চট্টগ্রামেই টাকার কুমির হন ডিআইজি পার্থ

নিউজ ডেস্ক:    সিলেটের ডিআইজি (প্রিজন) পার্থ গোপাল বণিককে চট্টগ্রামের সবাই ‘টাকার কুমির’ নামেই চেনেন। দুই বছর তিন মাস চট্টগ্রাম কারাগারে থাকাকালে তিনি বিপুল পরিমাণ বিত্তবৈভবের মালিক হন। বন্দিদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা নয়ছয় করে, দাগি বন্দিদের অন্যায় সুবিধা দিয়ে ও ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রচুর অর্থ আয় করেন পার্থ গোপাল বণিক।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও চট্টগ্রাম কারাগারে পার্থ গোপালের নানা অপকর্মের চিত্র আছে। এ জন্য চট্টগ্রাম কারাগার থেকে তাকে শাস্তিমূলক বদলি করে সিলেটে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়েও অবৈধভাবে আয়ের পথ খোলা রাখেন তিনি। তাই বাসা থেকে ৮০ লাখ টাকাসহ পার্থকে গ্রেফতার করে দুদক। ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর ৪৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ও প্রায় পাঁচ কোটি টাকার নথিপত্রসহ ভৈরব রেলওয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস।

তখন সোহেল রানা দাবি করেন, উদ্ধারকৃত টাকার মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা তার এবং বাকি ৩৯ লাখ টাকা কারা বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগের তৎকালীন ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিক ও চট্টগ্রাম কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিকের। এ ঘটনার পর চারদিকে তোলপাড় শুরু হলে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। পরে সেই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই একসঙ্গে পার্থ গোপাল বণিক ও প্রশান্ত কুমারকে বদলি করা হয়।

বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রামের ডিআইজি (প্রিজন) একেএম ফজলুল হক বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পার্থ গোপাল বণিককে সিলেটে বদলি করা হয়েছিল। তার জায়গায় সিলেট থেকে আমাকে চট্টগ্রামে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর চট্টগ্রাম কারাগারের খাবারের দাম প্রায় অর্ধেক কমিয়েছি। ঠিকাদারদের কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছি। দেখার বিনিময়ে কারাবন্দির স্বজনদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার নিয়মও বন্ধ করা হয়েছে। জামিননামা কারাগারে আনলে আগে ব্যাপক অর্থ লেনদেন হতো। তাও বন্ধ করা হয়েছে। এখন আগের চেয়ে কম দামে অনেক ভালো মানের খাবার পাচ্ছে বন্দিরা। ৮০ লাখ টাকা নিয়ে পার্থ গোপাল বণিকের গ্রেফতার হওয়া প্রসঙ্গে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিপুল পরিমাণ টাকাসহ চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানা গ্রেফতার হওয়ার পর কারা অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কারা অধিদপ্তরের গঠিত কমিটিতে বরিশাল বিভাগের ডিআইজি (প্রিজন) মো. ছগির মিয়াকে প্রধান করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক (সিনিয়র জেল সুপার) কামাল হোসেন ও খুলনা কারাগারের জেলার মো. জান্নাত-উল-ফরহাদ। তারা টানা তিন দিন চট্টগ্রাম কারাগারের কর্মকর্তা, কারাবন্দি ও জেল ভিজিটরসহ বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলেন।

তদন্ত কাজের অংশ হিসেবে কিশোরগঞ্জের ভৈরবও যান তারা। তদন্ত শেষে জমা দেন প্রতিবেদন। আবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও একই ঘটনায় পৃথক আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সোহেল রানার জবানবন্দিতে পার্থ গোপাল বণিক ও প্রশান্ত কুমার বণিকের নাম আসায় ওই কমিটি বিষয়টি গভীরভাবে খতিয়ে দেখে। কমিটির সদস্যরা চট্টগ্রাম কারাগারের বন্দি, কর্মকর্তা, ঠিকাদার, ভিজিটরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে বদলি করা হয়েছিল পার্থ গোপালকে।

২৮ জুলাই বিকেলে রাজধানীর ধানমণ্ডির ভূতের গলিতে পার্থ গোপাল বণিকের বাসায় অভিযান চালিয়ে ৮০ লাখ টাকা জব্দ করে দুদক। আদালতে পার্থের আইনজীবীরা দাবি করেন, ৮০ লাখ টাকা তার (পার্থ) বৈধ আয় থেকে অর্জিত। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকা শাশুড়ি দিয়েছেন। বাকি ৫০ লাখ টাকা তার স্ত্রী ডা. রুনা মল্লিক ও তার নিজের সারা জীবনের জমানো। কিন্তু একজন সরকারি কর্মকর্তার এত বিপুল পরিমাণ অর্থ থাকার বৈধ উৎস নিয়ে সন্দেহ হওয়ায় দুদক পার্থ গোপালকে গ্রেফতার করে। আদালতও তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান।

পার্থ গোপালের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। আট মাস আগে তিনি চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে সিলেট এলেও ২৬ অক্টোবর আলোচনায় আসেন পার্থ গোপাল। সোহেল রানার জবানিতেই প্রথম ফাঁস হয় তার বিত্তবৈভবের খবর। ট্রেনে করে চট্টগ্রাম থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে ভৈরব স্টেশনে ১২ বোতল ফেনসিডিল ও ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকাসহ সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে রেলওয়ে পুলিশ। এ সময় সোহেল রানার কাছ থেকে তার নিজের নামে এক কোটি ৩০ লাখ টাকার তিনটি চেক, এক কোটি টাকার দুটি এফডিআর, স্ত্রী হোসনে আরা পপির নামে এক কোটি টাকার দুটি এফডিআর এবং শ্যালক রকিবুল হাসানের নামে ৫০ লাখ টাকার একটি এফডিআর জব্দ করা হয়।

জানা যায়, ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট চট্টগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছরের ১৬ নভেম্বর তাকে সিলেটে বদলি করে। তাকে বদলির পর আমূল পরিবর্তন আসে চট্টগ্রাম কারাগারে। আগে প্রতি পিস মুরগির মাংস ৯০ টাকা বিক্রি করলেও এখন সেটি বিক্রি করা হচ্ছে অর্ধেক দামে। আগে প্রতিটি ডিম ৩০ টাকা বিক্রি করা হলেও এখন বিক্রি করা হচ্ছে ১৫ টাকায়। অন্যান্য খাবারের দামও আগের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি হচ্ছে।