পুকুর পোষা রাক্ষুসে মাগুর ও জিরোর বিরুদ্ধে হিরো সন্তানেরা

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম:

ছেলেবেলায় সময় বাঁচানোর জন্যে ধান-পাটক্ষেতের আলপথ ধরে স্কুলে যেতাম। যতদিন বিলে পানি জমতো না ততদিন আলপথেই দলবেঁধে চলতো স্কুলে আসা-যাওয়া। বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত ধান, কাউনের ক্ষেত ডিঙ্গিয়ে সরাসরি হাঁটাচলা করা গেলেও জৈষ্ঠ্য মাসে পাট বড় হয়ে গেলে বাঘডাসার আক্রমণের ভয়ে একা একা কেউ আলপথে চলতে চলতে চাইতো না। তখন মাঝে মাঝে শুনতাম ‘ছাওয়াধরা’ আতঙ্কের কথা। ‘রক্তচোষা জুজু’ বের হয়েছে বলে দাদী আম্মা সতর্ক করে দিতেন আঁখ অথবা পাটক্ষেতের আলপথে খেলা না করতে বা ঐ পথে স্কুলে না যেতে।

তখন পাকা রাস্তা ছিল না। তাই রাস্তায় শুকনো দিনে মাটি ফেটে বালু বের হয়ে সাইকেলে চলার পথ রুদ্ধ হয়ে যেত। আমরা ছোটরা বালুর মধ্যে কষ্ট করে সাইকেল চালাতে পারতাম না। চারদিক পানিতে তলিয়ে গেলে তবে বর্ষাকালে মূল রাস্তা দিয়েই স্কুলে যেতে হতো। সোভিয়েত আমলে কাবুলে যুদ্ধের সময় আমাদের দেশে ‘রক্তচোষা’ বের হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়েছিল। সে সময় যুদ্ধাহতদের চিকিৎসায় প্রচুর রক্ত প্রয়োজন বলে শিশুদের ধরে নিয়ে শরীর থেকে রক্ত বের করে নিয়ে ফ্যাকাসে বানিয়ে মেরে ফেলার গুজব শুনেছি। এ বিষয়ের সত্যাসত্য জানা হয়নি। তবে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে পাট বড় হয়ে গেলে বাঘডাসার আক্রমণে ছাগলের মৃত্যু একটি সাধারণ বিষয়। একসময় বাঘডাসারা সুযোগ পেলে ঘরের ঘুমন্ত শিশুকে মুখে কামড়িয়ে ধরে পালিয়ে যেত ও খেয়ে ফেলতো। এজন্য গ্রামে তখন ছেলেধরা আতঙ্ক বিরাজ করতো। তবে গেল বহু বছর ধরে এমন ঘটনা শোনা যায়নি।

গত ক’ মাস পূর্বে দেশে পদ্মা সেতুতে একলক্ষ মানব শিশুর কল্লা উৎসর্গ করতে হবে বলে যে গুজব ছড়িয়েছিল তা এখন ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। আমরা জানি যে কোন গুজব ছড়ানোর পিছনে মানুষের প্রেষণার সংযোগ থাকে। গুজব সব সময় আকর্ষনীয় ও দুর্বোধ্য বিষয়। এটা এমন একটা অনির্ভরযোগ্য ও বিকৃত তথ্য যা অসম্ভব দ্রুত গতিতে জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে যায়, কৌতুহল বাড়িয়ে দেয়, আতঙ্কগ্রস্থ করে, ব্যতিব্যস্ত করে। একজন অন্যজনকে আনন্দ দেয়ার জন্যই হোজ বা তাজ্জব করে দেয়ার জন্যই হোক্ গুজব সংক্রমিত হতে হতে বিকৃত রূপ ধারণ করে এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে জটিল অবস্থা তৈরী করে ফেলে। গুজব রটনাকারী অবচেতন মন থেকে শত্রুতাবশত: আজেবাজে কথা বা কারো বিরুদ্ধে কলঙ্ক রটানোর জন্যেও যুক্তি দিয়ে গুজব ছড়ান। যেহেতু গুজবের বিষয়টি বেশ আকর্ষনীয় ও দুর্বোধ্য তাই সেটা নতুনভাবে ছড়িয়ে দিয়ে কৃতিত্ব পেতে আরো নতুন নতুন তথ্য জুড়ে দেয়া হয়। এভাবে আরো দ্রুত শক্তিশালী কাহিনী হয়ে জনমনে স্থান করে নেয়। এটা একসময় ‘জেস্টাল্ট প্রিন্সিপাল’ বা সমগ্রবাদ নীতির রূপ ধারণ করে যার কোন প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। মানুষ এত করে ভীষন ভয় পায়, কষ্ট পায়, ক্ষতিগ্রস্থ হয়, কখনও রোমাঞ্চিত হয় কিন্তু বাস্তবে কোন কিছু চোখে দেখে না। অধিকিন্তু এটা পরবর্তীতে গণ-হিস্টিরিয়ার জন্ম দেয়।

একলক্ষ মানব শিশুর কল্লা নিয়ে যে গুজব ছড়িয়েছিল তা ইন্টারনেটের সুবাদে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় স্থান করে নিয়েছিল। নির্মাণকাজে এধরণের রক্ত, কল্লা প্রয়োজনের ধারণাগুলো প্রতিবেশী দেশের কিছু রাজ্যের মানুষেরা বেশি বিশ্বাস করে। নরবলিদান প্রথা থেকে এটা অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর কুসংস্কারের প্রচলন আছে। আমাদের দেশেও স্বল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত মানুষের মধ্যে এই ধরণের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস জায়গা করে নিয়েছে। এই বিশ্বাসকে পুঁজি করে এক শ্রেণির মানুষ নিজেদের হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে মাঠে নেমে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করার আদিম খেলায় মেতে উঠেছিল।

এর বাহ্যিক দিকটি সাদামাটাভাবে ব্যাখ্যা করা হলেও মনো:সামাজিক দিকটি বেশ রহস্যময় এবং এর ক্ষতিকর দিকগুলো খুবই ভয়াবহ। তাই এর মনো:সামাজিক দিকটির পিছনের কলকাঠি কে বা কারা নেড়েছে তা নিয়ে আশু ভাবা দরকার। কারণ সেতুর কাজ এখনও শেষ হয়নি।

অপরদিকে সারা দেশে সম্প্রতি বন্যায় ডুবে গেছে চাষের মাছের লক্ষ লক্ষ পুকুর। বদ্ধ পুকুর থেকে নিরীহ রুই কাতলারা ভেসে খাল-বিল নদী নালায় ঢুকে পড়লে ক্ষতি নেই। ভাবনার ভয়ংকর বিষয়টি হলো- আফ্রিকান বড় বড় রাক্ষুসে মাগুর মাছের বানের পানির সুবাদে পুকুর থেকে সট্কে পড়া নিয়ে। বন্যায় সুযোগ বুঝে পুকুর থেকে পালানো রাক্ষুসে মাগুরগুলো যেমন নিরীহ মৎস্যকুলের জন্য সাক্ষাৎ জুজু হয়ে আবির্ভুত হয়ে নদী-খাল বিলে সন্ত্রাসী ভুমিকা পালন করছে ঠিক তেমনি দেশের বড় বড় অপরাধী, দাগী আসামী, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা যেমন ঘুষ দিয়ে, গড ফাদারদের ছত্রছায়ায় আত্মগোপনে গিয়ে ‘পলাতক’ হয়ে গোপনে ব্যবসা চালিয়ে গুজব, সর্বভুক জুজুর আতঙ্ক ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

এ মুহুর্তে গুজব কিছুটা হলেও থেমেছে। কিন্তু গ্যাংরা থামেনি। কিশোর গ্যাং এ মুহুর্তে গা ঢাকা দিলেও শিক্ষিত-অশিক্ষেত ছাত্র-যুব গ্যাংরা নানা কায়দায় তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশের একটি বৃহত্তর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজের বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে অবৈধ বখরা আদায়ে ঘৃন্য ও কুৎসিত তৎপরতাগুলোর সংবাদ জাতি হিসেবে আমাদের মাথা হেঁট করে দিয়েছে। এরাই নাকি রাজনীতির সুতিকাধারী! এসব চাঁদাবাজরা লোকদেখানো লঘু শাস্তি পেয়েছে। এদের বিরুদ্ধে যথার্থ আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে উদাহরণ সৃষ্টি করা জরুরী। কারণ, এরা কিশোর গ্যাংএর চেয়ে বেশী ভয়ংকর গতিতে দুর্নীতি করে। এরাই অসীম লোভ-লালসা চরিতার্থ করে দ্রুত গতিতে সামাজিক অস্থিরতা তৈরী করে বিপদ সৃষ্টি করছে।

বন্যায় রাক্ষুসে মাগুর মাছের পুকুর থেকে পালানো বিষয়টি আমাদের খাল-বিলের নিরীহ দেশজ প্রজাতির মৎস্যকুলের জন্য ভয়ংকর। রাজনীতির চাঁদাবাজি এখন নিরীহ ছোটমাছের ভবিষ্যত প্রজন্ম রক্ষা করার ভাবনা বা তার চেয়ে বড় মহাবিপদ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে! কারন, চাঁদাবাজি একটি কুৎসিত বৃত্তি, চাঁদাবাজরা সর্বভুক। এরা সবকিছু গোগ্রাসে ভক্ষণ করে ফেলতে পারে। এসব রাক্ষুসে মাগুর সদৃশ রাষ্ট্রীয় চাঁদাবাজরা যেখানে বাস করে সেখানে অন্য কোন নিরীহ মাছের পক্ষে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এরা অন্য মাছের পোনাদের জন্য ছেলেধরা বৈ-কিছু নয়। তাই মৎস্যচাষীদেরকে নিজ উদ্যোগে সতর্কতার সাথে রাক্ষুসে মাগুরগুলোকে নিরীহ মাছের পুকুর-নিবাস থেকে আলাদা করে নিতে হবে ও এদেরকে দ্রুত ধরে খেয়ে ফেলতে হব্। তা না হলে আমাদের দেশের সম্পদ লুটেরাদের মত এসব রাক্ষুসে মাগুর নিজেরা মোটাতাজা হবে-ছোটদেরকে গ্রাস করে ফেলতে পারে। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও ঘাটে-মাঠে, অফিসে-বাজারে চাঁদাবাজির রাজনীতি বন্ধ করতে না পারলে রাক্ষুসে মাগুরদের মত এসব লাইসেন্সধারী চাঁদাবাজরা অন্যান্য নিরীহ সবাইকে উদরপূর্তি করে জাতির জন্য ঘোর অমানিশা তৈরী করে ফেলতে পারে। ওদেরকে সামাল দিতে না পারলে ওরাই হিরো হয়ে যাবে এবং দুর্নীতির লাগাম টানা বা ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ বুলি হয়েই থাকবে বৈ কি?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জাহিদ।