শ্রীপুরে পাবলিক প্লেসে ধূমপানে অতিষ্ঠ যাত্রীরা

আলফাজ সরকার আকাশ, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: রেলওয়ে স্টেশনের প্লাটফর্মেই কতক চা দোকানে কিছু পোস্টার সাঁটা। বাংলায় লেখা- বেনসন ১১ টাকা। অন্যগুলোও মূলত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের মূল্য নির্ধারণী পোস্টার। সেখান থেকে সিগারেট কিনে সুখটান দিতে থাকলেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। একটু সামনেই মনের সুখে টানছেন আরেক চাকরিজীবী।

যাত্রী ছাউনির নিচে দেয়া ফ্যানের বাতাসে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিতে দিতে ট্রেনের অপেক্ষা করছেন তারা। তাদের চারপাশে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন আরো শত শত নারী-শিশু। প্রায়ই এমন দৃশ্য চোখে পড়ে গাজীপুরের শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশন প্লাটফর্মে।

২০ আগস্ট মঙ্গলবার সকালে রেলওয়ে স্টেশনে এমন অবাক হওয়া দৃশ্য দেখা যায়।

রেলওয়ে স্টেশন ছাড়াও জনবহুল প্রায়ই স্থানে এমন দৃশ্য অহরহ চোখে পড়ে।

আব্দুল আউয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সমাজকর্ম বিষয়ের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ফরহাদ তালুকদার জানান, বড়দের চেয়ে এখন স্কুল পড়ুয়া শিশুদের মধ্যে ধূমপানে আসক্তের পরিমাণ বেশি। বাজারের টং দোকানের কোনায় দাঁড়িয়ে স্কুল পালিয়ে সিগারেট টানতে দেখা যায় অনেক শিশুকে।

পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধে কোন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা তা জানতে চেয়ে রুল জারি হয়েছিল হাইকোর্টে।

গত ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রিট আবেদনটি দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাম্মী আক্তার। রিট করার আগে এ আইনজীবী সংশ্লিষ্টদের একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। সে নোটিশের যথাযথ জবাব না পাওয়ায় রিট করা হয়।
ধূমপান ও তামাকজাতদ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ, সংশোধন) আইন ২০১৩ এর ২ (চ) ধারাতে ২৩টি স্থানকে পাবলিক প্লেস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। স্থানগুলো হলো—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি অফিস, গ্রন্থাগার, লিফট, আচ্ছাদিত কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, আদালত, বিমান বন্দর, সমুদ্রবন্দর, নৌবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাসটার্মিাল, প্রেক্ষাগৃহ, প্রদশর্নী কেন্দ্র, থিয়েটার হল, বিপনী প্রতিষ্ঠান, চতুর্দিকে দেয়াল দ্বারা আবদ্ধ রেস্টুরেন্ট, পাবলিক টয়লেট, শিশুপার্ক, মেলা বা পাবলিক পরিবহনে আরোহণের জন্য যাত্রীদের অপেক্ষার নির্দিষ্ট সারি, জনসাধারণ কর্তৃক সম্মিলিতভাবে ব্যবহার্য অন্য কোনও স্থান অথবা সরকার বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা ঘোষিত অন্য কোনও স্থান।

ওই আইনে পাবলিক প্লেসে নিজ-নিজ প্রতিষ্ঠানের উন্মুক্ত স্থানে ধূমপানমুক্ত স্থানের সতর্কীকরণ নোটিশ (ধুমপান হইতে বিরত থাকুন, এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ) বা ধূমপানমুক্ত সাইন বোর্ড স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া আছে। কিন্তু এই নির্দেশনা না মানলে ও আইন ভঙ্গ করলে দণ্ডনীয় অপরাধ বিবেচ্য করে অর্থদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তির বিধান থাকলেও এ স্টেশনের কোথাও এমন কিছু চোখে পড়েনি।

পাবলিক প্লেসে ধূমপানের অপরাধ স্বীকার করে একজন ধূমপায়ী বলেন, আমি একা বন্ধ করলে তো আর সারা দেশে বন্ধ হবে না। আমার মতো লাখো লাখো মানুষ পাবলিক প্রেসে ধূমপান করছেন। কই কোন শাস্তি দেখিনি তো। শুনেছি আইন আছে ৩০০ টাকা জরিমানার। কিন্তু জরিমানাটা নেবে কে? যারা নিবে তারাও তো পাবলিক প্লেসে হরদম সিগারেট ফুঁকছে।

একই রকম সুর পাওয়া যায় স্থানীয় এক কলেজের শিক্ষার্থীর কথায়। বছর খানেক ধরে সিগারেটে আসক্ত হয়ে পড়া ওই ছাত্র বলেন, প্রকাশ্যে ধূমপানের জন্য জরিমানার আইন আছে বলে শুনেছি। কিন্তু কাউকে জরিমানা করা হয়েছে বলে দেখি নাই। সরকারের ফোর্স করলে ধূমপায়ীদের অাইনের প্রতি আরো শ্রদ্ধাশীল তো হতেই হবে।

শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মইনুল হক খান জানান, তামাক মূলত হৃৎপিণ্ড, লিভার ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। ধূমপানের ফলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD) (এমফাইসিমা ও ক্রনিক ব্রংকাইটিস সহ), ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়।তামাকের কারনে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রান্তীয় রক্তনালীর রোগ দেখা দিতে পারে।

এদিকে,পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত তামাকজাত ধোঁয়া ও পরোক্ষ ধূমপানও সকল বয়সী ব্যক্তির ক্ষেত্রে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এরমধ্যে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের উপর তামাকের ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। ধূমপায়ী নারীদের ক্ষেত্রে গর্ভপাত ঘটার হার বেশি। এছাড়া গর্ভস্থ ভ্রূণেরও অনেক ক্ষতি করে যেমন অকালে শিশুর জন্ম হওয়া, জন্মের সময় নবজাতকের ওজন আদর্শ ওজনের তুলনায় কম হওয়া। এছাড়াও অধূমপায়ীদের তুলনায় ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে যৌন দুর্বলতার সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার হার ৮৫% বেশি বলেও জানান তিনি।

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ শামসুল আরেফিন বলেন, পাবলিক প্লেসে ধূমপান বন্ধে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি আইনের প্রতি সকলকেই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গিতে আনতে হবে পরিবর্তন। কার্যত পাবলিক প্লেসে প্রকাশ্যে ধূমপানের শাস্তি ৩০০ ‍টাকা জরিমানা। এ আইন বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট ‘পাবলিক প্লেসের’ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

ঢাকানিউজ২৪ডটকম/জাহিদ।