একলা চলার মানুষ মুর্তজা বশীর

শিল্পী মুর্তজা বশীরের জন্মদিনে মাহবুব রেজা এর একলা চলার মানুষ মুর্তজা বশীর ।

এক
তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়ের পর্বটি বেশ নাটুকে ধরণের ছিল। বছর দশেক আগের কোনো এক সন্ধ্যায় আমি গিয়েছি গ্রিন রোডের এক হাসপাতালে আমার কিছু টেস্টের রিপোর্ট আনার জন্য।
লম্বা লাইন। বসে আছি সারিবদ্ধ লাল সবুজ রঙের প্লাস্টিকের চেয়ারে। দেয়ালে টেলিভিশন ঝুলছে। রিপোর্ট নিতে আসা মানুষজন উপায়ান্তর না দেখে ঝোলানো টিভিতে এনিম্যাল প্ল্যানেটের জীবজন্তুদের দেখছে।
আমিও দেখছি।

এর মধ্যে হঠাৎ আমার চোখ পড়ল তাঁর দিকে।
তিনি হাতে রিপোর্ট নিয়ে একটা চেয়ারে বসে আছেন। তাঁকে একী সঙ্গে চিন্তিত এবং গম্ভীর দেখাচ্ছিল।
তিনি কি ইচ্ছের বিরুদ্ধে টিভি দেখছেন? মনে হলো আমার।
তাঁকে দেখে আমি আমার সাহসের ওপর সমীহ করে এগিয়ে গেলাম তাঁর দিকে। আর একথা কে না জানে যে বোকাদের সাহস বেশি থাকে। জন্মসূত্রে বিধাতা আমাকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করলেও এই একটি জিনিস থেকে একেবারেই বঞ্চিত করেন নি।

ইতালিতে থাকার সময় আমি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু পড়ে ফেলেছিলাম বিশেষ করে তাঁর ৫২-৫৩ সালের দিকে ছবি আঁকার জন্য ইতালি চলে যাওয়া। সেখানে কঠিন পরিশ্রম, প্রেম, যাযাবরের মতো ঘোরাফেরা- সেই জীবনের খানিকটা শিল্পী আমিনুল ইসলামের বাংলাদেশের শিল্পকলার ৫০ বছর বইয়ের সুবাদে জেনেছি। এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁর বন্ধু শিল্পী রশিদ চৌধুরী, নভেরা, হামিদুর রহমান- এই তিনের সঙ্গে তাঁর জড়িয়ে থাকা অনেক স্মৃতির কথা, ঘটনার কথা রয়েছে বইতে।

তাঁকে সেই সন্ধ্যাবেলায় হাসপাতালের চেয়ারে বসে থাকতে দেখে সব জিনিস মনের পর্দায় ভেসে উঠল। একটু স্মৃতিকাতরও হলাম। চোখের সামনে যেন সব দেখছিলাম।
তাঁর সঙ্গে কথা বলার লোভ হলো।

আগে থেকে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। তবে তাঁর আশেপাশের মানুষজনের কাছ থেকে যতটুকু জেনেছি তিনি নাকি অসম্ভব রকমের রাশভারী ধরনের মানুষ। সবার সঙ্গে খুব একটা কথা টথা বলেন না। আর বললেও ‘হু হা’ পর্যন্তই।

দুই
আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
আমাকে অমন তারখাম্বার মতন তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া দেখে তিনি চোখ ঈষৎ লাল করেই আমার দিকে তাকালেন।
আমি বোকার মতো তাঁকে বললাম,
‘সিনোরে, বুওনো ছেরা, কমে ভা?’
(জনাব, শুভ সন্ধ্যে, আপনি ভালো আছেন?)

আমার দ্রুত ভঙ্গিতে বলা কথা তিনি সম্ভবত শুনতে পেলেন না। কিংবা শুনতে পালেও হয়ত ঠিকমত বুঝতে পারলেন না।
আর বুঝবেনই বা কেমন করে!
পঞ্চাশ-ছাপ্পান্ন বছর আগে তিনি ইতালি ছেড়ে চলে এসেছেন দেশে।এতবছর পর তিনি হয়ত সেই ভাষাটা ঠিকমত শুনতে পান নি। আর শুনতে পেলেও হয়ত বুঝতে পারেন নি।
তিনি আমার দিকে ভালো করে তাকালেন আবার,
‘কি বললেন? বুওনো ছেরা!’
‘এজাতো-‘
(ঠিক ধরেছেন)

তিনি বুঝতে পারলেন যে আমি তাঁর মতো একজন রাশভারী টাইপের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্যই কায়দা করে ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলেছি। তিনি কঠিন চেহারায় একটু হাসলেন। তাঁর হাসির ভেতর শিশুসুলভ একধরনের সারল্য খুঁজে পেলাম। সাধারনত কঠিন চেহারার মানুষরা হাসলে তাদের খুব একটা সুন্দর দেখায় না। কিন্তু তাঁকে সুন্দর দেখাল।
তারপর তাঁর সঙ্গে অনেক কথা হলো।
কয়েকবার সাক্ষাৎকারও নেয়া হলো।

তাঁর বাসায় গিয়েছি অনেকবার। একবার তিনি আমাকে শিল্পী ধ্রুব এষকে তাঁর কাছে নিয়ে যেতে বললেন। ধ্রুবকে নিয়ে গেলে তিনি অবাক হয়ে ধ্রুব’র দিকে তাকিয়ে রইলেন। ধ্রুব সালাম জানাতেই তিনি বললেন,
‘আরে! তোমাকে দেখেই তো মন ভরে গেল আমার।’

তিন
এখনো মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে কথা হয়।
প্রিয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না।
মন খারাপ করে থাকেন সব সময়।
ফোন করলে কথা বলেন এমনভাবে যেন মনে হয় তিনি বুঝি খুব কাছে মানুষ।

নিজের কাজ নিয়ে কথা বলতে তিনি এখনো লজ্জা পান। শিল্পকর্ম ছাড়াও গল্প, উপন্যাস, কবিতাও লিখেছেন বেশ। অসম্ভব শক্তিশালী গদ্যে লিখেছেন কয়েকটি উপন্যাস। গল্প। যেখানে তাঁকে পাওয়া যায় তাঁর মতো করেই। শিল্প সমালোচকরা বলছেন, শিল্পী মুর্তজা বশীর যদি ছবি না এঁকে যদি শুধু কথাসাহিত্যে থাকতেন তাহলেও তিনি নিজের জায়গা করে নিতে পারতেন।

খুব বেখেয়ালি আর নিজের মতো করে চলতে ফিরতে পছন্দ করেন। সারাজীবন তা-ই করেছেন। সমসাময়িক অনেকেই বিভিন্ন হাউজের কাছে, বিভিন্ন মহলের কাছে নিজেদের বন্ধকী সম্পদে পরিণত করলেও তিনি ছিলেন এর বিরুদ্ধে যে কারণে তাঁর প্রাপ্তিযোগও অনেকের তুলনায় সামান্য। কিন্তু তাতে তাঁর কোনো খেদ নেই। ক্ষোভও নেই। তিনি একলা চলার মানুষ।
চার
আজ এই একলা চলার মানুষটির জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন স্যার, আপনাকে।
১৭ আগস্ট, ২০১৯