নারীদের জন্য মেডিটেশন ভীষণ জরুরি

নিউজ ডেস্ক:  আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীরা পুরুষের তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে আছেন। অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নারীরা এখনো সারা পৃথিবীতে বিশেষত বাংলাদেশে পুরুষের সমমর্যাদায় পৌঁছাতে পারেননি। শহর এলাকাগুলোতে নারীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বড় ডিগ্রি নিচ্ছেন, লেখাপড়া শেষে নিজের কর্মসংস্থানে যুক্ত হচ্ছেন। শহর এলাকাগুলোতে এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বা শহরেও অনেক নারী এখনো পিছিয়ে আছেন। প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের জায়গা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র এখনো পুরুষের হাতে। যতদিন পর্যন্ত নারী পুরুষের মাঝে সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে না, ততদিন পর্যন্ত নারীরা পেছনেই পড়ে থাকবে। আমাদের দেশে অভাবী ও প্রতিষ্ঠিত অসংখ্য নারীর এখনো নেই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ক্ষমতা। পারিবারিক শান্তি টিকিয়ে রাখার জন্য এখনো অনেকেই বিভিন্ন ধরনের মানসিক আঘাত নীরবে সহ্য করেন। বছরের পর বছর এই ধরনের পরিস্থিতি বাড়িয়ে তোলে মানসিক চাপ। অসহ্য মানসিক চাপ বাড়িয়ে তোলে হ্রদরোগের ঝুঁকি, তৈরি করে উচ্চ রক্তচাপ। অনেক নারী কম বয়সে ডায়াবেটিসেও ভোগেন। দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ রক্তে ডায়াবেটো-জেনিক হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ডায়াবেটো-জেনিক হরমোন ডায়াবেটিস তৈরির অন্যতম প্রধান একটি ফ্যাক্টর বা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে রক্ষার জন্য মানসিক চাপ মুক্ত থাকাটা ভীষণ জরুরি। এই জন্য দরকার ধ্যান বা মেডিটেশন।
আমাদের দেশের শহরাঞ্চলের খুব সচেতন কিছু নারী ধ্যান বা মেডিটেশন করেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। আর গ্রামাঞ্চলের নারীরা খুব বেশি বঞ্চিত। মেডিটেশনের নামটাই হয়তো তারা সারাজীবনে শোনেননি।

আমাদের সবাইকে ধ্যান বা মেডিটেশনের গুরুত্ব সম্পর্কে বুঝতে হবে। আমরা যদি নারী পুরুষ সবার মাঝে মেডিটেশন ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে অনেক মানুষ উপকৃত হবে।

মেডিটেশন বা ধ্যান মস্তিষ্কের জন্য ভীষণ উপকারী। আমাদের মস্তিষ্ক সব সময় কাজ করতেই থাকে। আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি তখনো কাজ করতেই থাকে। মস্তিষ্ক সারা দেহের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। অর্থাৎ বিরামহীন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। আমাদের ঘুমানোর সময়, চোখ বন্ধ করে রাখার সময় বা ধ্যান করার সময় মস্তিষ্কের বিশ্রাম হয়। এই বিশ্রামের ফলে মস্তিষ্কের কার্য ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তখন সারা দেহের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হয়ে ওঠে আরো বেশি শক্তিশালী। প্রতিটি মানুষকেই তার ধর্ম কর্ম বা মেডিটেশন করা উচিৎ। ধর্ম মানুষকে দেয় মানসিক প্রশান্তি। বাড়িয়ে দেয় তার কাজ করার স্পৃহা। মানুষ মানসিকভাবে যত বেশি শক্ত হবে, তার কাজ করার শক্তি ততটাই বাড়তে থাকবে।

ধর্মের কিছু কাজ, ধ্যান বা মেডিটেশনের সময় মানুষ চোখ বন্ধ করে রাখে। ফলে চোখ, কপাল, ঘাড়, মাথা, চোখের চারপাশের স্নায়ু ও মাংসপেশীর বিশ্রাম হয়। ধ্যানের সময় মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষেরও বিশ্রাম হয়। তখন মাথা ব্যথা, ঘাড়ে ব্যথাও কমে। মস্তিষ্কের প্রতিটি প্রান্তে অক্সিজেন পৌঁছে যায়। এই অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত শিরা উপশিরার মাধ্যমে সারা দেহে সঞ্চালিত হয়। এতে দেহের অন্যান্য অঙ্গগুলোরও পুষ্টি হয়। অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত দেহের কার্যক্ষমতা বাড়ায়। পরিণামে কমে যায় স্ট্রেস হরমোন বা ডায়াবেটোজেনিক হরমোন।
নারী পুরুষ সকল পরিণত বয়সের মানুষের জন্য মেডিটেশন ভীষণ জরুরি। আমাদের উচিৎ কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিজেরা ধ্যান করা, আত্মীয় স্বজনকে, প্রতিবেশী পরিচিতদের ধ্যানে উৎসাহিত করা।

মস্তিষ্কের বিশ্রাম হলে, মস্তিষ্কে অক্সিজেনের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন মস্তিষ্কে অক্সিজেন সমৃদ্ধ রক্ত, পুরো দেহ সঞ্চালিত হয়। এতে দেহের অন্যান্য অঙ্গগুলোও পুষ্টি পায়। তখন মানুষের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মস্তিষ্কের সঠিক ভাবে বিশ্রামের ফলে উচ্চরক্ত চাপও নিয়ন্ত্রণে আসে। চোখের স্নায়ুগুলোর বিশ্রাম হয়। চোখবন্ধ করে ধ্যান করার সময় চোখের মাংশপেশীরও বিশ্রাম হয়। নিয়মিত ধ্যান নামাজ বা মেডিটেশন করলে, হ্রদরোগের ঝুঁকিও কমে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত মেডিটেশন বা ধ্যান করেন, ধর্ম কর্ম করেন, তাদের রক্তে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয় কম।

এই স্ট্রেস হরমোন হ্রদরোগে, উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোকের ঝুঁকির জন্য দায়ী। স্ট্রেস হরমোন যত কমবে মানুষের ত্বকও সুন্দর থাকবে। ধ্যান মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। তখন মানুষ কোন আঘাত পেলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা বা ধ্যান করার সময় আমাদের মাথা মুখ, ঘাড়, পিঠের মাংসপেশীরও বিশ্রাম হয়। তখন ঘাড়ে ব্যথাও কমে যায়। তাই ধর্ম কর্ম, মেডিটেশন হোক আমাদের নিত্য সঙ্গী।

মেডিটেশনের গুরুত্ব সম্পর্কে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের মহাজাতক সব সময় বলেন প্রতিটি মানুষকে নিয়মিত মেডিটেশন করার জন্য। ধ্যান মানুষকে তার মন ও চিন্তা চেতনা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে, বাড়িয়ে তোলে আত্মবিশ্বাস।

প্রতিযোগিতার তীব্র দৌড়ে জয়ী হবার জন্য সবার উচিৎ নিয়মিত ধ্যান করা।

লেখক: ডা. ফারহানা মোবিন।