বিনিয়োগ কোথায় করবেন: ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, শেয়ারবাজার

আলী জামান:  অনেককে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুদহার আর সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে পেনশনহোল্ডার আর বয়স্ক নারী-পুরুষের বিনিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। আসল বিষয়টি কী? সঞ্চয়পত্র একটা সরকারি বন্ড। সরকারের একটা ঋণ ইনস্ট্রুমেন্ট। প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার সময় এই ঋণ নেবার টার্গেট ঠিক করা হয়। ‘বন্ড’ হবার কারণে নির্দিষ্ট হারে কুপন তথা সুদ পরিশোধ করতে হয়। আর সুদের হার ব্যাংক-আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রদত্ত সুদ থেকে অনেক বেশি হওয়ায় এভাবে ঋণ নিতে সরকারের স্বাভাবিকভাবে উত্সাহ থাকার কথা নয়। তাই এই সুযোগ ধীরে ধীরে কমে আসছে। এর বিপরীতে বেসরকারি খাতের কিছু বন্ড বাজারে থাকলেও, আর সেগুলো মোটামুটিহারে সুদ দিলেও প্রচার-প্রচারণার অভাবে এই বন্ড জনপ্রিয়তা পায়নি।

তাহলে প্রশ্ন— সাধারন মানুষ বিনিয়োগ করবে কোথায়? বিনিয়োগ না করতে পারলে, আর সেখান থেকে মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে বেশি লাভ না করতে পারলে তো তার রিয়েল ইনকাম হারিয়ে যাবে। প্রকৃত পুঁজি নষ্ট হবে। পৃথিবীব্যাপী ব্যাংকের ঋণের সুদহার এখন সিঙ্গেল ডিজিটে। আর সে কারণে ব্যাংকগুলো স্বাভাবিকভাবেই আমানতের সুদহার কম রাখতে চায়। তাই আমানতের সুদহার এখন কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান তথা লিজিং কোম্পানিগুলোর ঘোষিত আমানতের সুদহার বেশি হলেও সেগুলোতে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে একটি লিজিং কোম্পানি বন্ধ ঘোষণা হয়েছে। আরো কয়েকটি ধুঁকছে। যে কোনো সময়ে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তা হলে সাধারণ মানুষ বিনিয়োগ করবে কোথায়? বিকল্প একমাত্র শেয়ারবাজার। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ যে ঝুঁকিপূর্ণ তা সবাই জানলেও আধুনিককালে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (ফাইন্যান্স বিষয়ে) ব্যবহার করে ঝুঁকি অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কোম্পানি যদি দেউলিয়া না হয়, তবে বিনিয়োগ মোটামুটিভাবে নিরাপদ থাকে। রবীন্দ্রনাথ, শরত্চন্দ্রসহ অনেকের লেখা গল্প-উপন্যাসে আমরা যে ‘কোম্পানির কাগজ’-এর কথা পড়েছি, তা আর কিছু নয়— ‘শেয়ার’।

এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— এই বিনিয়োগে সরকারের ভূমিকা কী? সরকার কী বিনিয়োজিত পুঁজির নিরাপত্তা দেয়? উত্তর হলো— সরাসরিভাবে না দিলেও পরোক্ষভাবে দেয়। দেশে দেশে সরকারের যতগুলো রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান থাকে, তার মধ্যে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’কে সবচেয়ে গুরুত্ববহ মনে করা হয়। দুঃখের বিষয়, আমাদের দেশের পুঁজিবাজার তেমন ‘ম্যাচিউরড’ নয়, আর এখানকার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও আজঅবধি জনসাধারণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। পুঁজিবাদী আর্থিক ব্যবস্থায় স্টক এক্সচেঞ্জ অপরিহার্য। এখন কেবল পুঁজিবাদী দেশগুলোতেই নয়, সমাজতান্ত্রিক— এমন কী ইসলামী রাষ্ট্রগুলোতেও স্টক এক্সচেঞ্জ রয়েছে। মস্কো, সাংহাই, তেহরানের স্টক এক্সচেঞ্জ অনেক বড়ো, আর সেগুলো ব্যাপকভাবে ঐ দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করেছে।

আর একটি বিষয় না বললেই নয়। এখন দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। কিন্তু কেন? এর প্রধান কারণ কিন্তু কেবল চুরি-দুর্নীতিই নয়। মূল কারণ হলো বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেয়, আর মূলত শিল্পে বিনিয়োগ করে দীর্ঘমেয়াদে। বড়ো বড়ো শিল্পগ্রুপের নেয়া ঋণ একবার খেলাপি হয়ে গেলে, ব্যাংকটি ঝুঁকিতে পড়ে। যা এখন দৃশ্যমান।

শিল্পের পুঁজি মূলত শেয়ার বাজার থেকে আসে। আমাদের দেশেও এই অবস্থা কিছুটা বিরাজ করলেও দেখা গেছে, আইপিওর মাধ্যমে পাবলিকের কাছ থেকে তোলা পুঁজি প্রায় পানিতে পড়েছে। বাছবিচার না করে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ আইপিওগুলো অনুমোদন করায় প্রথমদিকে সেই শেয়ারগুলো লাফালাফি করলেও, শেষ পর্যন্ত তা ডুবে গেছে। মানুষ সেকেন্ডারি বাজার থেকে সেই শেয়ারগুলো কেনার পর আজ পুঁজি হারাতে বসেছে।

এর সমাধান কি? সমাধান সরকারের হাতে। রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে যদি যোগ্য প্রফেশনালদের দিয়ে সামগ্রিক ব্যবস্থাটি পরিচালনা করা যায়, তবে সাফল্য না আসার কারণ দেখি না।

লেখক: সভাপতি, এসএমই ওনার্স এসোসিয়েশন ।