হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের পরিবর্তন মানবে না বাংলাদেশের হিন্দুসমাজ

সুমন দত্ত: হিন্দুশাস্ত্রের বাইরে গিয়ে হিন্দু পারিবারিক তথা উত্তরাধিকার আইনের পরিবর্তন মেনে নেবে না বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়। শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা ঘোষণা করে হিন্দু পারিবারিক আইন পরিবর্তন প্রতিরোধ কমিটি নামে সনাতন ধর্মের প্রতিনিধিত্বকারী ২৮টি ধর্মীয় সংগঠন। এতে বক্তব্য রাখেন হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।

বক্তারা বলেন, বিগত তিন দশক ধরে মহিলা পরিষদসহ কয়েকটি এনজিও ও সুশীল সমাজ হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে অপপ্রচার করে আসছে। তাদের মতে হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা বাপের সম্পত্তির মালিকানা পায় না। এটা একটা ডাহা মিথ্যা প্রচার। কতিপয় এনজিও ও নারীবাদী সংগঠনের এখতিয়ার নেই হিন্দু আইন পরিবর্তনের ডাক দেয়ার। দেশের হিন্দু নারীদেরও সম্মতি নেই এতে।

বর্তমান হিন্দু আইনেই স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর পূর্ণ অধিকার Widow’s Property Act এ বিস্তারিত বর্ণনা আছে। স্বামীর মৃত্যুর পর Manager of Estate হন স্ত্রী। সেই সম্পত্তি স্ত্রী যে কারো কাছে বিক্রয় ও হস্তান্তর করতে পারেন। উপরন্তু পিতার যদি কোনো পুত্র সন্তান না থাকে সেক্ষেত্রে কন্যা সম্পূর্ণ সম্পত্তির অধিকারী হোন। অথচ ঢালাও ভাবে প্রচার করা হচ্ছে হিন্দু নারীদের বাপের সম্পত্তির ওপর কোনো অধিকার নেই।

সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ও হিন্দু সংস্কার সমিতি জ্যেষ্ঠ নেতা জে কে পাল বলেন, হিন্দু নারীরা বিয়ের সময় বাবা মায়ের ও আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে যা কিছু পায় সেটি স্ত্রীধন হিসেবে পরিচিত। এই স্ত্রী ধনের ওপর ওই নারীর পূর্ণ অধিকার আছে। আর এই স্ত্রীধন স্থাবর অস্থাবর যেকোনো কিছু হতে পারে। হিন্দু নারীরা কিছুই পান না এটা ঠিক নয়। ১৯৫৬ সালে ভারতে সব ধর্ম নিয়ে একই পারিবারিক আইন করতে চেয়েছিল। মুসলিমরা তা মানবে না বলে সেটা আর হয়নি।

তিনি আরো বলেন, হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার ও বিবাহ মুসলিমদের মত দেখলে বা বিচার করলে চলবে না। মুসলিম আইনে বিবাহ একটি চুক্তি। হিন্দু আইনে বিবাহ কোনো চুক্তি নয়। এটি একটি ধর্মীয় আচার।

হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক বলেন, আজকাল হাইকোর্টের ফুটপাতে কত নারী দিন রাত শুয়ে থাকে। এরা কোন ধর্মের? এরা সবাই মুসলিম। এসব নারীর কি সম্পত্তি নাই? অবশ্যই আছে। কিন্তু এরা ভোগদখল করতে পারে না। সম্পত্তির অধিকার থাকা সত্ত্বেও এরা আজ ফুটপাতে। বাংলাদেশে কয়জন হিন্দু নারীকে ফুটপাতে এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে দেখেন। হিন্দু আইনের কারণে হিন্দু পারিবারে নারীরা সুরক্ষা পায়।

তিনি আরো বলেন, মুসলিমদের পারিবারিক আইন বানরের পিঠাভাগের মত। আর এসব করে আমরা আইনজীবীরা নিজেদের রোজগার বাড়িয়ে চলছি। আদালতে মুসলিমরা প্রায়ই বলে সম্পত্তি ঠিকমত বণ্টন হয়নি। এই অজুহাতে মুসলিম পরিবারগুলোতে ভাইয়ে বোনে বছরের পর বছর মামলা চলে। তার বিপরীতে কয়টি হিন্দু পরিবারে ভাইয়ে বোনে মামলা হয়?

আইনজীবী নারায়ণ চন্দ্র দাস বলেন, কথায় কথায় ভারতের উদাহরণ দেয়া হয়। ভারতে গরু মন্ত্রণালয় আছে। এদেশে কি তা আছে? ভারতে হিন্দু আইন চলেছে তাদের মত। আর এদেশে হিন্দু আইন চলেছে অন্যভাবে। এবং সেটা বহু আগে থেকেই। তাই একে পরিবর্তন করার কোনো সুযোগ নেই।

সাবেক ডিআইজি সঞ্চিত বৈড়ে বলেন, এক সময় হিন্দুদের মন্দির নিয়ে সরকার একটা আইন করতে গিয়েছিল। তাতে মন্দিরের পুরোহিতকে বানানো হয়েছিল বেতনভুক কর্মচারী আর মাতবর হলো রাজনৈতিক নেতারা। আন্দোলন প্রতিবাদের মাধ্যমে এসব কর্মকাণ্ড বাতিল করা হয়েছিল। আশা করি এসব কর্মকাণ্ড আন্দোলনের মাধ্যমে বাতিল করে দেয়া হবে।

ঢাবি অধ্যাপক ধীরেন বিশ্বাস বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রাণের দাবি ছিল শত্রু সম্পত্তি আইন বাতিল করা। স্বাধীন দেশে ভারত তো আর শত্রু নয় তাই আইনের নাম বদলে রাখলেন অর্পিত সম্পত্তি। সেটা বাস্তবায়ন না করে এই আইনটা না চাইতেই কেন হিন্দুদের দিচ্ছেন তা বোধগম্য নয়। এ সময় উপস্থিত হিন্দু নারীরা এই আইন চাই না বলে স্লোগান দেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরো বলেন, হিন্দু পারিবারিক আইন যেকোনো পরিবর্তন হবে শাস্ত্র পরিপন্থী এবং সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার সামিল।, যা হিন্দু সম্প্রদায় কোনো ভাবেই মেনে নেবে না। তাই ভবিষ্যতে হিন্দু আইন নিয়ে যোকোন প্রকার ষড়যন্ত্র সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করা হবে।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের যেসব সংগঠন এই সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেয় তারা হলো জাতীয় হিন্দু সংস্কার সমিতি, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভবনামৃত সংগঠন (ইসকন), শ্রী শ্রী ভোলানন্দগিরি আশ্রম, প্রণব মঠ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু ল’ইয়ারস অর্গানাইজেশন, শারদাঞ্জলী ফোরাম, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট, বাংলাদেশ হিন্দু সেবক সংঘ, বাংলাদেশ দ, হিন্দু নাগরিক কমিটি, জাগো হিন্দু পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, বাংলাদেশ মাইনোরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), বাংলাদেশ হিন্দু লীগ, বাংলাদেশ মাইনোরিটি সংগ্রাম পরিষদ, শ্রীগুরু সংঘ,আচার্য বিবেকানন্দ গোস্বামী আন্তর্জাতিক সেবাশ্রম (বাংলাদেশ অধ্যায়), জাতীয় শ্রীশ্রী শিব মন্দির, বাংলাদেশ সেবাশ্রম, আন্তর্জাতিক রবিদাস উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, হিন্দু হেরিটেজ ফাউন্ডেশন, জাগো হিন্দু বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সচেতন হিন্দু পরিষদ,পতঞ্জলী যোগ সংঘ, ভক্ত সংঘ,অনুরাগ শিল্পগোষ্ঠী, বাংলাদেশ ব্রাহ্মণ সমাজ।

ঢাকানিউজ২৪ডট