সমাজে এখন ভালো মানুষ পরাজিত

আবদুল মান্নান:   বর্তমান প্রজন্ম গ্রেসামের ল’ বা সূত্র সম্পর্কে না-ও জানতে পারে। জন গ্রেসাম (১৪৯৫-১৫৫৬) একজন ধনাঢ্য ইংরেজ বণিক ছিলেন। তিনি জীবদ্দশায় নিজ দেশের সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। একসময় জন গ্রেসাম প্রথম রানী এলিজাবেথের অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তখন ইংল্যান্ডে স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন ছিল। যে কোনো ধাতব মুদ্রা যে ধাতু দিয়ে তৈরি হয়, তার চেয়ে মূল্য কম থাকে, যাতে ওই মুদ্রা গলিয়ে কেউ বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করতে না পারে। কোনো একসময় গ্রেসাম লক্ষ্য করলেন, ইংল্যান্ডে প্রচলিত নতুন স্বর্ণ মুদ্রা বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে আর তার স্থলে পুরনো স্বর্ণ মুদ্রার প্রচলন বেশি হচ্ছে। অনুসন্ধান করে দেখা গেল, সাধারণ মানুষ নতুন স্বর্ণ মুদ্রা নিজের কাছে সংরক্ষিত করছে আর পুরনো মুদ্রা দিয়ে কেনাকাটা করছে। এর একটা অন্যতম কারণ ছিল, ওই সময় ইংল্যান্ডে স্বর্ণের দাম বৃদ্ধি পায় এবং একটি এক পাউন্ডের স্বর্ণ মুদ্রা গলিয়ে তা স্বর্ণ হিসেবে বিক্রি করলে সেই স্বর্ণের মূল্য এক পাউন্ড থেকে বেশি পাওয়া যায়। এর ফলে ইংল্যান্ডের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব পড়ল। তখন জন গ্রেসামের বহুল প্রচলিত সূত্র বা তত্ত্ব ‘ব্যাড মানি ড্রাইভস আউট গুড মানি’ চালু হয়েছিল।

বর্তমান সময়ে গ্রেসামের সূত্রটা সাধারণত ব্যবহার করা হয় এটি বোঝানোর জন্য যে, সমাজের মন্দ মানুষের দাপটে এখন ভালো মানুষরা সম্পূর্ণ কোণঠাসা বা অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। বর্তমানে সারাবিশ্বে তো বটেই, বাংলাদেশেও এই তত্ত্বের সত্যতা মিলবে সব ক্ষেত্রে। এত মন্দ মানুষ কোথা থেকে এলো, তা একটা গবেষণার বিষয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রায় প্রত্যেকটা বক্তৃতায় একটি বিষয়ের ওপর জোর দিতেন আর তা হচ্ছে দুর্নীতি। তিনি বলতেন, ‘পাকিস্তানিরা সবকিছু নিয়ে গেছে, রেখে গেছে কিছু দুর্নীতিবাজ।’ বলতেন, ‘সকলে পায় সোনার খনি আর আমি পেলাম চোরের খনি। দেশের সাধারণ গরীব কৃষক শ্রমিক তারা দুর্নীতি করে না, করে দেশের পাঁচ ভাগ মানুষ, যাদের আমরা শিক্ষিত বলি।’ বঙ্গবন্ধুর সেই সময়ের পর্যবেক্ষণ এখন আরও প্রাসঙ্গিক। তখন তো যারা দুর্নীতি করত, আজকের তুলনায় তাদের সিঁধেল চোর মনে হবে। তখন চুরি মানে রিলিফের কম্বল আর গম চুরি।

বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির জন্য চাল-ডাল, চিনি-লবণ গুদামজাত করা। পারমিট লাইসেন্সের ব্যবসা করা। ঘুষ মানে শত বা হাজার টাকার ঘুষ খাওয়া। ওই সময়ের তুলনায় এসব এখন নস্যি। শিক্ষিত মানুষ, মানে যারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছে, তারা যেমন ভালো কাজের কলাকৌশল জানে, ঠিক একইভাবে মন্দ কাজের কলাকৌশল সম্পর্কেও তারা বেশ ভালোমতো ওয়াকিবহাল। দুর্ভাগ্য, সমাজে মন্দ কাজের কলাকৌশল যারা নিয়মিত ব্যবহার করে, তাদের কাছে ভালো কাজের পারদর্শীরা প্রতিনিয়ত পরাজিত হচ্ছে। গত ২২ আগস্ট দেশের সর্বোচ্চ আদালতের তিনজন বিচারপতিকে অনিয়মের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সাসপেন্ড করেছে। এর আগে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে বর্তমানে প্রবাসে আছেন। তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক অভিযোগ হচ্ছে, দুর্নীতির অভিযোগ। দেশের মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য দেশের বিচারালয়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।

২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলার পর সরকার বিচারপতি জয়নাল আবেদিনকে দিয়ে একটি এক সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে। বিচারপতি আবেদিন এই ভয়াবহ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগ ও ভারতকে দায়ী করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। ১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা নিরসনের জন্য ছাত্র-শিক্ষকরা মিলে এক যৌথ মিছিল বের করলে জামায়াতের সশস্ত্র ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে সেই মিছিলের ওপর হামলা করা হয়। প্রায় দুইশ’জন শিক্ষক সেই হামলায় গুরুতর আহত হন। কয়েকজনের মাথা ফাটে। ফারুখউজ্জামান নামে এক ছাত্রকে ইট দিয়ে মাথা ফাটিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনা তদন্ত করার জন্য তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একটি এক সদস্যবিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেন। সেই কমিটি দীর্ঘ শুনানির পর দাখিল করা প্রতিবেদনে বলে, পুরো ঘটনার জন্য শিক্ষকরা দায়ী! চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সেই বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হয়। যেসব ছাত্রশিবির সদস্য শিক্ষকদের মাথা ফাটানোর কাজে জড়িত ছিল, তাদের কয়েকজনকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সব কাজ ‘শিক্ষিত’ ব্যক্তিরাই করেছেন।

৭ সেপ্টেম্বর দেশের একটি শীর্ষ স্থানীয় দৈনিক খবর দিয়েছে, একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষক নিজ বিভাগের সহকর্মীদের লেখা নিজের নামে প্রকাশ করেছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক কয়েক বছর আগে তার পিএইচডি থিসিসে দেশের একজন প্রথিতযশা গবেষক ও পণ্ডিত শিক্ষকের বই থেকে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা নকল করে সেই শিক্ষকের কাছে ধরা পড়েছিলেন। অভিযুক্ত শিক্ষক একসময় আবার বিএনপিদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা ছিলেন। আবার যার লেখা থেকে নকল করা হয়েছে, তিনিও বিএনপি ঘরানার একজন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করা হলে সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ঠিক একই কাণ্ড হয়েছে দেশের আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে একজন শিক্ষক তার থিসিসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য আরেকজন শিক্ষকের থিসিস থেকে একটি বিরাট অংশ নকল করে ডিগ্রি পেয়েছেন। সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তির অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি অভিযোগের সত্যতা পায় এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু এরপরও ওই শিক্ষকের কোনো কিছুই হয়নি। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা কেউ কখনও নিয়েছে, তেমনটা শোনা যায়নি।

রাজনীতির অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। সৎ, যোগ্য ও দলের জন্য আজীবন নিবেদিতপ্রাণ মানুষটি সবসময় বঞ্চিত হন। দলে যারা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন, তারা অনেকটাই পরগাছা, যাদের প্রচলিত নাম হাইব্রিড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রায়ই এটি স্বীকার করেন ও বলে থাকেন। নির্বাচনের ছয় মাস আগেও যিনি অন্য দলে থেকে শুধু দলের বিরোধিতাই করেননি, সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন, তিনি কীভাবে রাতারাতি দল পরিবর্তন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন? এমন প্রশ্ন দলের জন্য আজীবন নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন তারা তো করতেই পারেন। আর সমাজ থেকে বর্তমানে বিনয় শব্দটা নির্বাসিত হয়েছে। বিনয় কাকে বলে এখনও বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছ থেকে শেখা যায়। তার শিক্ষক প্রফেসর আনিসুজ্জামান বা প্রফেসর রফিকুল ইসলামকে তিনি কতটুকু সম্মান করেন, তা সবাই জানেন। শুধু এই দু’জন শিক্ষকই নন, যে কোনো মানুষকেই তিনি সম্মান করতে জানেন; হোক না তিনি একজন গ্রামের সাধারণ গরিব কৃষক, যাদের এখন শহুরে ‘শিক্ষিত’ ভদ্রলোকেরা ‘ছোটলোক’ হিসেবে জ্ঞান করে। এটি তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি সবসময় লক্ষ্য করেছি।

এখন ভালো, সৎ ও যোগ্য মানুষ আর কোনো ভালো পেশায় আসতে চায় না এবং এলেও মন্দ মানুষের অত্যাচারে খুব বেশি দিন টিকতে পারে না। এমনটি চলতে থাকলে যে কোনো সমাজ ব্যবস্থাই ধসে পড়বে। বাংলাদেশের দিকে তাকালেই এটি বুঝতে কষ্ট হয় না, গ্রেসামের সূত্র এই দেশের জন্য কতটুকু প্রাসঙ্গিক। চিত্রটি এমন দুর্ভাগ্যজনক বলেই দেশের প্রধানমন্ত্রীকে জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবকিছুর দিকে সার্বক্ষণিক নজর দিতে হয়, যা একজন মানুষের পক্ষে অসম্ভব; হতে পারেন তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা।

বিশ্নেষক ও গবেষক