গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ

ইমাদ জাফর:  বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল একবার বলেছিলেন, ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হলো সমালোচনা করার ও বিরোধিতা করার স্বাধীনতা।’ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং শাসনপদ্ধতির ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করার জন্য সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে অপরিহার্য বলে মনে করা হয়।

তবে পাকিস্তানে, সংবাদপত্রের যাত্রা সব সময় কঠিন ছিল। জেনারেল আইয়ুব খানের আমল থেকে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ এবং তারপরে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতৃত্বাধীন এবং পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) নেতৃত্বাধীন সরকারে দেখেছি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর সব সময় অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞা ছিল।

পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর দেখা গেল, সংবাদপত্র এবং ব্যক্তির মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নিষেধাজ্ঞা ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তান ইলেকট্রনিক মিডিয়া রেগুলেটরি অথরিটি (পিএমআরআরএ) ২১টি সংবাদ চ্যানেলকে নোটিশ দিয়েছে এবং তিনটি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া ছাড়াই। একটি চ্যানেলে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সাক্ষাৎকার তিন মিনিট প্রচারের পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পশতুন তাহাফুজ আন্দোলনের (পিটিএম) যেকোনো খবর দেখানোর ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পিটিআই সরকার। এমনকি সিন্ধু প্রদেশের সুক্কুর এলাকায় শ্রমিক সম্মেলনের সময়ে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির ভাষণটিও সরকারের বাধার মুখে অনেক টেলিভিশন চ্যানেল লাইভ প্রচার করতে পারেনি। বর্তমান সরকার সম্পর্কে ইতিবাচক বিষয়গুলোই কেবল টেলিভিশনে প্রচার বা পত্রিকায় প্রকাশ করার অনুমতি রয়েছে এবং কোনো ধরনের সমালোচনা পিটিআইয়ের ওপর আক্রমণ হিসেবে নেওয়া হয়।

এটা খুবই অদ্ভুত যে সংবাদমাধ্যমের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা একটি দল এখন সেই সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। পিএমএল-এনের পাঁচ বছরের শাসনামলে পিটিআই কয়েকটি মিডিয়া গোষ্ঠীর আশীর্বাদপুষ্ট দল ছিল। ওই সময় দলটিকে নজিরবিহীন কভারেজ দেওয়া হয়েছিল এবং এটি স্বীকার করতে হবে যে কয়েকটি মিডিয়া গোষ্ঠী আসলেই পিটিআইয়ের সহযোগী হয়ে সাংবাদিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। পিপিপি এবং পিএমএল-এনের শাসনামলে পিটিআই নেতাদের বক্তৃতাগুলো কখনো কাটছাঁট করা হয়নি বা তাদের বক্তব্য প্রচার বা প্রকাশের কারণে কখনো কোনো টেলিভিশন বা পত্রিকা বন্ধ করা হয়নি।

কিন্তু এখন, পিটিআই প্রকাশ্যে বলছে, বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন বা বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন, বিরোধী দলের এমন যেকোনো নেতাকে টেলিভিশনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। যদি এ যুক্তি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে কেন বিলাওয়ালের বক্তব্য টেলিভিশনে প্রচার করা হয়নি, যিনি কোনো ধরনের বিচারের মুখোমুখি নন। আর কীভাবেই ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর তারিন নিয়মিত টেলিভিশনে উপস্থিত হচ্ছেন, দুর্নীতির অভিযোগে যাঁকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অযোগ্য ঘোষণা করেছেন? এ ছাড়া এমন প্রশ্নও উঠেছে, কীভাবে তালেবানের মুখপাত্র এহসানুল্লাহ এহসানকে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য টেলিভিশনে সময় বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং জেনারেল মোশাররফকেই বা কীভাবে টেলিভিশনে দেখানো হয়, যেখানে তাঁকে ফেরার ঘোষণা করা হয়েছে? বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন বা বিচার চলছে—এমন ব্যক্তিদের যদি সংবাদমাধ্যমে আসা নিষিদ্ধ হয়, তাহলে তো প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও টিভিতে উপস্থিত হতে পারবেন না। কারণ তাঁর দলের বিরুদ্ধে বিদেশি তহবিল গঠনসংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত চলছে।

বিশ্বের কোথাও কোনো গণতান্ত্রিক সরকার বিচারের অধীন একজন ব্যক্তির প্রচারমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করার অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। আসিফ আলী জারদারি বা বিলাওয়াল ভুট্টোকে কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। মরিয়ম নওয়াজের জন্যও একই কথা খাটে। ইসলামাবাদ হাইকোর্ট তাঁর সাজা স্থগিত করেছেন, তবু সরকার টিভি চ্যানেলগুলোকে তাঁর সাক্ষাৎকার বা তাঁর সংবাদ সম্মেলনের খবর প্রচার না করার নির্দেশ দিয়েছে।

মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারের জন্য সরকার সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে জবাবদিহি চাইতে পারে, তবে কী লেখা যাবে বা দেখানো যাবে এবং কোনটি প্রকাশ করা বা সম্প্রচার করা যাবে না, তা কখনই নির্ধারণ করতে পারবে না। সাংবাদিকেরা যদি কোনো ব্রেকিং সংবাদ প্রচার বা ভিন্নমত প্রকাশের বিষয়ে নিরাপদ বোধ করতে না পারেন এবং তাঁদের সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তাঁদের টুইটার অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়, তাহলে একে একটি স্বৈরাচারী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করা যায়।

সাংবাদিকতা কোনো জনসংযোগ ব্যবসা নয়। সরকার বা অন্য যেকোনো কর্তৃপক্ষ এটা আশা করতে পারে না যে কোনো সুনির্দিষ্ট শাসন বা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সংবাদমাধ্যম কাজ করবে। কোনো একটি সরকার যখন বিরুদ্ধমত সহ্য করে না, তখন তাকে গণতান্ত্রিক সরকার বলা যায় না। এটি আসলে গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে একটি একনায়কতন্ত্র।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ইমাদ জাফর, এশিয়া টাইমস পত্রিকার সাংবাদিক