ডেঙ্গু মশার রাজত্ব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতই

সুমন দত্ত: ইতিহাসে এক সময় বলা হতো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায় না। ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। এই মশার অস্তিত্ব বিশ্বব্যাপী। একে ৭ দিনে দমন করা যায় না। সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেই একে দমন সম্ভব। সবার সচেতনতা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই ডেঙ্গু দমনে আসতে পারে সফলতা। জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সেমিনারে এসব কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হুমায়ুন রেজা খান। এদিন তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন একই বিভাগের অন্য অধ্যাপিকারা।

বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ডেঙ্গু বিষয়ক এই মুক্ত আলোচনা। এতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপিকা ড. গুলশান আরা লতিফা। ডেঙ্গু সম্পর্কে বক্তব্য রাখেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড.তপন কুমার দে, কীটতত্ত্ববিদ ড. তানজিন আকতার ও সহযোগী অধ্যাপিকা ফারজানা ইসলাম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করে প্রানিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড.নিয়ামুল নাসের।

সেমিনারে ডেঙ্গুর এডিস মশা নিয়ে প্রেজেন্টেশন করেন ফারজানা ইসলাম। এডিস মশার কয়েকটি প্রজাতির বাংলাদেশে দেখা যায় বলে তিনি জানান। এর আগে এডিস মশা ও অন্য প্রজাতির মশাগুলোর মধ্যে কি ধরনের পার্থক্য রয়েছে তার সচিত্র বিবরণ দেন তিনি।

তিনি বলেন, মশা বাহিত রোগ হচ্ছে চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, এনসেফালাইটিস,ফাইলেরিয়াসিস, ইয়োলো ফিবার। সবগুলো রোগের বাহক সব মশা নয়। বিশেষ বিশেষ রোগের জন্য বিশেষ মশা ও তাদের শরীরে বহনকারী ভাইরাস দায়ী। ডেঙ্গু রোগের জন্য এডিস মশার দেহে চার ধরনের ভাইরাস সনাক্ত হয়েছে। ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩, ডেন-৪।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. হুমায়ুন রেজা খান বলেন, ডেন-২ ও ডেন-৩ ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাণ নাশ হতে পারে। তবে ডেন-১ ও ডেন-৪ তেমন ভয়ানক নয়। এই দুই ভাইরাসে আক্রান্ত ডেঙ্গু রোগী দ্রুত সেরে উঠে।

ড. হুমায়ুন রেজা খান বলেন, এডিস মশার প্রজাতি গুলো হচ্ছে এডিস অ্যাজিপ্টা, এডিস অ্যালবোপিকটাস, এডিস পলিনেসিনসিস। এদের মধ্য এডিস অ্যাজিপ্টা হচ্ছে সম্রাট মশা। এই মশা বাড়িতে প্রবেশ করলে। অন্য এডিস প্রজাতির মশা বাড়িতে ঢুকতে পারে না।

তার মানে অন্য প্রজাতি গুলো বাড়ির বাইরে অবস্থান করে। আর এডিস অ্যাজিপ্টা মশা অন্য মশার মত কাতারে কাতারে ডিম পাড়ে না। এরা একটা দুইটা করে ডিম পাড়ে। পানির মাঝখানে এরা ডিম পাড়ে না। যে পাত্রে পানি জমা হয় তার কিনারে এই এডিস মশা ডিম পাড়ে।

তিনি বলেন, এডিস মশার ডিম এক বছর পর্যন্ত মাটিতে বেঁচে থাকতে পারে। একটি ফিমেল এডিস মশার দশ প্রজন্ম চার মাসে ২ লক্ষ ডিম পারার ক্ষমতা রাখে। এজন্য জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি থেকেই এডিস মশা দমনে সরকারকে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এডিস মশা নদী কিংবা খাল বিলে ডিম পাড়ে না। এরা ডাবের খোসায় কিংবা টবে জমা পানিতে, অথবা দুটি গাছের ডালের মাঝে জমা পানিতে ডিম পাড়ে। তাছাড়া এসির জমা পানিতে কিংবা মাটির যে স্থানে গর্ত কিংবা সামান্য ঢাল আছে সেখানকার পানিতে এরা ডিম পাড়তে পছন্দ করে। এডিস মশার ডিম ফুটতে শুকনো জায়গা আবশ্যক। এ কারণে তারা পানির পৃষ্ঠতলের কোনায় ডিম পাড়ে।

ড. তানজিন আকতার বলেন, একজন ডেঙ্গু রোগীকে কিছু লক্ষণ দেখলে বোঝা যায়। যেমন তার শরীরে রেশ হবে, মাথা ব্যথা শুরু হবে, চোখের কোনা লাল হয়ে যাবে, বমি ও গিটে ব্যথা শুরু হবে।

হুমায়ুন রেজা বলেন, এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায়, তবে খাদ্য না পেলে এই মশা রাতেও কামড়াতে পারে। তাই যারা বলছেন এডিস মশার জন্য দিনের বেলা সতর্ক থাকুন সেটা সঠিক নয়। রাতের বেলাও লোকজনকে সতর্ক থাকতে হবে। লেবু কেটে তার মধ্যে কয়েকটা লবঙ্গ ঢুকালে মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, ধূপের সঙ্গে নিমপাতা দিলেও মশা তাড়ানো যায়। শরীরে নিমপাতা ও হেমলতার রস মেখেও মশার হাত থেকে বাঁচা যায়। আর বাড়িতে জমা পানিতে লবণ ছিটালে সেখানে মশা ডিম পারে না।

ঢাকানিউজ২৪ডটকম