সনাতন ধর্মে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ

সুমন দত্ত: সনাতন ধর্মে শ্রী কৃষ্ণ সর্বব্যাপী । ধর্মে, অনুষ্ঠানে, আচারে, জীবন পরিচালনায় শ্রী কৃষ্ণ ভিন্ন জীবন অচল। এমন একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী পাওয়া যবে না যিনি শ্রী কৃষ্ণ অনুরাগী নন। শ্রী কৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান, মানুষের প্রয়োজনে দেহ ধারণ করেছেন। বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে শ্রী কৃষ্ণই একমাত্র অবতার যিনি ভগবানের সব শক্তি ও গুণ নিয়ে এ পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পুরো জীবন পর্যালোচনা করলে এসব সত্য প্রমাণিত হয়।

মানুষের মাঝে আদর্শ পুরুষের প্রতীক স্বরূপ তার জীবন বিধৃত হয়েছে। এই পুরুষোত্তম শ্রী কৃষ্ণের জীবন বৃত্তান্ত বহু গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন ভাগবত, মহাভারত, হরি-বংশ, ব্রহ্মপুরাণ, পদ্ম পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ, বায়ু পুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ, স্কুন্ধপুরাণ, বামন পুরাণ, কূর্মপুরান।

শ্রী কৃষ্ণের সম্পূর্ণ জীবনকে যেভাবে ভাগ করা যেতে পারে:

ক. বাল্যকাল
খ. মথুরা বাসকাল (শিক্ষার্থী শ্রীকৃষ্ণ)
গ. দ্বারকায় বাস শ্রীকৃষ্ণ ( রাজা শ্রীকৃষ্ণ)
ঘ. মহাভারতে ধর্ম রাজ্যর স্থাপনে শ্রীকৃষ্ণ (রাজনীতিবিদ শ্রীকৃষ্ণ)
ঙ. লীলাময় শ্রীকৃষ্ণ ( প্রাণের শ্রীকৃষ্ণ)
চ. শ্রী কৃষ্ণে শেষ জীবন

যারা ব্যক্তির বিশেষের আত্মজীবনী লেখেন তারা সাধারণত বাল্য কাল থেকে লেখা শুরু করে শেষ জীবন পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে লিখে যান। যাতে পাঠকরা একটি জীবনী গ্রন্থ পড়েই সেই ব্যক্তির সমগ্র জীবনের চিত্র এক সঙ্গে পেয়ে যান। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের জীবনে এই রূপ ঘটলে উপরোক্ত প্রশ্ন গুলোর অবতারণা হতো না। শ্রীকৃষ্ণের জীবন এতো ঘটনা পূর্ণ এবং সেসব ঘটনা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে বিভিন্ন রূপে মনে হয়েছে বলেই বিভিন্নজন বিভিন্ন গ্রন্থ লেখার প্রয়াস পেয়েছেন।

কেবল মাত্র মহিষী কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস তার একটি ক্রমানুযায়ী জীবন বৃত্তান্ত লেখার প্রয়াস পেয়েছেন। তাও একের উপর অপরের প্রভাব মুক্ত হয়নি। শুধুমাত্র শ্রীমদ্ভাগবতের শ্রী কৃষ্ণই আর সব গ্রন্থের প্রভাব মুক্ত হয়েছে।

শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকাল এমনিতেই মধুর, তার মধ্যে ঈশ্বরত্ব আরোপে আরো মধুরতর হয়েছে। আমরা শ্রীকৃষ্ণের বাল্যকালে দেখি, তিনি গোপ গোপিনীদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। কখনও প্রশ্ন করিনা কারা এই গোপ গোপিনী। পূর্বজন্মে এই গোপ গোপিনীরা ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর ভক্তকুল। ভগবানের সান্নিধ্য পেতে তারা কঠিন তপ করেছিল। সেই তপে ভগবান তুষ্ট হয়ে তাদের বর দিতে চাইলেন। সবাই বর হিসেবে চাইলেন ভগবানের সঙ্গে তারা খেলাধুলা করবেন,ঘুরে বেড়াবেন, আনন্দ ফুর্তি করে সময় কাটাবেন। তাদের সেই ইচ্ছা পূরণ করতে হলে ভগবানকে অনেকবার জন্ম নিতে হতো। তাই ভগবান বিষ্ণু তার অষ্টম (শ্রী কৃষ্ণ) অবতারে এই ঋষি মহাপুরুষরা গোপ গোপিনী হিসেবে পুনরায় জন্ম নেন।

শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে দশ বছর আট মাস ছিলেন। এরপর কংসের সেনাপতি অক্রূর শ্রীকৃষ্ণকে ও তার বড় ভাই বলরাম সঙ্গে করে মথুরায় নিয়ে আসেন। সেখানে কংসকে বধ করেন। এরপর কংসের পিতা উগ্র-সেনকে রাজা করেন। মথুরার শাসন ভার বৃদ্ধ উগ্রসেনের হাতে দিয়ে, দুই ভাই সন্দীপনি মুনির পাঠশালায় লেখা পড়া করার জন্য চলে গেলেন । সন্দীপনির আশ্রমে ভগবান গেলেন ঠিকই কিন্তু তিনি সেখানে যা শিখলেন সেটা তিনি আগেই জানতেন। কারণ ভগবান এসব গ্রন্থের স্রষ্টা। বরং তিনি আরো কিছু করে দেখালেন সেখানে। সন্দীপনি মুনি অবাক হয়ে গেলেন শ্রীকৃষ্ণ বলরাম এত সহজে কীভাবে সবকিছু শিখে ফেলছে।

পাঠ শেষে শ্রীকৃষ্ণ গুরু সন্দীপনিকে দক্ষিণা দিতে চাইলেন। দক্ষিণা হিসেবে কী নেবেন সেটা বুঝতে পারলেন না সন্দীপনি। তার স্ত্রী তাদের কাছে বহু বছর আগে সাগরে নিখোঁজ একমাত্র সন্তানকে চাইলেন। সন্দীপনি মুনির সেই ছেলে মরে গিয়ে যমের কাছে চলে গেছে। ওই মুহূর্তে শ্রী কৃষ্ণ বলরাম যমের কাছ থেকে সন্দীপনির ছেলেকে এনে দিলেন। এটাই ছিল শ্রীকৃষ্ণের গুরু দক্ষিণা। গুরুভক্তির জন্যই এ কাজটি করলেন ভগবান শ্রী কৃষ্ণ। অথচ এ ক্ষমতা তিনি বার বার ব্যবহার করেননি। জন্ম নিলে মৃত্যু হবে এই বিধান তিনি মেনে চলেছেন পরবর্তীতে।

বৃদ্ধ উগ্র-সেন অশক্ত হওয়াতে শ্রীকৃষ্ণ লেখা পড়া শেষ করে পুনরায় মথুরার শাসন ভার গ্রহণ করতে হয়।

এদিকে কংসের শ্বশুর মহাবীর জরাসন্ধ শ্রী কৃষ্ণকে মারবার জন্য বার বার মথুরা আক্রমণ করে। শ্রী কৃষ্ণ চিন্তা করলেন যে, যতদিন আমি মথুরা থাকবো ততদিন জরাসন্ধ মথুরা আক্রমণ করে মথুরা বাসীদের বিপর্যস্ত করবে। তাই জরাসন্ধের হাত থেকে মথুরাবাসী কে বাঁচাতে দুই ভাই চলে গেলেন দ্বারকায়।

দ্বারকায় গিয়ে রাজত্ব স্থাপন করে সমগ্র ভারতে একটি অখণ্ড ধর্ম-রাজ্যে স্থাপনের বিষয় তিনি চিন্তা করলেন। সে চিন্তার ফলশ্রুতি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ -গীতার আবির্ভাব । এ সময়ে শ্রী কৃষ্ণের বয়স হয়েছিলো ৮৯ বছর। সেই মহাভারতের যুগে শ্রী কৃষ্ণ শকুনির মত ধূর্ত রাজনীতিবিদকে কীভাবে ঘোল খাইয়েছিলেন তা দেখলে যে কারোর মনে তার রাজনৈতিক চরিত্রটি ফুটে উঠবে। এক শ্রীকৃষ্ণের বুদ্ধিতেই পাণ্ডবরা জিতে আর হেরে যায় সমগ্র কৌরবকুল। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষে পাণ্ডবগণ যখন স্বরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হলেন তখন শ্রী কৃষ্ণ আবার চলে এলেন দ্বারকায় এবং তার শেষ জীবন দ্বারকায়ই কেটেছিলো।

শ্রী কৃষ্ণের ১২৫ বছর জীবনকাল দীর্ঘ সময়। শ্রী কৃষ্ণের জীবন কর্ম-বহুল ছিলো বলে তার ভক্তগণ তাকে নিয়ে নানা রূপ কাহিনীর সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। সেসব কাহিনী বিবৃত হয়েছে পুরাণাদিতে এবং সেসব কাহিনী প্রায় সবই তার ঐশ্বরিক শক্তি সম্পন্ন লীলা কাহিনী।

স্বধর্ম নিষ্ঠ, তীক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন রাজনীতিবিদ, ভূগোলবিদ, ভক্ত-রক্ষাকারী , দুর্জনের শমন, লৌকিক জ্ঞান সম্পন্ন কৃষ্ণকে পাওয়া যায় মহাভারতে।

যারা লীলাময় শ্রীকৃষ্ণকে পেতে চান তারা পুরাণাদি পাঠে তাকে খুঁজে পাবেন। মধুর শ্রীকৃষ্ণকে পেতে হলে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। যদিও এটি পুরাণরই অন্তর্গত। শ্রী কৃষ্ণের শেষ জীবনটি বিধৃত হয়েছে হরি-বংশে। শ্রী কৃষ্ণকে শ্রী বিষ্ণুও বলা হয়। বিষ্ণু শব্দের অর্থ সর্বব্যাপী বা ব্যাপীত্ব। বিষ্ণু-তিনি সর্বত্রই আছেন এ অর্থে একমাত্র ঈশ্বরই সর্বব্যাপী । বিষ্ণু অপত্য অর্থে ” বৈষ্ণব” শব্দটির নিষ্পন্ন হয়। তাই ঈশ্বরের সন্তান হিসাবে সকলই বৈষ্ণব। পৃথিবীতে যত প্রাণী , স্থাবর জঙ্গমাদি আছে সবই বিষ্ণুর অংশ হিসাবে বৈষ্ণব আখ্যা পেতে পারে।

কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় শ্রী কৃষ্ণ ভজনকারীগণ নিজেদেরকে বৈষ্ণব আখ্যা দিয়ে থাকেন। এছাড়াও যারা ফোটা তিলক কেটে নিরামিষ ভোজন করে রাধা কৃষ্ণের নাম কীর্তন করে জীবন কাটান তারাও বৈষ্ণব বলে আখ্যায়িত হোন। আধুনিক কালে মহাপ্রভু চৈতন্যদেব নতুন করে বৈষ্ণবদের সংজ্ঞা নির্ধারিত করেন। যারা মহাপ্রভুর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেন, তারা বৈষ্ণব বলে আখ্যায়িত হলেন। এই রূপ ভাবে বৈষ্ণব শব্দের ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা দিয়ে সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হলো।

সূত্র: প্রখ্যাত হিন্দু শাস্ত্রবিদ প্রয়াত শিব শংকর চক্রবর্তী ও হিন্দু বইপুস্তক থেকে।

লেখক: সাংবাদিক

ঢাকানিউজ24ডটকমে প্রকাশিত