হজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত কিছু ঐতিহ্যবাহী স্থান

নিউজ ডেস্ক:  ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হজ। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। আর এই ফরজ কাজটি করতে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে ২০-২২ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান জমায়েত হন সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে। হিজরি সনের জিলহজ মাসের ৯ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় পবিত্র হজ। এর আগে পরে মোট ৫/৬ দিন চলে এর আনুষ্ঠানিকতা।

জিলহজ মাসের ৭ তারিখ সন্ধ্যায় মক্কা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে তাঁবুর শহর-খ্যাত মিনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা। আবার ১২/১৩ জিলহজ মিনা থেকে মক্কায় ফিরে কাবা শরীফে বিদায় তাওয়াফের মাধ্যমে শেষ হয় হজের আনুষ্ঠানিকতা। এর মাঝে বেশকিছু স্থান রয়েছে এই স্থানগুলো হজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং হাজীদের কাছে পরিচিত।

মিনা : জিলহজ মাসের ৮ তারিখে আল্লাহর ঘরের মেহমান হাজীদের মিনা শহরে অবস্থান করতে হয়। মিনার যেদিকে চোখ যায়, তাঁবু আর তাঁবু। মিনা যেন তাঁবুর শহর। মিনা শহর সৌদি আরবের সবচেয়ে মর্যাদাশীল এবং পবিত্র ভূমির অন্যতম। সৌদি সরকারও এ শহরকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে যাবতীয় উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন করেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসব তাঁবুতে আছে বাতি, বাথরুম। কিছু দূর পর পর আছে খাবারের দোকান। এই দোকানগুলো বছরে পাঁচ দিনের জন্য খোলা থাকে। মোয়াল্লেমের কাছ থেকে দরপত্রের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা দোকান নেন। অল্প সময়ের দোকান বলে জিনিসপত্রের দামও কয়েক গুণ বেশি। বেশির ভাগ দোকানদার ভারতীয় ও পাকিস্তানি। আল্লাহর মেহমানদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, সে জন্য দিন-রাত হেলিকপ্টার টহল দিচ্ছে।
মিনা শহরটি মক্কা ও মুজদালিফার মাঝখানে অবস্থিত। মিনার মোট সীমানা ২০ বর্গকিলোমিটার। এর বেশকিছু অংশ পাহাড়ি এলাকা। সুউচ্চ মাথা পাহাড়গুলোর। অবশিষ্ট অংশে তাঁবু টানানো হয়েছে। এত বিশাল এলাকাজুড়ে তাঁবু টানানো ছিল সৌদি সরকারের বাস্তবায়নকৃত সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এই তাঁবু এলাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তাঁবু শহর হিসেবে গণ্য করা হয়। হজের এই পাঁচ দিন ছাড়া মিনার পুরো এলাকা খালি পড়ে থাকে। চারপাশের প্রবেশদ্বারও তখন বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় বৈদ্যুতিক সংযোগ, পানির লাইন, টেলিফোন সংযোগ। হজের দুই দিন আগে মিনা এলাকার ফটক খোলা হয়। হজের দুই দিন পর আবার সব বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আরাফাতের ময়দান

৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানই হজ। এ দিন ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক/লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক/ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়ালমুলক’ ধ্বনিতে মুখরিত থাকে আরাফাতের ময়দান। পবিত্র নগরী মক্কা থেকে ১৫-১৬ কিলোমিটার পূর্বে ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত আরাফাতের ময়দান অবস্থিত। এর দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ যথাক্রমে দুই কিলোমিটার। আরাফাতের ময়দানেই মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন, যা সর্বকালের সব মানুষের কাছে মুক্তির দিশা হিসেবে বিবেচিত।

ঐতিহাসিক এ ময়দানটি তিন দিকে পাহাড়বেষ্টিত। এ ময়দানের দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে রয়েছে মক্কা-হাদাহ-তায়েফ রিং রোড। এ রোডের দক্ষিণ পাশেই আবেদি উপত্যকায় মক্কার ঐতিহাসিক ‘উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়’ অবস্থিত। উত্তরে সাদ পাহাড়। সেখান থেকে আরাফাতের ময়দানের সীমানাও প্রায় এক কিলোমিটার। সেখান থেকে দক্ষিণে গিয়ে মসজিদে নামিরায় আরাফাতের ময়দানের সীমানা শেষ হয়েছে।

আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহ সেসব হাজীকে নিষ্পাপ ঘোষণা করেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহতায়ালা আরাফার দিনে ফেরেশতাদের ডেকে বলেন, ‘হে ফেরেশতারা! তোমরা লক্ষ কর, আমার বান্দারা কি ধরনের বহু দূরদূরান্ত থেকে এসে আজ আরাফাত মাঠে ধুলোবালির সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তোমরা সাক্ষী থাকো, যারা আমার ঘর (কাবা) জিয়ারত করতে এসে এত কষ্ট স্বীকার করছে, নিশ্চয়ই আমি তাদের গুনাহসমূ হ ক্ষমা করে দিলাম’ (বোখারি)। ‘আরাফার দিন আল্লাহ এত অধিক পরিমাণ জাহান্নামিকে অগ্নি থেকে মুক্তি দেন, যা অন্য কোনো দিবসে দেন না’ (মুসলিম)।

মসজিদে নামিরা

৯ জিলহজ। আরাফার দিন। সূর্যোদয়ের পরপরই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা লাখ লাখ মুসলমান সমবেত হন মক্কা থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহাসিক আরাফার ময়দানে। হাজীর কণ্ঠে উচ্চারিত ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা-শারিকালাকা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হবে এখানকার আকাশ-বাতাস।

হজের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে আরাফাতের ময়দান সংলগ্ন মসজিদে নামিরা থেকে হজের খুতবা দেওয়া হয়। মসজিদটি সেই স্থানে নির্মিত যেখানে দাঁড়িয়ে হজরত মোহাম্মদ (সা.) তার বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। আরাফার ময়দানের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত এ মসজিদটি হজ পালন করতে আসা প্রত্যেকের কাছেই বিশেষভাবে পরিচিত। মসজিদের বর্তমান নান্দনিক রূপটি সাম্প্রতিক সৌদি শাসনামলের। মসজিদটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এর আয়তন এক লাখ ১০ হাজার বর্গমিটার। এখানে একত্রে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এই স্থানেই ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) হজরত ইব্রাহিমকে (আ.) হজের নিয়মকানুন শিক্ষা দিয়েছিলেন। এই মসজিদ থেকেই হজের খুতবা প্রদান করা হয়।

সেই হিসেবে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মসজিদ। মসজিদের পাশে একটি রাজকীয় প্রাসাদ রয়েছে। হজের সময় ব্যতীত বছরের অন্য সময় এ এলাকায় মানুষজন খুব একটা থাকে না। তাই মসজিদটি বেশির ভাগ সময় বন্ধ থাকে। মসজিদের ছয়টি মিনার রয়েছে। প্রতিটির উচ্চতা ৬০ মিটার। মসজিদের তিনটি চমৎকার গম্বুজ সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক দূর থেকে মসজিদের মিনারগুলো দেখা যায়। মসজিদে ১০টি প্রধান প্রবেশদ্বারসহ কমপক্ষে ৬৪ দরজা আছে মসজিদে নামিরায়। আরাফার দিন উপলক্ষে মসজিদে জোহর ও আসর নামাজ এক আজানে আদায় করেন মুসল্লিরা।

হজের খুতবায় সমসাময়িক বিষয়ের দিকে-নির্দেশনার পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হয়। খুতবায় মুসলিম বিশ্বের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করেন হজের ইমাম।

জাবালে রহমত একটি ঐতিহাসিক স্থান জাবালে রহমত বা রহমতের পাহাড়। এর অবস্থান মক্কার পূর্ব দিকে মসজিদে হারাম থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে আরাফাতের ময়দানে। শেষ নবী হজরত রসুলুল্লাহ (সা.) এখানে দাঁড়িয়ে বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। পাহাড়টি গ্রানাইড পাথরে গঠিত, উচ্চতা প্রায় ৭০ মিটার। এই পাহাড়ের চতুর্দিকে দৈর্ঘ্য-প্রস্থে দুই মাইল সমতল ভূমিকে আরাফাতের ময়দান বলা হয়। অবশ্য আরাফাতের পাহাড়ের মাধ্যমে সমগ্র এলাকাকে বোঝানো হয়। হজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে এই স্থান মুসলমানদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

উপরের পিলারের কাছে যাওয়ার জন্য পাহাড়ের গায়ে সিঁড়ি আছে। পাথরের সিঁড়িগুলো বেশ প্রশস্ত। লক্ষাধিক সাহাবির উপস্থিতিতে বিদায় হজের ভাষণ হজরত রসুলুল্লাহ (সা.) কসওয়া নামক উটে আরোহণ অবস্থায় দিয়েছিলেন। ওই উটের পীঠে অবস্থানকালীন কোরআনের আয়াত নাজিল হয়, ‘আজ তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নিয়ামতকে তোমাদের ওপর যথেষ্ট করে দিলাম, আর আমি ইসলাম ধর্মের ওপর সন্তুষ্ট।’

পাহাড়ের ওপরটা মোটামুটি সমতল। তবে পাহাড়ের উপরের পিলারে লেখা আছে, ওই পাহাড়ে উঠে কী করা যাবে, আর কী করা যাবে না। নির্দেশনায় কয়েকটি ভাষার মাঝে বাংলা ভাষাও ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) এখানে দাঁড়িয়ে হজযাত্রীদের সামনে বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। বিদায় হজের ভাষণকে বলা হয় মানবজাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ। দশম হিজরি তথা ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হজ পালনের সময় দেওয়া হয় এই ভাষণ। এটি ছিল নবীজির শেষ ভাষণ। প্রায় সোয়া লাখ মানুষ সে দিন আরাফাত পর্বতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ভাষণটি সরাসরি শুনেছিলেন।

মুজদালিফা

মুজদালিফা সৌদি আরবের মক্কা নগরীর নিকটবর্তী একটি সমতল এলাকা। এই স্থান হজের সঙ্গে সম্পর্কিত। মিনা ও আরাফাতের পথে মিনার দক্ষিণ পূর্বে এর অবস্থান। প্রতি বছর ৯ জিলহজ তারিখে আরাফাতে অবস্থানের পর মুসলিমরা মুজদালিফায় আসে। এখানে রাতযাপন করা হজের অংশ। পরবর্তীতে মিনায় শয়তানের প্রতীক স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপের জন্য এখানে থেকে পাথর সংগ্রহ করা হয়। মূলত মুজদালিফা হলো মিনা ও আরাফার মাঝে অবস্থিত একটি উপত্যকা। আদি পিতা হজরত আদম (আ.) ও আদি মাতা বিবি হাওয়া (আ.)-এর প্রথম আরাফাত প্রান্তরে সাক্ষাতের পর জাবালে রহমতে দোয়া কবুলান্তে এ মুজদালিফাতেই প্রথম তারা একত্রে রাতযাপন করেন।

মুজদালিফাই হলো হাজীদের মানবতার প্রশিক্ষণের চূড়ান্ত ধাপ। নিচে খালি মাঠ উপরে খোলা আকাশ এখানেই রাত নিবাস। খালি মাথা, খোলা পা, কাফন পরিহিত প্রত্যেকের নিজের আমলনামার ঝোলা যার যার নিজের কাঁধে। ইসলামে সাম্যের সবচেয়ে সেরা দৃষ্টান্ত হলো মুজদালিফা। এ রাতেই মুজদালিফা থেকে শয়তানকে পাথর মারার জন্য ৪৯ বা ৭০টি পাথর (কংকর) সংগ্রহ করতে হয়, যা ১০, ১১ ও ১২ (প্রয়োজনে ১৩) জিলহজ জামারাতে শয়তানকে মারতে হয়। মুজদালিফাতে শোয়া বা হালকা বিশ্রাম নেওয়া সুন্নত। তবে এর জন্য আয়োজন করে কাঁথা-বালিশ, বিছানা-কম্বল, চাদর বহন করে নেওয়া মোটেই প্রয়োজন নেই।

জামারাত

জামারতকে পাথর নিক্ষেপ (শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ বলেও পরিচিত) ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম হজের একটি অংশ। হাজীরা মক্কার পূর্ব দিকে অবস্থিত মিনায় তিনটি দেওয়ালে (জামারাত নামে পরিচিত, ইতিপূর্বে এগুলো স্তম্ভ আকারের ছিল) পাথর নিক্ষেপ করেন। এটি হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মিনায় আসার পূর্বে মুজদালিফায় অবস্থানের সময় সাধারণত পাথর সংগ্রহ করা হয়। ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনটি উঁচু স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপ করা হতো। এরপর সৌদি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার জন্য এসব স্তম্ভের স্থলে ২৬ মিটার দীর্ঘ দেয়াল নির্মাণ করে। অনেক হাজীর নিক্ষিপ্ত পাথর ভুলবশত অন্যদিকের হাজীদের দিকে গিয়ে পড়ত। জামারাতে সহজে পৌঁছানোর জন্য এগুলোর চারপাশে পায়ে জামারাত সেতু নির্মাণ করা হয়।

১০ জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজ প্রতিদিন শয়তানকে হাজীরা পাথর নিক্ষেপ করেন। ১০ জিলহজ ঈদের দিন শুধু বড় জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করা হয় এবং বাকি তিন দিন তিনটি জামারাতেই পাথর নিক্ষেপ করা হয়। হাজীরা মিনায় তিন দিন অবস্থান করেন এবং সেই স্তম্ভগুলোতে পাথর নিক্ষেপ করেন যা জামারায়ে উলা, জামারায়ে উসতা এবং জামারায়ে ওকবা নামে পরিচিত। তিনটি জামরায় প্রতিবার মোট সাতটি করে পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। এই সাতটি পাথর একেবারেই নিক্ষেপ না করে সাতবারে নিক্ষেপ করতে হবে। প্রত্যেক হাজীকে নিজে জামরাতে উপস্থিত হয়ে পাথর নিক্ষেপ করতে হবে। তবে কেউ যদি অসুস্থ থাকে, তবে সে অন্য কাউকে দিয়েও পাথর নিক্ষেপ করিয়ে নিতে পারে। কোনো কারণে যদি কারও পাথর নিক্ষেপ বাদ পড়ে যায়, তবে তাকে মিনায় ফেরত এসে পাথর নিক্ষেপ করতে হবে।