কাশ্মীরের আম ছালা দুটোই গেল

সুমন দত্ত : বাংলায় একটা প্রবাদ আছে মানুষ ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না’। ভারতের জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের রাজনীতিবিদের হাল এই প্রবাদ বাক্যের মতো। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের মধ্য দিয়ে ভাগ হয়েছিল ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষ। ব্রিটিশদের দাগানো সীমান্তই হয়ে যায় ভারত পাকিস্তানের সীমান্ত।

বিশ্বে ভারত এক শক্তিশালী রাষ্ট্র। ঐতিহ্য ও প্রথার বেড়াজালে বন্দি থাকতে চাইছে না দেশটি। সেটাই লক্ষ্য করা গেল জম্মু ও কাশ্মীরকে দুই টুকরা করার মধ্যমে। পাশাপাশি পাক অধিকৃত কাশ্মীর (আজাদ কাশ্মীর) ও আকসাই চীনকে নিজেদের দাবি করছে ভারত। যদিও অনেকে এটা ভারতের বাগডম্বর ভাবছে। তবে পাকিস্তানের অর্থনীতির যে হাল, কোন দিন সেটা অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয় সেটা আগাম কে বলতে পারে? শোনা যায় পাকিস্তান ওই অঞ্চল চীনের কাছে সি-প্যাক (চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর) চুক্তির মাধ্যমে বিক্রি করে দিয়েছে।

ভারতের বর্তমান শাসক গোষ্ঠী বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি)। এদের মন মানসিকতা ও রাজনীতি অন্যরকম। ভারতের কংগ্রেস পার্টির রাজনীতি ও তাদের বিচার ধারা থেকে ভিন্ন হওয়ায় দেশটিতে এসব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সন্ত্রাস দমনে ভারতকে কখনো সীমান্ত অতিক্রম করতে দেখা যায়নি। এখন দেখা যাচ্ছে। ভারত সন্ত্রাস দমন করতে গিয়ে দুবার মিয়ানমারে ও দুবার পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালায়।

১৯৬২ তে চীন ভারত সীমান্ত যুদ্ধ হয়। এরপর সীমান্ত নিয়ে দুদেশের মধ্যে অমীমাংসিত সমস্যা থাকলেও তা যুদ্ধাবস্থার দিকে গড়ায়নি। বর্তমানে তা আবার নতুন করে দেখা যাচ্ছে। ভুটানের ডোকলাম নিয়ে চীন-ভারত যুদ্ধ প্রায় হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত ও ছিটমহল সমস্যার সমাধান দ্রুত হয়। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা এই সমস্যা বিনা রক্তপাতে সমাধান হয়। ভারতের পার্লামেন্টে বিল পাস করে তার স্বীকৃতি দেয়া হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আন্তরিকতার কারণেই এসব হয়েছে। যা কখনও কল্পনা করা যায়নি।

ব্রিটিশ ভারতবর্ষ ছেড়ে যাবার আগে জম্মু-কাশ্মীর রাজা শাসিত বিশাল এক ভূখণ্ড ছিল। পাকিস্তান গায়ের জোরে কাশ্মীরের একটা অংশ দখল করে নেয়। পাকিস্তানের এই দখলবাজি ঠেকাতে তৎকালীন কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতে যোগদান করে। এই যোগদান করার আগে হরি সিং কিছু শর্ত জুড়ে দেয়। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু তা মেনে নেয়। এবং পাকিস্তানের দখল দারি ঠেকিয়ে দেয়। পাকিস্তানের দখল দারি যেখানে শেষ হয় সেখানে নতুন এক সীমান্ত তৈরি হয়। যার নাম লাইন অব কন্ট্রোল। পরে এই লাইন অব কন্ট্রোলকে দুই দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের স্বীকৃতি দেয়া হয়।

পাকিস্তানের অধিকৃত কাশ্মীরকে আজাদ কাশ্মীর বলা হয়। যদিও সেখানে কোনো আজাদি নেই। পাকিস্তান প্রশাসনের অধীনে সবকিছু হয়। অন্যদিকে ভারতের কাশ্মীরে কঠোর ভাবে অনুসরণ করা হয় রাজা হরি সিংয়ের দেয়া শর্ত। যে শর্তের কারণে সেখানকার কাশ্মীরিরা ভারতের দুর্দিনে (৭৪-৭৫ সালে) সস্তায় চাল ডাল পেয়েছে। ঝুটেছে উন্নতমানের চিকিৎসা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। এসব নিয়ে ভারতের অন্য রাজ্যগুলোতে সমালোচনা ও আলোচনা হয়েছে বিস্তর। বেশিরভাগ ভারতীয়র অভিযোগ ছিল কাশ্মীরিদের এসব দিয়ে ভারতের লাভটা কি? কারণ জন্মের পর থেকেই এই কাশ্মীরিরা ভারতের বিরুদ্ধে রাজনীতি করে যাচ্ছে। স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

দিনে দিনে কাশ্মীরে একাধিক ভারত বিরোধী সশস্ত্র জঙ্গি দল গঠিত হয়। যার মধ্যে জেকেএলএফ, হিজবুল মুজাহিদিন, লস্করে তৈয়বা, জইশ-ই-মোহাম্মদ অন্যতম। পাকিস্তানের আশ্রয় প্রশ্রয়ে এসব রাজনৈতিক দল কাম জঙ্গি গোষ্ঠী শুরু থেকেই ভারতের বিরোধিতা করে আসছে এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবি জানাচ্ছে। অথচ এরা পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মীরের বিষয়ে টু শব্দটা করে না। পাকিস্তানের ট্যাগ লাগিয়ে এরা ভারতে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে আসছে। বর্তমানে এদের বহু নেতা ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে জান্নাতের হুর পরীর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বাকীরা হুর পরীর সঙ্গে দেখা করার পথে আছে। অন্যদিকে পিডিপি ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের মত দলগুলি ভারতে শুরু করে সুবিধাবাদী রাজনীতি। ক্ষমতায় থাকলে একরকম আর বাইরে থাকলে তার বিপরীত। বিগত ৭০ বছর যাবত এরা এসবই করে আসছে। যার কারণে কাশ্মীরের সাধারণ জনতা কি করবে তা বুঝে উঠতে পারেনি। তারা এসব পার্টির রাজনীতির দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছে। হরি সিংয়ের প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি এই রাজনৈতিক দলগুলো।

কাশ্মীরের রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বহীনতার কারণে কাশ্মীর থেকে উচ্ছেদ হয়ে যায় হিন্দু পণ্ডিত ও শিখ সম্প্রদায়ের লোকজন। একটা সময় কাশ্মীরের লোকজন জঙ্গিদের হুমকির কারণে ভোট দিতেই যেত না।

পরিস্থিতি বদলাতে থাকে ভারতের শাসন ব্যবস্থায় বিজেপি আসার পর। তারা কাশ্মীরের কুখ্যাত জঙ্গিগুলোকে একে একে খতম করতে থাকে। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো দুর্বল হয়ে পরে। নতুন রিক্রুটমেন্ট আর খুঁজে পায় না। এদিকে লোকজনের মধ্যেও সাহস জাগতে শুরু করে। তারা ভারতের নির্বাচনগুলোতে অংশ নিতে শুরু করে। কাশ্মীরে রাজনৈতিক চিত্র পাল্টাতে থাকে।

একটা সময় কাশ্মীরে যৌথভাবে ক্ষমতায় আসে বিজেপি-পিডিপি জোট। সেটাও অনেকটা দরকষাকষি করে। কিন্তু সেই ক্ষমতা বেশিদিন স্থায়ী হলো না। ওই যে বললাম কাশ্মীরের রাজনৈতিক দলগুলির সুবিধাবাদী মনোভাব। তু তু মে মে টা শুরু হয় অমরনাথ তীর্থ যাত্রীদের নিয়ে। তীর্থ যাত্রীদের জন্য কাশ্মীরে কিছু আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করতে চেয়েছিল ভারত সরকার।

সেই প্রস্তাবে রাজিও হয়ে গিয়েছিল কাশ্মীরের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মেহেবুবা মুফতি। কিন্তু বিরোধ জানায় ফারুক আবদুল্লাহ। তিনি আর্টিকেল ৩৭০ ও ৩৫এ ধারার কথা স্মরণ করিয়ে এর বিরোধ করতে থাকেন। অথচ ফারুক আবদুল্লাহ একজন চ্যাম্পিয়ন সেকুলার হিসেবে পরিচিত। এই ইস্যুতে বাধা না দেয়ার কথাই ছিল তার।

তার আগে হিন্দু পণ্ডিতদের পুনর্বাসন করার জন্য কাশ্মীরে একটি কলোনি তৈরি করতে চেয়েছিল ভারত। সেখানেও বাধা ফারুক আবদুল্লাহর। তাদের মতে এমন কলোনি করলে কাশ্মীরের সেকুলার চরিত্র নষ্ট হবে। হিন্দুদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই এসব প্রস্তাব সেদিন দেয়া হয়েছিল। অথচ তা আমলে নিলো না রাজনৈতিক দলগুলো।

ভারতের বর্তমান শাসক গোষ্ঠীগুলো যখন দেখলো কাশ্মীর নিয়ে কিছুই করা যাচ্ছে না। তখনই বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত হয় ৩৭০ ধারা তুলে দেবার প্রস্তাব। যা এখন বাস্তবায়ন হলো। বিজেপি নেতারা কাশ্মীরের রাজনীতিবিদদের ওপর এতটাই ক্ষুব্ধ ছিল যে কাশ্মীরকে দুই টুকরা করে তারা। এতে কাশ্মীরের আম (বিশেষ মর্যাদা) ও ছালা (রাজ্যে মর্যাদা) দুটোই গেল। সাধারণ ইউনিয়ন টেরিটরির মর্যাদা পাবে তারা। যেটা আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের লোকেরা পায়।

কাশ্মীরের বর্তমান শাসকদের ভুল রাজনীতির শিকার হলো অঞ্চলটির সাধারণ জনগণ। এখন হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে কাশ্মীরের জনগণকে আরেকটি লড়াই সংগ্রাম করতে হবে। হতে পারে সেটি স্বাধীনতা সংগ্রাম। কিন্তু সেটা করার মত মানসিক অবস্থা ও শক্তি কাশ্মীরের রাজনৈতিক দলগুলোর আছে কিনা সন্দেহ। এখন পর্যন্ত কাশ্মীরের পক্ষে পাকিস্তান ছাড়া তেমন কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো অনেকটা নীরব দর্শক। হয়ত আগামীতে সবকিছু পরিষ্কার হবে।

প্রসঙ্গত, ভারত এখন অনেকটাই আক্রমণাত্মক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল থেকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র পাওয়ার পরই ভারত তার কৌশল পাল্টাতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতকে ন্যাটোর সমান মর্যাদা দিতে প্রস্তুত। যা বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান পায়। ভারত পাশাপাশি তার পুরানো বন্ধু রাশিয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক বজায় রেখেছে। নতুন নতুন যুদ্ধাস্ত্র রাশিয়া থেকে কিনছে। রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে নির্মিত হচ্ছে একাধিক সমরাস্ত্র। দেশটির সঙ্গে পুরানো চুক্তিগুলোও নবায়ন হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হওয়াও এক নতুন অধ্যায়। ভারতের পতাকাবাহী বিমানকে রিয়াদের আকাশপথ ব্যবহার করে ইসরাইলে প্রবেশ করতে দেয়ার মাধ্যমে দুই দেশের গভীর কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আগেও ভালো ছিল। মোদি জমানায় তা আরও বেড়েছে। এমন অবস্থায় কে চাইবে ভারতের সঙ্গে শত্রুতা করতে।

লেখক: সাংবাদিক