদেশে ৭-৮ শতাংশ সংখ্যালঘু হিন্দু থাকলেও, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে এই হার শূন্যেরও নিচে। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের হার শূন্যের ঘরে নেমে আসবে এমন ইংগিত এখানকার গবেষকরা দিচ্ছেন।

এমন অবস্থায় নাগরিক পঞ্জি করে ভারতীয় চিহ্নিত করাটা জটিল প্রক্রিয়া। পুরানো নথি ঘেঁটে প্রমাণ করাটাও কঠিন এক কাজ হবে। কারণ তখন ডিজিটাল যুগ ছিল না। পুরাতন অনেক নথি উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে। কারো হারিয়ে গেছে। কে জানত বাপ দাদার চাকরি সনদ রেশন কার্ড বিজেপি ওয়ালারা চেয়ে বসবে।

তাই পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু হলে সেখানে শুরু হবে একটা বিশৃঙ্খলা।

বাংলাদেশে হিন্দু খেদানোর একটা আইন হচ্ছে অর্পিত সম্পত্তি আইন। পাকিস্তান আমলে এই আইনটার নাম ছিল শত্রু সম্পত্তি আইন। বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করলেও এই সাম্প্রদায়িক আইনটি তিনি তুলে নেননি। মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে সহায়তা করায় তিনি এই আইনের নাম পরিবর্তন করেন মাত্র লজ্জার খাতিরে। ভারতকে শত্রু বললে কেমন কেমন শোনায়। এই ভাব থেকেই তিনি আইনটির নাম পরিবর্তন করেন মাত্র। অথচ এই আইনের কিছুই পরিবর্তন করেননি শেখ মুজিব। বাংলাদেশের ভূমি তহশিলদাররা এক পেন্সিলের খোঁচায় বহু হিন্দুর সম্পত্তিকে অর্পিত বানিয়ে হিন্দুদের জমিহীন করে দিয়েছে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এই আইনের নাম দেয়া হয়েছে অর্পিত সম্পত্তি। অথচ কোনো হিন্দু মালিকই এই সম্পদ বাংলাদেশ সরকারের কাছে অর্পণ করেনি। সরকার এসব সম্পত্তি চর দখলের মত নিজের দখলে নিয়েছে । আর নাম দিয়েছে অর্পিত সম্পত্তি। বরং বলা উচিত সরকার দখল করা সম্পত্তি। আবার এই অর্পিত সম্পত্তি যার তার নামে ইজারা দিয়ে সরকার মূল মালিকের নামে রাজস্ব আদায় করছে বছরের পর বছর।

সম্প্রতি সরকার অর্পিত সম্পত্তির তালিকা করে হিন্দুদের তা ফিরিয়ে দেবার উদ্যোগ নিলেও এক অজানা কারণে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ সংক্রান্ত ২ লাখের ওপর মামলা আদলতে ঝুলছে। তা নিষ্পত্তির ব্যাপারে সরকারের কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। আজ সরকার ও তার তোষামোদকারীরা রোহিঙ্গাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হলেও হিন্দুদের অধিকার নিয়ে তারা ততটা সোচ্চার নয়। এতেই এদেশে অসাম্প্রদায়িকতার ড্রাম পেটানোদের চেহারা বেরিয়ে পড়ে।

ভারত এনআরসি করে বাংলাদেশের হিন্দুদের তাদের দেশ থেকে ফিরিয়ে দিক। আর তাদেরকে বাংলাদেশ সরকার অর্পিত সম্পত্তিতে পুনর্বাসন করুক। এটাই হতে পারে একটা সমাধান। কারণ নিখোঁজ হওয়া হিন্দুদের নামে রাজস্ব আদায় করবেন। অথচ হিন্দুদের সম্পত্তি ফেরত দেবেন না। এমন শয়তানি তো ক্ষমতায় বসে দীর্ঘদিন করা যায় না।

যেহেতু ভারত বাংলাদেশি হিন্দুদের তাদের দেশের নাগরিকত্ব দিতে বাধ্য নয়। তাই নরেন্দ্র মোদির উচিত হবে সেই সব হিন্দুদের তাদের জায়গা জমিতে ফেরত যাওয়ার জন্য শেখ হাসিনাকে রাজি করানো। আসামের হিন্দুরা বাংলাদেশের সিলেট সুনামগঞ্জ অঞ্চল থেকে পালিয়ে গেছে। তাদেরকে ওইসব অঞ্চলে ফেরত পাঠানো হোক। সেখানকার অর্পিত সম্পত্তিতে তাদের পুনর্বাসন করা হোক। তেমনি বাংলাদেশের অন্য অঞ্চল থেকে বিদায় নেয়া হিন্দুদের একই ভাবে পুনর্বাসন করা হউক।

লেখক : সাংবাদিক

মেইল: ুsumondatta11@gmail.com