সঞ্চয়পত্রে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎসে কর ৫ শতাংশই

নিউজ ডেস্ক:  বাজেট পাসের এক মাসের মাথায় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে পরিবর্তন এনেছে সরকার। এতে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়েছে। সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে যাদের পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ আছে, তাদের অর্জিত মুনাফায় কর দিতে হবে ৫ শতাংশ। এর বেশি সঞ্চয়পত্র থাকলে ১০ শতাংশ কর দিতে হবে। সোমবার সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

এদিকে, রেমিট্যান্সের প্রণোদনা সুবিধা ১ জুলাই থেকেই কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, ওই তারিখ থেকে (পয়লা জুলাই) যারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন, তাদের প্রত্যেককে যে পরিমান রেমিট্যান্স পাঠাবেন তার সঙ্গে বাড়তি ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হবে।

এবারের বাজেটে (২০১৯-২০) সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে অর্জিত মুনাফায় কর হার পাঁচ শতাংশ বাড়িয়ে দশ শতাংশ করা হয়। এতে সারাদেশে সঞ্চয়কারী বিশেষ করে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। দেশের সাধারণ মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ সঞ্চয়পত্রের আয় দিয়ে সংসার চালান। সঞ্চয়পত্রে মুনাফায় কর হার বাড়ানোর ফলে তাদের ওপর খড়গ নেমে আসে। বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যদিও বর্তমান বাজারে পাঁচ লাখ টাকা কিছুই না। তবুও কর হার কমানোর ফলে প্রান্তিক সঞ্চয়কারীরা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, বাজেটে পাসের পর সঞ্চয়পত্র নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। তাই সঞ্চয়পত্রে যাদের ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ আছে, তাদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কর দিতে হবে। এর বেশি যারা কিনবেন, তাদের দিতে হবে ১০ শতাংশ। মোস্তফা কামাল আরও জানান, সঞ্চয়পত্র যাদের জন্য,সেই টার্গেট গ্রুপ এর সুবিধা তেমন পান না। অথচ বেশি সুবিধা পাচ্ছেন ধনীরা। এটা কাম্য নয়। সেজন্য ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সুবিধা দেওয়া হলো। তিনি বলেন, সঞ্চয়পত্রে পেনশনভোগীদের কোনো সুবিধা কমানো হয়নি। পেনশনভোগীরা আগে যেসব সুবিধা পেতেন তা বলবৎ রয়েছে।

মুস্তফা কামাল আরও বলেন, সঞ্চয়পত্র আমাদের একটি মহৎ উদ্যোগ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীদের সুরক্ষায় সুবিধা দেওয়া হলেও দেখা যায় এ সুযোগের অপব্যবহার হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুবিধা যাদের জন্য তারা না পেয়ে ধনীরা পাচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, উচ্চ সুদের কারণে সঞ্চয়পত্রে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে। কোনো তদারকি না থাকায় একাধিক নামে সঞ্চয়পত্র কেনা হচ্ছে। ফলে সীমা লঙ্ঘন করে অতিরিক্তি সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের অভিযোগ উঠেছে। যে কারণে বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বেশি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হচ্ছে। এতে করে সুদ পরিশোধে সরকারের চাপ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে এবারের বাজেটে সঞ্চয়পত্রে হাত দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

সঞ্চয়পত্রে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কত আছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, এই মুহূর্তে বলতে পারবো না। তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে গরিব বা স্বল্প আয়ের মানুষ। এখাতে স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে চাই। ৫ লাখ টাকা যথেষ্ট না হলে পরবর্তীতে সুবিধা আরও বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সঞ্চয়পত্রে নির্ভরশীলতা কমাতে বন্ড মার্কেটের উন্নয়ন করা হবে। বন্ড চালু হলে তখন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে মানুষ। এমন এক সময় আসবে তখন সঞ্চয়পত্রে আর কেউ টাকা রাখবে না। বন্ড মার্কেটে বিনিয়োগ করলে গ্রাহকদের কোনো হয়রানি নেই। এর ওপর কাজ চলছে।

মোস্তফা কামাল বলেন, আমরা চাই মানুষ সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে বিনিয়োগ করুক। যেখানে বিনিয়োগ করলে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে আমরা সেখানেই বিনিয়োগ নিয়ে যেতে চাই। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে স্বচ্ছতা থাকে না। আমরা তো দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিতে পারি না। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনতে ডাটাবেজ তৈরি করেছি। ডাটাবেজ দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে কে কোথায় কত টাকা বিনিয়োগ করেছে। অটোমেশন সম্পন্ন হলে সঞ্চয়পত্রে অনিয়ম বন্ধ হবে বলে মনে করেন তিনি।

আগে যারা বিভিন্নভাবে সঞ্চয়পত্রে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন তাদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে- এ প্রশ্নের উত্তরে মুস্তফা কামাল বলেন, যেহেতু বেশি বিনিয়োগ করা যাবে না- এমন কোনো আইন ছিল না, তাহলে কিভাবে তাদের শাস্তি দেবো। তবে তারা ধরা পড়বে অন্য আইনে। এত টাকা পেলো কই? এ জন্য তারা দুদকের জালে ধরা পড়বে।

এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সঞ্চয়পত্রে তার কোনো বিনিয়োগ নেই। বিনিয়োগ আছে ব্যাংকের মেয়াদী আমানতে (এফডিআর)। যা তিনি হলফনামায় ঘোষণা করেন।

রেমিট্যান্সে প্রনোদনা: প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করতে এবারের বাজেটে ২ শতাংশ প্রনোদনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সুবিধা কবে দেওয়া হবে তা নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। এ বিষয়টি পরিষ্কার করে অর্থমন্ত্রী জানান, এ সুবিধা দেওয়ার জন্য সিস্টেম ডেভলপ করতে হবে। তার জন্য দুই/তিন মাস লাগতে পারে। এটা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। তবে প্রক্রিয়া যখনই সম্পন্ন হোক,১ জুলাই থেকেই সুবিধা পাবে প্রবাসীরা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, ধরা যাক কোনো প্রবাসী ১০০ টাকা তার অ্যাকাউন্টে পাঠিয়েছে। সরকার এই টাকার সঙ্গে আরও ২ টাকা দেবে। ফলে তিনি মোট ১০২ টাকা পাবেন। এটা কিভাবে দেওয়া হবে তা নিয়ে একটি নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রণোদনা দেওয়ার ফলে বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার (এক হাজার ৮০০ কোটি ডলার) রেমিট্যান্স আসবে। এক্ষেত্রে প্রণোদনা বাবদ সরকারের ব্যয় হবে ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, বিদায়ী অর্থবছরে দেশে প্রায় ১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার (১ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার) বা ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স এসেছে।

অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকেদের বলেন, সামনে ঈদ। অনেকেই ধারণা করছে, এখন দেশে কেউ রেমিট্যান্স পাঠালে তারা প্রণোদনা পাবে না। এটা কিন্তু ঠিক না। বাজেটে পাস হয়েছে। এখন পাঠালেও প্রনোদনা পাবে। পরে পাঠালেও পাবে। অর্থাৎ জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকেই যারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে তারাই ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা পাবে। এজন্য কোনো ধরনের ট্যাক্স বা চার্জ কাটা হবে না। এক্ষেত্রে সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট করতে দ্রুত কাজ করা হচ্ছে।